সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের নজরদারি : অপরাধ রোধের একমাত্র উপায়

ওসমান গনি

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অপরাধের লাগামহীন বিস্তার শুধু রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার ব্যর্থতা বা দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে, বরং এর পেছনে নিহিত রয়েছে আমাদের সামাজিক কাঠামোর পতন, পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয় এবং নীতিনৈতিকতার চরম খরা। রাষ্ট্রের প্রতিটি কোণায়, পাড়ায়-মহল্লায় অপরাধের মাত্রা যেভাবে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে মনে হয় আমরা ধীরে ধীরে এক অনিশ্চিত, বিশৃঙ্খল ও নির্মম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছি। খবরের কাগজে বা টেলিভিশনের পর্দায় যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনা বা ব্রেকিং নিউজ প্রকাশিত হয়, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে আরও কতশত অকথিত ও অপ্রকাশিত ট্র্যাজেডি, যা সমাজের গভীর ক্ষতগুলোকে নির্মমভাবে উন্মোচন করে।

এসব ঘটনার ভিড়ে সবচেয়ে বেশি মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক এবং বেদনাদায়ক দিক হলো, আমাদের কিশোর এবং তরুণ বয়সের সন্তানরা জড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর সব অপরাধে। তারা যেমন নিজেরাও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নির্মম শিকার হচ্ছে, তেমনি নিজেরাও জড়িয়ে পড়ছে খুন, ধর্ষণ, ইভটিজিং, ছিনতাই এবং মাদক কারবারের মতো জঘন্য অপরাধে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু হৃদয়বিদারক ও লোমহর্ষক ঘটনা আমাদের সমাজের এ পচন ধরা অবস্থাকে একেবারে নগ্নভাবে উন্মোচন করেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কোটবাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হয় এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের তরুণ ও সম্ভাবনাময় ছেলে অপ্রতীম। সেই শোকের মাতম ও পরিবারের আর্তনাদের রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৮ অক্টোবর লাকসামের জগতপুরে খুন হয় সপ্তম শ্রেণীর মাত্র ১২ বছর বয়সী এক মেধাবী ছাত্রী জান্নাতুল তাজনিম। এ দুটি হত্যাকাণ্ড শুধু দুটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং সমগ্র বিবেকবান সমাজকে স্তম্ভিত, হতবাক ও বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। নিহত এ অপ্রতীম কিংবা জান্নাতুল তাজনিম উভয়েই ছিল বয়সে নিতান্তই কিশোর এবং তাদের জীবনের পুরোটা সুন্দর সময় পড়ে ছিল সামনে। কিন্তু সমাজের বিবেকবান মানুষের কাছে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তারা কেন এমন করুণ পরিণতির শিকার হলো? কেন তাদের প্রাণ এভাবে অঝোরে ঝরে গেল?

এসব প্রশ্নের গভীরে প্রবেশ করলে এবং চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এ মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে রয়েছে অভিভাবকদের মারাত্মক দায়িত্বহীনতা এবং সন্তানের প্রতি এক ধরনের অন্ধ উদাসীনতা। তেরো বা চৌদ্দ বছরের একজন কিশোর বা কিশোরী বাসা থেকে বের হয়ে কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, কার সাথে সঙ্গ দিচ্ছে এবং তার মনের অন্দরে কী ধরনের পরিবর্তনের ঝড় বইছে, তার কোনো খবরই অনেক মা-বাবা রাখেন না।

সারাদিন নিজেদের কর্মব্যস্ততা, যান্ত্রিক জীবন কিংবা উদাসীনতার অজুহাতে সন্তানের চলাফেরার ওপর নজরদারি না করার চরম খেসারত দিতে হচ্ছে এভাবে জীবন দিয়ে। সন্তান যখন বাড়ি থেকে বের হয়, তখন মা-বাবার মনে এই ন্যূনতম কৌতূহলটুকুও থাকে না যে তাদের সন্তানটি কোন পরিবেশে, কার সান্নিধ্যে সময় কাটাচ্ছে। অথচ একজন কিশোর বা কিশোরীর মানসিক গঠন এমন একটি স্পর্শকাতর পর্যায়ে থাকে, যেখানে একটু ভুল সঙ্গ, কুসঙ্গ বা সামান্য বিপথগামিতা তাকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে দিতে পারে।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত, ভীতিকর ও ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধিগুলোর একটি হলো 'কিশোর গ্যাং' কালচার। সমাজের নানান স্তরে, পাড়ায়-মহল্লায় আজ এ কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহ থাবা গভীরভাবে বিস্তার লাভ করেছে। স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরা কিংবা সাধারণ পোশাকে ঘুরে বেড়ানো এই কিশোররা সামান্য অজুহাতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন করছে সমবয়সী কাউকে, আবার জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসা, ইভটিজিং ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মহাশূন্য থেকে নেমে আসেনি, তারা সমাজেরই কোনো না কোনো মা-বাবার আদরের সন্তান। তারা কীভাবে ধীরে ধীরে এই অন্ধকার অপরাধ জগতের সাথে যুক্ত হচ্ছে, কে তাদের মদদ দিচ্ছে, কোন গোপন আড্ডায় তারা নিজেদের অমূল্য জীবন ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে, সে বিষয়ে মা-বাবাদের কোনো বিন্দুমাত্র খোঁজখবর থাকে না।

মা-বাবারা তাদের সন্তানদের খবর রাখেন তখনই, যখন সেই সন্তানটি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে চিরতরে হারিয়ে যায় কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে শ্রীঘরে নিক্ষিপ্ত হয়। অনেক সময় সন্তান যখন অপরাধ করতে গিয়ে নিজে প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয় কিংবা খুন হয়ে লাশ হয়ে ঘরে ফেরে, তখন মা-বাবার টনক নড়ে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক বেশি দেরি হয়ে যায়, যা আর কোনোভাবেই ঘড়ি বা সময় পেছনের দিকে টেনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। এ মর্মান্তিক সত্যটি আজ আমাদের হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে হবে যে, সন্তানের রক্তমাখা লাশ দেখার আগে তার প্রাত্যহিক গতিবিধির দিকে কড়া নজর দেওয়া প্রতিটি মা-বাবার নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

মা-বাবা এবং পরিবারের সার্বিক উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে আজকের কিশোররা যখন অন্ধকার জগতের দিকে পা বাড়ায়, তখন তারা নিজেরাও রক্ষা পায় না এবং সমাজকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। শুধু সন্তানকে দুবেলা অন্ন-বস্ত্র দেওয়া, স্কুল-কলেজে পাঠানো বা পকেটে খরচের জন্য টাকা গুঁজে দিলেই মা-বাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; সন্তানের মনের গোপন ভাষা বুঝতে হবে, তার চলাফেরা, মানসিক পরিবর্তন ও বন্ধুদের বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। বর্তমান সমাজের এ ভঙ্গুর ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে মা-বাবার সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

সন্তান কোথায় যায়, কার সাথে মিশছে, পড়াশোনার পাশাপাশি তার মানসিক ও শারীরিক অবস্থা কেমন, এসব বিষয়ে প্রতিটি পরিবারকে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। অন্যদিকে, রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কিশোর গ্যাংয়ের শেকড় যত গভীরে বা যতো প্রভাবশালী মহলেই থাকুক না কেন, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব পুরোপুরি উপেক্ষা করে তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদকের বিষাক্ত বিস্তার রোধে পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে এবং অপরাধীদের ন্যূনতম ছাড় দেওয়া যাবে না।

রাষ্ট্র তার কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যদি সমাজে একটি ভয়ের ও সুশাসনের পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবেই অপরাধ প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। একই সাথে সমাজে পুনরায় সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা ও নৈতিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, প্রবীণ ব্যক্তি, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমকে একযোগে ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই সর্বনাশা অন্ধকূপ থেকে রক্ষা করতে হলে আজই পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় অপ্রতীম ও জান্নাতুলের মতো আরও বহু তাজা প্রাণ এভাবেই অঝোরে ঝরে যাবে, যা কোনোভাবেই একটি সুস্থ জাতির কাম্য হতে পারে না।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ ও কিশোর প্রজন্মের সঠিক লালন-পালন, নৈতিক শিক্ষা এবং নিরাপদ বেড়ে ওঠার ওপর। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি এবং কিশোর অপরাধের যে ভয়ঙ্কর বিস্তার ঘটেছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অপ্রতীম ও জান্নাতুল তাজনিমের মতো তাজা প্রাণগুলোর অঝোরে ঝরে যাওয়া আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে আমাদের গভীর গাফিলতি রয়েছে।

সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে কিংবা কোন বিপথগামী চক্রে জড়িয়ে পড়ছে, তা নিয়মিত তদারকি করার দায়িত্ব শুধু শিক্ষকদের বা রাষ্ট্রের নয়, সবার আগে তা প্রতিটি অভিভাবকের। সন্তানের হাতে মুঠোফোন বা পকেটে টাকা তুলে দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ মনে করার দিন আজ শেষ হয়েছে। মা-বাবার উদাসীনতা ও সন্তানের প্রতি অন্ধ ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের মতো অভিশাপ আজ আমাদের সমাজকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। একই সাথে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবে প্রভাবান্বিত না হয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর, আপসহীন এবং দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদকের কালো হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সমাজ থেকে এ অন্ধকার দূর করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, সুশীল সমাজ ও রাষ্ট্রকে আজ এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায়, আমাদের এ তরুণ প্রজন্ম অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে এবং একটি দেশের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়বে, যা কোনোভাবেই জাতির কাম্য হতে পারে না।

 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট