আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস
বৈষম্যহীন পরিবেশে বেড়ে উঠুক প্রতিটি কন্যাশিশু
ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একটি শিশুর হাসি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের পৃথিবী। ছেলে কিংবা মেয়ে— প্রতিটি শিশুই সমান মর্যাদা, ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ পাওয়ার অধিকারী। অথচ সমাজের নানা স্তরে এখনও কন্যাশিশুকে বৈষম্য, অবহেলা, বাল্যবিবাহ, অপুষ্টি, শিক্ষাবঞ্চনা ও সহিংসতার শিকার হতে হয়। কোথাও জন্মের পর থেকেই তাকে পরিবারের বোঝা হিসেবে দেখা হয়, কোথাও তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, আবার কোথাও অর্থনৈতিক সংকটের অজুহাতে তার শিক্ষাজীবন থামিয়ে দেওয়া হয়। এসব প্রতিবন্ধকতা শুধু একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করে না, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতির পথেও বাধা সৃষ্টি করে।
প্রতিবছর ১১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূরীকরণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং তাদের সম্ভাবনা বিকাশের জন্য বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ২০২৬ সালের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক— কন্যাশিশুর জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে তার মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো কন্যাশিশুকে মেয়ে হওয়ার কারণে পিছিয়ে পড়তে হবে না।
কন্যাশিশুর অধিকার ও সমান মর্যাদা : প্রতিটি কন্যাশিশুর জন্মগত অধিকার রয়েছে নিরাপদে বেঁচে থাকা, পুষ্টিকর খাবার পাওয়া, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ, শিক্ষা অর্জন, মতামত প্রকাশ এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার। এসব অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়; এগুলো তার মানবিক মর্যাদা ও স্বাভাবিক বিকাশের অপরিহার্য শর্ত। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, বৈষম্যহীনতা, জীবন ও বিকাশ এবং শিশুর মতামতের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে কন্যাশিশুকে পরিবারের সিদ্ধান্তে অপ্রাসঙ্গিক মনে করা যাবে না। তার বয়স, পরিপক্বতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী মতামত শোনা এবং তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
একটি কন্যাশিশু চিকিৎসক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, কৃষিবিদ, শিল্পী কিংবা দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু তার সম্ভাবনা বিকাশের পথ যদি জন্মের শুরু থেকেই সংকুচিত করে দেওয়া হয়, তাহলে ব্যক্তি ও সমাজ— উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কন্যাশিশুকে সমান সুযোগ দেওয়া মানে শুধু তার অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নেও বিনিয়োগ করা।
শিক্ষাই আত্মনির্ভরতার প্রধান ভিত্তি : কন্যাশিশুর ক্ষমতায়নের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম শিক্ষা। শিক্ষা তাকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে, যুক্তিবোধ বাড়ায়, আত্মবিশ্বাস তৈরি করে এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে। একজন শিক্ষিত মেয়ে নিজের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও জীবনসংক্রান্ত বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দারিদ্র্য, বিদ্যালয়ের দূরত্ব, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক কুসংস্কারের কারণে অনেক মেয়ের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। কোনো কোনো পরিবারে ছেলেদের শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও মেয়েদের শিক্ষা অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি।
কন্যাশিশুর জন্য মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ে নিরাপদ পরিবেশ, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে শিক্ষা এবং হয়রানিমুক্ত যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ঝরে পড়া রোধে দরিদ্র পরিবারের সহায়তা, উপবৃত্তি এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কন্যাশিশু এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মেয়েদের জন্যও শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিশুই যেন প্রতিবন্ধিতা, আর্থিক অসচ্ছলতা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
বাল্যবিবাহ : বাংলাদেশে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা বাল্যবিবাহ। দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, প্রচলিত কুসংস্কার, যৌন হয়রানির আশঙ্কা এবং পারিবারিক সামাজিক চাপের কারণে অনেক মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ের মুখোমুখি হতে হয়। অথচ বাল্যবিবাহ তার শিক্ষা, শারীরিক বিকাশ, মানসিক সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অল্প বয়সে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে মা ও শিশুর বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। কিশোরী মায়ের রক্তস্বল্পতা, গর্ভকালীন জটিলতা এবং প্রসবসংক্রান্ত সমস্যার আশঙ্কাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। পাশাপাশি অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার কারণে অনেক মেয়ের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, জন্মনিবন্ধন নিশ্চিতকরণ, বিদ্যালয়ে মেয়েদের ধরে রাখা এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে সহায়তা করা প্রয়োজন। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেওয়া তার নিরাপত্তা কিংবা ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় নয়। বরং শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও নিরাপদ পরিবেশই তার আত্মনির্ভরতার ভিত্তি গড়ে তোলে।
স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে চাই সমান গুরুত্ব : কন্যাশিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য জন্মের পর থেকে কৈশোর পর্যন্ত বয়সোপযোগী পুষ্টি, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, টিকাদান, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ প্রয়োজন। কিন্তু কিছু পরিবারে খাদ্য বণ্টন, চিকিৎসা গ্রহণ কিংবা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় কম গুরুত্ব পায়। এই বৈষম্য দূর করা জরুরি।
শৈশব ও কৈশোরে পুষ্টির ঘাটতি শারীরিক বৃদ্ধি, শেখার ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ মাতৃস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কন্যাশিশুর খাদ্যতালিকায় বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ডিম, মাছ, দুধসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে। আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দিলে স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
কৈশোরে মাসিক শুরু হওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে লজ্জা, ভয় কিংবা কুসংস্কার ছড়িয়ে না দিয়ে মেয়েদের বয়সোপযোগী ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা দিতে হবে। নিরাপদ মাসিক স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতার উপকরণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাসিকের কারণে কোনো কিশোরী যেন বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য না হয়। একই সঙ্গে বয়ঃসন্ধিকালের শারীরিক পরিবর্তন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, মানসিক সুস্থতা এবং প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে অভিভাবক, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংবেদনশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
কন্যাশিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাস : শিশুর সুস্থতা শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানসিক ও সামাজিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের অবহেলা, ছেলেমেয়ের মধ্যে বৈষম্য, চেহারা নিয়ে কটূক্তি, অতিরিক্ত চাপ এবং অন্যের সঙ্গে তুলনা কন্যাশিশুর আত্মবিশ্বাসে আঘাত করতে পারে।
মেয়েদেরও ভুল করার, প্রশ্ন করার, নতুন কিছু শেখার এবং নিজের আগ্রহ প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞানচর্চা, বই পড়া ও সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ তাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়তা করে। কোনো কন্যাশিশু দীর্ঘদিন মন খারাপ, অতিরিক্ত ভয়, ঘুমের সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা আচরণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলে তার প্রতি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বকাঝকা বা উপহাস না করে তার কথা শুনতে হবে। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নিতে হবে।
শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে তার ছোট ছোট অর্জনের প্রশংসা করা, নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া এবং ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করতে উৎসাহিত করা জরুরি। তাকে বোঝাতে হবে, পরীক্ষার ফলাফল কিংবা প্রতিযোগিতায় সাফল্যই তার যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। সততা, দায়িত্বশীলতা, সৃজনশীলতা ও মানবিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সহিংসতা ও নির্যাতনমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা : কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। বাড়ি, বিদ্যালয়, যাতায়াতের পথ কিংবা অনলাইন—কোনো স্থানেই শিশু যেন নির্যাতন, হয়রানি, শোষণ বা ভয়ভীতির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মানসিক নিপীড়ন, অবমাননাকর আচরণ এবং শিশুশ্রম তার স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব অভিজ্ঞতা শিশুর মধ্যে ভয়, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারে। তবে প্রতিটি শিশুর প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না; তাই তার অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া জরুরি।
শিশুকে নিজের শরীরের ব্যক্তিগত সীমানা সম্পর্কে বয়সোপযোগী ধারণা দিতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, ভয় দেখানো কিংবা গোপন রাখতে চাপ দেওয়া হলে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং তার বক্তব্যকে অবিশ্বাস বা অবহেলা করা যাবে না।
নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে শিশুকে দোষারোপ না করে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় অভিযোগের ব্যবস্থা করা জরুরি। কোনো ঘটনার শিকার শিশুর পরিচয় অপ্রয়োজনে প্রকাশ করাও উচিত নয়।
ডিজিটাল জগতে কন্যাশিশুর সুরক্ষা : বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষা, যোগাযোগ এবং সৃজনশীলতার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কন্যাশিশুরাও এসব সুবিধা গ্রহণ করে জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে পারে। তবে অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার, প্রতারণা এবং অনুপযুক্ত যোগাযোগের ঝুঁকিও রয়েছে।
খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের সুযোগ : কন্যাশিশুর সার্বিক বিকাশে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। খেলাধুলা শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায়, দলগত কাজ শেখায়, নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত করে এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে। ছবি আঁকা, গান, আবৃত্তি, বিতর্ক, বিজ্ঞানমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শিশুর সৃজনশীলতা ও আত্মপ্রকাশের সুযোগ তৈরি করে।
প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক কন্যাশিশুর অধিকার : সব কন্যাশিশুর প্রয়োজন এক রকম নয়। প্রতিবন্ধী শিশু, দরিদ্র পরিবারের মেয়ে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা, পথশিশু, বাস্তুচ্যুত শিশু এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বঞ্চনার শিকার মেয়েরা অনেক সময় একাধিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগে কন্যাশিশুর ঝুঁকি : বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যান্য প্রভাব শিশুদের জীবন ও শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দুর্যোগে পরিবার বাস্তুচ্যুত হলে কন্যাশিশুর শিক্ষা ব্যাহত হতে পারে, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার কমে যেতে পারে এবং নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি : কন্যাশিশুর ক্ষমতায়নের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরি হয় শৈশব থেকেই। মানসম্মত শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, গণিতের দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, যোগাযোগক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের অভ্যাস ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে তাকে এগিয়ে রাখতে পারে।
পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব : কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করার প্রথম ক্ষেত্র পরিবার। জন্মের পর থেকেই ছেলে ও মেয়েকে সমান ভালোবাসা, পুষ্টি, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। গৃহস্থালির কাজের দায়িত্ব শুধু মেয়েদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে পরিবারের সব সদস্যের মধ্যে বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে আইন, নীতি ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ : কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশে বিভিন্ন আইন, নীতিমালা ও সামাজিক কর্মসূচি রয়েছে। তবে আইন ও নীতির সুফল প্রত্যেক শিশুর কাছে পৌঁছে দিতে কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিশুশ্রম বন্ধ, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং নির্যাতনের শিকার শিশুদের সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
