গ্রাম সরকার হোক জনসম্পৃক্ত উন্নয়নের হাতিয়ার
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
গ্রামীণ উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং তৃণমূলের মানুষের সমস্যা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে গ্রাম সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৭ বছর পর এ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে 'গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬'-এর খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। তবে নতুন আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়; এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।
বাংলাদেশের উন্নয়নে গ্রাম ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভূমিকা অপরিসীম। অথচ অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সাধারণ মানুষের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। গ্রাম সরকার কার্যকরভাবে চালু করা গেলে স্থানীয় সমস্যার অগ্রাধিকার নির্ধারণ, উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি এবং সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পুষ্টি, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রস্তাবিত খসড়ায় সদস্যদের 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আগের ব্যবস্থায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের মনোনয়নের বিধান ছিল, যা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠেছিল। নতুন প্রস্তাবে নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হওয়া ইতিবাচক। তবে ভোটারদের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজনের বিধান কতটা কার্যকর হবে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। এত কম উপস্থিতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পুরো জনগোষ্ঠীর মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে। তাই নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।
খসড়ায় কৃষক, শিক্ষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, নারী, যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্বের প্রস্তাব রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ সমাজের বহুমুখী সমস্যা আলোচনায় আসতে পারে। তবে প্রতিনিধিত্ব যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে নজর দিতে হবে। নারী, দরিদ্র, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের মতামত এবং অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্রাম সরকারের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদসহ বিদ্যমান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সুস্পষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন। অন্যথায় দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।
গ্রাম সরকারের জন্য পৃথক তহবিল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ, ব্যয় ও নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কঠোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত সভা, আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, সামাজিক নিরীক্ষা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা তৈরি নয়, সেগুলোর বাস্তব অগ্রগতি ও জনকল্যাণমূলক ফলাফলও মূল্যায়ন করতে হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক, জুয়া ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে গ্রাম সরকার ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দলীয় স্বার্থসিদ্ধি কিংবা প্রতিপক্ষকে হয়রানির হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
গ্রাম সরকার পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ সফল হলে তৃণমূলের উন্নয়ন ও জনসম্পৃক্ত শাসনব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এজন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত আইন, গণতান্ত্রিক নির্বাচন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর জবাবদিহি। গ্রাম সরকার কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম নয়, বরং গ্রামের মানুষের অধিকার ও উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠুক— এটাই প্রত্যাশা।
