চিন্তা চুরি নাকি বিজ্ঞানের জাদু : গুগল-ফেসবুকের অনুমান রহস্য

জান্নাত আক্তার শিলা

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রযুক্তির যুগের সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে ফোনের অ্যাপগুলো সকলের ভাবনা কোনভাবে জেনে ফেলছে। হঠাৎ মন খারাপ মোবাইল হাতে নিয়ে রিলস এ ঢুকলেই দেখা যায় মন খারাপের ক্যাপশন, মিউজিকসহ ভিডিও আসছে। আবার এমন এমন ক্যাপশনের ভিডিও আসছে হয়তো এটাই মনে মনে ভাবনা ছিল। তখন মনে প্রশ্ন আসে গুগল, ফেসবুক কি কোনভাবে মনের খবর রাখে। কখনও বন্ধুর সাথে আলোচনা করা একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের জুতা কেনার কথা। অলৌকিক উপায়ে কয়েক মিনিট পরেই ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে হুবহু সেই জুতার বিজ্ঞাপন ফোনের স্ক্রিনে ভাসছে। মনে মনে ভাবা কোনো একটি জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার কথা অথবা গুগলে কিছু লিখতে গেলেই সার্চ ইঞ্জিনটি মনের কথাটিই আগে সাজেস্ট করছে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা বর্তমান যুগে প্রায় প্রতিটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরই হচ্ছে। এ রহস্যময় ঘটনার পর অনেকের মনেই স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে— গুগল বা ফেসবুক সকলের মনের চিন্তা চুরি করছে। তারা মানুষের মস্তিষ্ক পড়তে পারছে। প্রকৃত অর্থে, তারা মানুষের মন বা চিন্তা সরাসরি পড়তে পারছে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বর্তমান স্তর এখনও মানুষের মস্তিষ্কের তরঙ্গ সরাসরি দূর থেকে পড়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে আসল সত্যটি এর চেয়েও বেশি চমকপ্রদ। তারা মানুষের চিন্তা চুরি করছে না, বরং ডিজিটাল পদচিহ্ন বিশ্লেষণ করে মানুষের পরবর্তী চিন্তাটি কী হতে পারে, তা নিখুঁতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করছে। আর এ পুরো প্রক্রিয়াটি চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিগ ডেটার মাধ্যমে। যখন একজন স্মার্টফোন ব্যবহার করে, তখন তার অজান্তেই জীবনের অজস্র তথ্য প্রযুক্তির হাতে তুলে দেয়। কোন পোস্টে কত সেকেন্ড থেমেছে, কোন ধরনের ভিডিওতে লাইক দিচ্ছে, কার সাথে বেশি চ্যাট করছে এমনকি ফোনের জিপিএস লোকেশন অন থাকায় কোনো ব্যক্তি কখন কোথায় কোথায় যাচ্ছে সব তথ্যই রেকর্ড হচ্ছে। গুগল এবং মেটা সকলের এই হাজারো ডেটা পয়েন্ট সংরক্ষণ করে একটি 'ডিজিটাল ক্লোন' বা মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল তৈরি করে। তাদের উন্নত অ্যালগরিদম মানুষের বয়স, লিঙ্গ, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং মানসিক পছন্দ-অপছন্দ এত নিখুঁতভাবে বোঝে যা হয়তো খুব কাছের মানুষটিও জানে না। যখন ব্যক্তির হাজারটা আচরণের প্যাটার্ন তাদের জানা থাকে, তখন ঐ ব্যক্তি পরবর্তী মুহূর্তে কী ভাবতে পারে বা কী কিনতে পারে, তা অনুমান করা তাদের অ্যালগরিদমের জন্য কোনো কঠিন কাজ নয়। একে বলা হয় 'প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স' বা অনুমানমূলক বিশ্লেষণ। অনেক সময় মানুষ মুখে যা বলে ঠিক সেটাই বিজ্ঞাপনে চলে আসে। এর পেছনে রয়েছে ফোনের কিছু অ্যাপকে দেওয়া মাইক্রোফোনের অনুমতি। যদিও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করে তারা গোপনে ব্যবহারকারীর কথা শোনে না কিন্তু অনেক স্বাধীন গবেষক দেখিয়েছেন যে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট সচল রাখার স্বার্থে ব্যাকগ্রাউন্ডে অনেক ডেটা প্রসেস হয়। এর চেয়েও বড় ভূমিকা রাখে একজন ব্যক্তির চারপাশের মানুষের ডেটা। ধরা যাক, কোনো বন্ধু গুগলে একটি ল্যাপটপ সার্চ করল। যেহেতু ফেসবুক ও গুগল জানে যে দুজন বন্ধু এবং জিপিএস লোকেশন অনুযায়ী একই ক্যাফেতে বসে কফি খাচ্ছে তাই অ্যালগরিদম ধরে নেয় বন্ধুর ল্যাপটপের প্রতিবআগ্রহ থাকতে পারে। ফলে অপর বন্ধুর ফোনেও ল্যাপটপের বিজ্ঞাপন চলে আসে। তখন মনে হয় চিন্তা চুরি হয়েছে অথচ এটি আসলে ডেটা নেটওয়ার্কের খেলা। চিন্তা চুরি না হলেও মনোযোগ আর সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা ঠিকই প্রভাবিত হচ্ছে। এই কোম্পানিগুলোর ব্যবসা মূলত বিজ্ঞাপন। তাই যত বেশি সময় স্ক্রিনে ধরে রাখা যায়, তাদের আয় তত বাড়ে। অ্যালগরিদম শেখে কোন কনটেন্ট রাগায়, ভয় দেখায় বা কৌতূহলী করে তারপর সেটাই বারবার সামনে আনে। এতে সকলেই ক্রমে ক্রমে কী কিনবে, কী পড়বে, কাকে বিশ্বাস করবে এর উপর প্রযুক্তিগত প্রভাব পড়ে। এটাই নীরব চুরি। এ প্রযুক্তির যুগে পুরোপুরি ডিজিটাল দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া সম্ভব নয়, তবে কিছু সচেতন পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব। নিন্মোক্ত কয়েকটি পদক্ষেপের মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিজেদের আয়ত্তে অনেকাংশে রাখতে সক্ষম হব। প্রথমত, অ্যাপ পারমিশন নিয়ন্ত্রণ করা। ফোনের সেটিংস-এ গিয়ে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা গুগলের মতো অ্যাপগুলোর মাইক্রোফোন, ক্যামেরা এবং লোকেশন পারমিশন বন্ধ করে রাখা। শুধু যখন প্রয়োজন হবে, তখন সাময়িক অন করা। দ্বিতীয়ত, ট্র্যাকিং ও পারসোনালাইজড অ্যাড বন্ধ করা। গুগল এবং ফেসবুকের সেটিংস এবং প্রাইভেসি অপশনে গিয়ে ট্র্যাকিং ও পারসোনালাইজড অ্যাড অপশনটি বন্ধ করা। গুগলের মাই এক্টিভিটি পেজে গিয়ে লোকেশন হিস্ট্রি এবং ওয়েব অ্যাক্টিভিটি অটো-ডিলিট সেট করা। তৃতীয়ত, বিকল্প সার্চ ইঞ্জিন ও ব্রাউজার ব্যবহার করা। গুগলের পরিবর্তে গুগল ক্রোম বা সাফারি বাদ দিয়ে ব্রেভ বা ডাকডাকগো এর মতো প্রাইভেসি ফোকাসড ব্রাউজার ও সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করা যা ডেটা ট্র্যাক করে না। চতুর্থত, ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা। ইন্টারনেটে আসল আইপি অ্যাড্রেস এবং অবস্থান লুকিয়ে রাখতে একটি ভালো মানের ভিপিএন ব্যবহার করা। এটি ব্রাউজিং ডেটা এনক্রিপ্ট করে রাখে। পঞ্চমত, স্মার্ট ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট বন্ধ রাখা। ফোনের হেই গুগল বা সিরি এর মতো ভয়েস কমান্ড অপশনগুলো বন্ধ রাখা যাতে ফোন সবসময় কথা শোনার জন্য ব্যাকগ্রাউন্ডে মাইক্রোফোন চালু না রাখে। ষষ্ঠত, শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন নিশ্চিতকরণ করা। যেখানে ব্যবহারকারীর সম্মতি, তথ্য মুছে ফেলার অধিকার এবং কোম্পানির জবাবদিহি স্পষ্ট থাকবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির এ যুগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ডেটা বা তথ্যই হলো সবচেয়ে মূল্যবান জ্বালানি।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, রসায়ন বিভাগ