শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে গাইড বইয়ের বিকল্প প্রস্তাবনা
জাহাঙ্গীর হোসেন
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষার্থী বলতে আমরা সাধারণত তাদেরই বুঝি, যারা জ্ঞানার্জনের জন্য কোনো একাডেমিক বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নে যুক্ত। শিক্ষার্থীর অনুশীলন সার্থক করে তুলতে নানাবিধ আয়োজনের মধ্যে শিক্ষাপোকরণ প্রয়োজনীয় মাধ্যম। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনে উপকরণ অনন্য মাধ্যম।
বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের অনেক মাধ্যম পরিদৃষ্ট হয়। তাই তো শিক্ষার মাধ্যম পাঠ্যপুস্তক, গাইড বই, রেফারেন্স বই ও শিক্ষকের পাশাপাশি রয়েছে ইন্টারনেট, জার্নাল, মাল্টিমিডিয়া, ইউটিউবসহ নানা পরিসর। এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় ও সহজবোধ্য মাধ্যম হয়ে আছে ম্যানুয়ালি গাইড বই। শিক্ষার্থীরা যাতে মোবাইলে আসক্ত না হয়, সে কারণে তাদের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া সম্ভব নয়। সঙ্গত কারণেই শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্বে বস্তুগত উপাদেয় গাইড বইয়ের দিকেই ঝুঁকবে।
বাহুল্য নয় মোটেও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গাইড বা সহায়ক বই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে যেন একটি অনিবার্য উপাদান। কোনো ক্রমেই যেন শিক্ষার্থীরা গাইড বই ব্যতিরেকে পাঠ চুকাতে পারছে না। ফলে বাজারে বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড বইয়ের রমরমা বাণিজ্য চূড়ামণিতে পৌঁছেছে। এ কারণে প্রকাশনীর নানাবিধ কৌশলের বেড়াজালে আটকে আছে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী। অথচ গাইড বই-নির্ভর যাতে শিক্ষা কার্যক্রম না হয়, তার জন্য সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। পাঠ্যক্রম তৈরিও সেভাবে হলেও আয়োজনে ঘাটতি আছে।
গাইড বইয়ে যাতে শিক্ষার্থীরা আদিষ্ট না হয়, তার জন্য সরকার মহল ছাড়াও বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মহল দিব্যি সমালোচনার নহর বইয়ে দেয়— এতে কোনো কুণ্ঠাবোধ নেই। তবে প্রশ্ন থেকে যায়— গাইড বই কি বায়বীয় তথা হাওয়াই হয়ে এসে শিক্ষার্থীর টেবিলে এসে জুড়ে পড়ে? তা তো নয়। গাইড বই তো বাংলাবাজার কিংবা দেশের কোনো না কোনো এলাকায় প্রকাশ হচ্ছে। এ ঘটনাটি গোপন নয়, বরং উন্মুক্ত। দেশের সংশ্লিষ্ট সব মহল গাইড বই প্রকাশের তথ্য জানে না— তা অবিশ্বাস্য ঠেকে। তাহলে গাইড বই প্রকাশ অবধারিত করতে কারা গোপনে কড়া নাড়ছে?
গভীরভাবে লক্ষ্য করা গেছে যে, সহায়ক বই বিক্রিতে শুধু প্রকাশনীসহ খুচরা বিক্রেতারা যে লাভবান হচ্ছেন, তা কিন্তু নয়। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন বিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরা। তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী প্রকাশনী কিংবা লাইব্রেরির মাধ্যমে উপঢৌকন নিচ্ছেন। এর একটি অংশ শিক্ষক-কর্মচারীরা পাচ্ছেন, আরেকটি অংশ প্রধান শিক্ষক এবং ক্ষেত্রবিশেষে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা পেয়ে থাকেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় অংশ প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়ে নেন, বাকি অংশ শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়।
আবার এদিকে এ নিয়ে অনেককে উপরিভাসা সমালোচনা করতে দেখি। তাদের মতে, অধিক টাকা নিয়ে মানহীন গাইড বই নিলে শিক্ষার্থীরা মানহীন হয়ে গড়ে উঠবে, তাই শিক্ষার্থীরা ভালো কিছু পাবে না। এ ভাবনাটা একধরনের পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন। তবে আমার আপত্তি সে জায়গায় নয়। গাইড বই যদি কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা অর্জনে প্রতিবন্ধক হয়, তাহলে গাইড বই কিনতে মানসম্মত কিংবা মানহীনের প্রশ্ন নিশ্চয়ই অবান্তর। তবে আমার প্রস্তাবনা হচ্ছে, পাঠ্যপুস্তকে প্রতিটি অধ্যায় শেষে সৃজনশীল প্রশ্ন ও কিছু বহুনির্বাচনী প্রশ্নের নমুনা দেওয়া থাকে। শিক্ষার্থীরা প্রথমেই এসব প্রশ্নের সমাধান করে থাকে এবং এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। সে কারণে এ নমুনা প্রশ্ন কিছু বাড়িয়ে দেওয়া দরকার। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি অধ্যায় শেষে অন্তত ৫টি রচনামূলক সৃজনশীল প্রশ্ন-উত্তরসহ এবং অন্তত ১০টি উত্তরবিহীন প্রশ্ন সংযোজন করা যেতে পারে। উত্তরবিহীন ১০টি প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার্থীরা নিজে নিজে বের করবে এবং এর সঠিকতা যাচাই ও পরামর্শের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকের সহযোগিতা নেবে। পরীক্ষায় পাঠ্যপুস্তকের নমুনা প্রশ্ন না দেওয়াই উচিত হবে। কারণ, প্রশ্নের ধরন বুঝতে এবং সমাধানের সক্ষমতা অর্জনে নমুনা প্রশ্ন পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। আমরা হামেশাই দেখে থাকি, বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে বাজারের গাইড বই থেকে হুবহু উদ্দীপকসহ নমুনা প্রশ্ন দেওয়া হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীরা বরাবরই গাইড বইয়ের অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে করতে সময় সাবাড় করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, একেকটি অধ্যায়ে অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন দেওয়া থাকে। এগুলো শিক্ষার্থীদের পড়তে হচ্ছে। খানিকটা সক্রিয় শিক্ষার্থীরা বিস্তর পড়া ভেবে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফলে অধ্যয়ন থেকে ধীরে ধীরে দূরে চলে যায়। কার্যত সৃজনশীল মেধাবিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। সেই সেকেলে পদ্ধতিতেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পথ চলছে। যুগোপযোগী হয়ে গড়ে উঠছে না শিক্ষার্থীরা। ফলে শিখনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না। তাই শিক্ষার পথ সুগম না হয়ে আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর থেকে উত্তরণের পথ হলো— পাঠ্যপুস্তকে প্রশ্নের সমাধানসহ ও সমাধানবিহীন অন্তত ১৫টি প্রশ্নব্যাংক অধ্যায়ভিত্তিক যুক্ত করে দেওয়া।
আরেকটি চরম সংকটের উদ্ভবের কথা বলা দরকার। সরকার প্রদত্ত বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ বইয়ে পর্যাপ্ত রসদ না থাকায় এ দুটির প্রাসঙ্গিক বই বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইংরেজি গ্রামারে যেসব উপাদান দেওয়া হচ্ছে, তা খুবই অপ্রতুল। এতটুকুন পাঠ অনুশীলন করলে ইংরেজি গ্রামার শেখার ক্ষেত্রে অনেক কম হয়ে যায়। এ সমস্যা সমাধানে পর্যাপ্ত অনুশীলনের রসদ দিতে হবে এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি গ্রামারের বাংলা অনুবাদ করে দিলে শিক্ষার্থীদের পাঠোদ্ধার করতে সুবিধা হবে। পাশাপাশি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি প্রথম পত্রের প্যাসেজগুলোর বাংলা অনুবাদও জরুরি।