নাভি পিল্লাইয়ের শান্তিতে নোবেল জয় : অপেক্ষা রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার লাভের
নুসরাত সুলতানা
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি, স্থায়ী সৈন্যবাহিনী হ্রাস বা বিলোপ সাধন এবং শান্তি সম্মেলন আয়োজন বা প্রচারের কাজে যারা সবচেয়ে বেশি বা উত্তম অবদান রেখেছেন, তাদের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে নরওয়ের নোবেল কমিটি শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কারের ঘোষণা দেয়।
বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার একজন অ্যাডহক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত নৃশংসতাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে যে মামলা করে গাম্বিয়া, নাভি পিল্লাই সেই মামলার অন্যতম বিচারক।
বাস্তুচ্যুত, নিরাপত্তাহীনতা, নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চনা রোহিঙ্গাদের যে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে, নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল জয় এ বিষয়কে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে আনার সুযোগ তৈরি করেছে। নাভি পিল্লাইয়ের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া তখন স্বার্থক হবে, যখন নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে অত্যাচার, নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে । রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে এবং তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। ২০১৯ সালে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করে। আদালত মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় প্রাথমিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিল।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও এ তদন্ত ব্যবস্থার আরও জোরালো ভূমিকা দাবি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের তদন্ত চলছে এবং বভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক তৎপরতার পরও এতবছরে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করা সম্ভব হয়নি। এতে রোহিঙ্গারা যেমন তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি শরনার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য আসলেও বাড়তি জনসংখ্যা বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এমনকি পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ সরকার বারবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোর দিয়ে বলেছে যে, কেবল মানবিক সহায়তা নয়— নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান। রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারক হিসেবে নাভি পিল্লাইয়ের শান্তিতে নোবেল জয় আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করা ব্যক্তিদের সম্মান আর স্বীকৃতি দিতে পারে আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মনে আবারও নতুন করে আশা জাগায় তাদের জন্মভূমি ফিরে পাওয়ার, নাগরিক অধিকার লাভ করার।
শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার দেওয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট আবারও বিশ্বের দরবারে আলোচনার কেন্দ্রে স্থান পেতে পারে। তবে এটা শুধু আলোচনা, পুরস্কার প্রদান কিংবা আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থাকুক। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার প্রকৃত তাৎপর্য ফুটে উঠুক রোহিঙ্গাদের প্রতি ন্যায়বিচার করার মাধ্যমে। যেখানে শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বের প্রভাবশালী দেশকেও এগিয়ে আসতে হবে। যেভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার জন্য রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারককে বিশ্ব বিবেচনায় রেখেছে সেভাবে বিবেচনা করবে রোহিঙ্গাদের অধিকারের কথা, বাস্তুচ্যুত জীবনের কথা। পৃথিবীতে ফিরে আসবে শান্তি, কোনো জাতি তার দেশ থেকে বিতাড়িত হবে না— এমনটাই প্রত্যাশা।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
