হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী পেশা

কানিজ সূবর্ণা বাবলি

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অতীত আর বর্তমানের মোহনায় দাঁড়িয়ে আজ আমরা এক নিদারুণ রূপান্তরের নীরব সাক্ষী হচ্ছি যা আমাদের অতি পরিচিত প্রিয় নগরজীবনকে ভেতরে ভেতরে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। সকালের স্নিগ্ধ মিষ্টি আলোয় একসময় যেসব কর্মমুখর ও প্রাণবন্ত মানুষের সতেজ উপস্থিতি আর কলরবে মুখরিত হয়ে উঠত শহরের অলিগলি আজ সেখানে কেবলই যান্ত্রিক নীরবতা ধোঁয়ার ধোঁয়াশা আর চরম ব্যস্ততার আকস্মিক তড়িঘড়ি। সময় বহমান নদীর মতো তার আপন তীব্র বেগে ধাবিত হয়ে নিত্যনতুন আধুনিক প্রযুক্তির আলো ছড়াচ্ছে আর ঠিক সেই চোখ ধাঁধানো আলোর আড়ালেই চিরতরে তলিয়ে যাচ্ছে বহু শতাব্দি ধরে গড়ে ওঠা আমাদের শেকড় গভীর ঐতিহ্যের নান্দনিক লোকজ চালচিত্র।

সভ্যতার এ অনিয়ন্ত্রিত গতিময় দৌড়ে যেসব পরিশ্রমী শ্রমজীবী মানুষের পরম দরদী হাত ধরে একদিন একটি শহরের নিজস্ব সংস্কৃতি ও নিজস্ব জীবনাচরণ রূপ পেয়েছিল তারা আজ আধুনিকতার কৃত্রিম ও চকচকে আড়ালে ক্রমান্বয়ে চরম কোণঠাসা হয়ে অদৃশ্যের ধূসর খাতায় নাম লেখাচ্ছে।

আমরা যখন কৃত্রিম আলো আর স্বাচ্ছন্দ্যের মেকি মোহে পুরোপুরি বিভোর ঠিক তখনই আমাদের চোখের সামনে নীরবে নিভৃতে পরম কষ্টে বিদায় নিচ্ছে সেসব সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পেশা যা শুধু মানুষের সাধারণ জীবিকা অর্জনের উপায় ছিল না বরং ছিল বাঙালির হাজার বছরের আত্মার আকুল স্পন্দন ও লোকশিল্পের প্রধানতম মজবুত স্তম্ভ। শহরের ইটের পর ইট সাজিয়ে তৈরি হওয়া বিশাল বহুতল ভবনের মেলা আর পিচঢালা রাজপথের যান্ত্রিক গর্জনের নিচে চিরতরে চাপা পড়ে গেছে সেসব নিপুণ কারিগরদের অত্যন্ত নিঃশব্দ ঘাম আর না-বলা করুণ অশ্রুর বিষাদময় ইতিহাস।

যে প্রিয় অভিজ্ঞ হাতে একদিন সাধারণ মাটি পরম ভালোবাসায় ও অপূর্ব নান্দনিকতায় জীবন্ত রূপ পেত যে কোমল স্পর্শে তাঁতের সুতোয় ফুটে উঠত রঙিন কবিতার মতো ক্যানভাস কিংবা যে হাতের ছেনির সুনির্দিষ্ট আঘাতে তৈরি হতো শক্ত কাঠের চোখজুড়ানো অনন্য নিদর্শন আজ সেই হাতগুলো চরম সামাজিক অনিশ্চয়তা আর পেটের দায়ের নিষ্ঠুর বাস্তবতার সামনে নিঃশব্দে নতজানু হয়ে আধুনিক শহরের বিশাল ভিড়ে অন্য কোনো অচেনা ও রুচিহীন পেশায় আত্মগোপন করতে বাধ্য হচ্ছে। মাটির সোঁদা মিষ্টি গন্ধে একসময় পরম আনন্দে আকুল হয়ে উঠত যেসব কোলাহলপূর্ণ ব্যস্ত কুমারপাড়া আজ সেখানে শুধুই সস্তা প্লাস্টিক আর মেলামাইনের মেকি দ্যুতি যা আমাদের নিজস্ব স্বাভাবিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যবোধকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে।

আমাদের গ্রামীণ জীবনের এক অপূর্ব অনুষঙ্গ ছিল মাটির তৈরি নানা রকমের তৈজসপত্র হাড়িপাতিল আর শৈল্পিক সামগ্রী যা এখন শুধু যাদুঘরের কাঁচের ভেতরে নিঃসঙ্গ অবস্থায় বন্দী হয়ে পড়ে রয়েছে। তাঁতিদের হাতের ঐতিহ্যবাহী ঠকঠক শব্দের মিষ্টি সুর যা একসময় গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে দিত জীবন যাপনের আসল আনন্দ আর লোকজ ঐতিহ্যের সতেজ আমেজ আজ তা সর্বত্র প্রায় স্তব্ধ হয়ে গেছে এবং আধুনিক যান্ত্রিক টেক্সটাইল মিলের ভিড়ে সেই স্পর্শকাতর বয়ন শিল্প তার চিরন্তন মর্যাদা ও স্বকীয়তা হারিয়ে ধুঁকছে।

শাঁখারিদের নিপুণ হাতের চিরন্তন কারুকাজ কিংবা শাঁখার মসৃণ গায়ে হাজার বছরের শুভ সামাজিক জীবনের প্রতীক খোদাই করার যে অমূল্য শিল্পধারা তা এখন প্রায় পুরোপুরি বিলুপ্তির পথে কারণ আধুনিক ধাতব অলংকার খুব সহজেই জায়গা করে নিয়েছে আমাদের দৈনন্দিন রুচির উঠানে। লোহার লাল উত্তপ্ত আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে যেসব কর্মঠ কামার ভাইদের ঘামঝরা দীর্ঘশ্বাস একসময় তৈরি করত প্রাত্যহিক বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় পরম হাতিয়ার তারা আজ বিশাল বহুজাতিক কোম্পানির চকচকে পণ্যের পাশে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক ও অর্থহীন বলে পরিগণিত হচ্ছে।

কাঠের ওপর নিখুঁত খোদাইয়ের অভিজ্ঞ রূপকার ধামাই নাপিত কিংবা পথচলতি আনন্দময় বায়োস্কোপওয়ালা যাদের উপস্থিতি একদিন শহরের প্রতি কোণে ছোট ছোট শিশুদের শৈশবের অপূর্ব বিস্ময় আর কল্পনার অনাবিল দুয়ার খুলে দিত তারা আজ শুধুই এক ধূসর স্মৃতি যা কেবল বৃদ্ধদের গল্পের ঝুড়িতে কোনোমতে টিকে আছে। এ পেশাগুলো শুধু যে কয়েক হাজার মানুষের সাধারণ জীবন ধারণের বস্তুগত পথ ছিল তা নয় বরং এগুলো ছিল আমাদের সমস্ত সামাজিক মেলবন্ধন সৃষ্টি করার এক অনন্য ও শক্তিশালী বাহন যেখানে ক্রেতা আর বিক্রেতার মানবিক সম্পর্কের মধ্যে এক গভীর পরম প্রীতি ও পারস্পরিক অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ কাজ করত।

ছাটবেলায় যেসব ফেরিওয়ালার বিচিত্র সুরের হাঁকডাকে পাড়ার অলিগলি গমগম করত অথবা ছুটির নির্জন দুপুরে যেসব শৌখিন কারিগরের হাতের চেনা ছোঁয়ায় গৃহস্থালির সাধারণ জিনিসপত্রও অনন্য শিল্পকর্মে পরিণত হতো তাদের আজকের এই অনুপস্থিতি আমাদের দৈনন্দিন নাগরিক জীবনে সৃষ্টি করেছে এক মস্ত করুণ শূন্যতা। এ শূন্যতা শুধু কোনো নির্দিষ্ট পেশার বিলুপ্তি নয় বরং এটি আমাদের সামাজিক মেজাজ লোকজ শিল্পবোধ এবং পারিবারিক আবেগের ওপর এক নীরব কুঠারাঘাত।

আধুনিক নগরায়নের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ এবং গণউৎশ্রয়ী বিপুল বাজারের জোয়ারে হস্তশিল্পনির্ভর এসব সাধারণ জীবিকা আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হয়ে করুণ পরিণতি ভোগ করছে। প্রযুক্তির উত্তরোত্তর ব্যবহার ও বিশ্বায়নের এই প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাসে আমরা নতুন দিনের তথাকথিত আধুনিক নাগরিক হওয়ার প্রতিযোগিতায় অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছি সত্য কিন্তু চরম আত্মতুষ্টির অন্তরালে নিজের অজান্তেই প্রতিনিয়ত হারিয়ে ফেলছি আমাদের নিজস্ব প্রাচীন রূপ রস গন্ধ ও ঐতিহ্যিক পরিচিতির মজবুত মূল ভিত্তি।

সময়ের এ সংবেদনশীল ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আমাদের গভীর অনুশোচনার সাথে উপলব্ধি করতে হবে যে শেকড়হীন কোনো সভ্যতা দীর্ঘদিন স্থায়ী সুফল বয়ে আনতে পারে না বরং তা একসময় নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে বিলীন হয়ে যায়। আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের এ অমূল্য ধারাগুলোকে যদি আমরা আধুনিক জীবনের মূল স্রোতের সাথে মেলাতে ব্যর্থ হই তবে আগামী দিনগুলোতে নতুন প্রজন্ম এক সম্পূর্ণ যান্ত্রিক এবং ইতিহাসহীন রুক্ষ পরিমণ্ডলের বাসিন্দা হয়ে গড়ে উঠবে। প্রতিটি শহরের নিজস্ব একটা আত্মিক সুর থাকে যা শুধু ইট পাথরের দেওয়ালে থাকে না বরং থাকে সেই শহরের মানুষ এবং তাদের বংশপরম্পরায় চলে আসা কাজের ধারায়।

যখন একটা ঐতিহ্যবাহী পেশা হারিয়ে যায় তখন শুধু একজন মানুষ বেকার হয় না বরং তার সাথে বিলুপ্ত হয় একটি স্বতন্ত্র কলাকৌশল যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অভিজ্ঞতা ও সাধনার মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল। আমরা যদি আজই আমাদের এ অবহেলিত কারিগর সমাজকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে না পারি তবে ইতিহাস আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে এ হারিয়ে যাওয়া শিল্পীদের পাশে আমাদের অবিলম্বে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। আধুনিক বাজারব্যবস্থার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তাদের ঐতিহ্যবাহী পণ্যে নতুন নকশা ও উন্নত প্রযুক্তির মিশ্রণ ঘটাতে হবে যাতে আধুনিক যুগের ক্রেতারাও এসব শিল্পকর্মের প্রতি সমানভাবে আকৃষ্ট হন।

আমাদের এ অত্যন্ত সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলোকে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গর্বের ঐতিহ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখতে যদি আমরা সময়োপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত সচেতন পদক্ষেপের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন নান্দনিক নকশার পরম সুন্দর মেলবন্ধন ঘটাই তবে হারিয়ে যাওয়া এ শিল্পী কারিগরদের কাজের পরম মর্যাদা ও সামাজিক কদর পুনরায় সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তাদের সেই অনন্য শৈল্পিক সৃষ্টি আবার আমাদের আধুনিক নগর সংস্কৃতিকে পুরো বিশ্বদরবারে অত্যন্ত গৌরবান্বিত ও সমাদৃত করে তুলবে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী ইডেন মহিলা কলেজ, অর্থনীতি বিভাগ