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, যুক্তরাজ্যে সহায়ক বইয়ের প্রচলন আছে। সেখানে CGP Books বা Pearson-এর তৈরি রিভিশন গাইড ও ওয়ার্কবুক মূল কারিকুলামের সহায়ক হিসেবে পড়ানো হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে এ মাধ্যমটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেখানকার মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা এটি নিয়মিত ব্যবহার করে। এগুলো সরকার কর্তৃক সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও সহায়ক বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি আছে। এসব বই পাঠ্যবইয়ের জটিল বিষয়গুলো সমাধান করে থাকে। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায়ও মূল বইয়ের বাইরে সহায়ক বই শ্রেণিকক্ষে যুক্ত করে শিখন-শেখানো কাজ সুগঠিত করা হচ্ছে। এগুলোকে স্টাডি বুক হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে প্রশ্নব্যাংক যুক্ত করে দিলে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
বর্তমান সময়ে সন্তানদের লেখাপড়া করানো আরও চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে। শিক্ষা উপকরণ এবং প্রাসঙ্গিক বই কিনতে পরিবারের সিংহভাগ টাকা খরচ হচ্ছে। শিক্ষার ব্যয়ভার নির্বাহ করতে গিয়ে খাদ্য জোগান দিতে ব্যাপক হিমশিম খেতে হচ্ছে অভিভাবকদের।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, পুঁজিপতি ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া। বিশেষ করে প্রকাশনীগুলোর দৌরাত্ম্য। গাইড বই নির্ধারিত মূল্যে অর্থাৎ গায়ের দামে কিনতে হচ্ছে। কোনো কমিশন দেওয়া হচ্ছে না। দোকানিরা প্রকাশনী ও পুস্তক বিক্রেতা সমিতির ওপর দায় চাপাচ্ছেন। আমার মতে, এটা একটা বিপথগামী সিন্ডিকেট। এ কারণে শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়ার আরেকটি কারণ তৈরি হয়েছে।
প্রকাশনীর আরেকটি অপকৌশল উন্মোচন না করা অন্যায় বৈকি। সেটা হলো, বিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ব্যাকরণ ও ইংরেজি ব্যাকরণ বই পাঠ্য করার সঙ্গে শর্ত জুড়ে দেয়—প্রকাশনীর গাইড বইও চালিয়ে দিতে হবে। বিষয়টা এমন দাঁড়ায় যে, প্রকাশনী গাইড বই প্রকাশ করে তেমন কোনো মুনাফা করতে পারছে না। যেন কেবলমাত্র ব্যাকরণ দুটোতেই তাদের মুনাফা, তাদের যাপিত জীবন। হতবাক হওয়ার বিষয় হলো, বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণের চেয়ে ১০ থেকে ১২টির অধিক গাইড বই। দুটি ব্যাকরণের ঘাড়ে চেপে গাইড বইগুলো বিক্রি করছে। আরেকটি দিক লক্ষণীয় যে, আগে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কেন্দ্রে অবস্থান করত। এখন কিন্তু অতি কৌশলে এর রেশ প্রান্তিকের খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সিন্ডিকেট বড় হয়েছে। যদিও এ ঘৃণিত সিদ্ধান্তের সুফল খুচরা বিক্রেতারা কতটুকু পেয়ে থাকেন, তাতে আমি সন্দিহান। প্রসঙ্গত, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় যদিও প্রকাশনী ও খুচরা বিক্রেতার মধ্যে দ্বন্দ্ব হওয়ার কথা। যদি দ্বন্দ্ব না হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে প্রান্তিক বিক্রেতা থেকে যারা নেতা বনে গেছেন, তারা নেহাতই প্রকাশনীর মালিকদের দাসত্ব বরণ করেছেন এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের স্বার্থকে কুঠারাঘাত করছেন। এরা সর্বোপরি প্রকাশনীর মালিকদের যে অনুগত দাস হয়ে গেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যে যেমনই করুক, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যাই হোক, প্রকাশনীর মালিক এবং খুচরা বিক্রেতার মধ্যে গলায় গলায় পিরিত কতটুকু আছে বা নেই, সেটা এ নিবন্ধের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হিসেবে আনা আমার লক্ষ্য নয়।
এ দেশের গরিব শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক পর্যায়ের গাইড বই ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে চড়ামূল্যে কিনে রীতিমতো সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী বই কিনতে না পেরে লেখাপড়া থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে লাখ লাখ কোমলমতি শিক্ষার্থী। তাহলে প্রতিবছর রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা অনর্থক নয় কি? সরকারের এমন সরল উদ্দেশ্য কেবল বেহাতই হচ্ছে না, গোটা শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের একটি অন্যতম উপলক্ষ বটে। এমনতর পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। সে মতে, সরকার কর্তৃক গাইড বইয়ের অভাব দূর করতে হবে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। উপরোক্ত যে প্রস্তাবটি করা হলো, এর চেয়ে আরও যুৎসই পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অবশ্যই সাধুবাদ জানাব। তবুও আমার দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাক। তার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক শিক্ষার্থী হয়ে যাক বিশ্ব নাগরিক— এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি
