ইউজিসির নতুন গবেষণা নীতিমালা : শিক্ষকদের সুযোগ বাড়াবে, নাকি তরুণদের পিছিয়ে দেবে?
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার মান বাড়ানো এবং গবেষণা তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) নতুন গবেষণা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। নিঃসন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার মান বাড়াতে ইউজিসি এ নীতিমালা সহায়ত হবে। দীর্ঘদিন একটি সুস্পষ্ট গবেষণা নীতিমালা না থাকায় গবেষণা তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে— এটি যেমন সত্য, তেমনি নতুন নীতিমালার কিছু বিধান তরুণ শিক্ষক ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার সুযোগকে সংকুচিত করতে পারে— এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে গবেষণা প্রকল্পের প্রধান গবেষক হওয়ার ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রিকে বাধ্যবাধক করে দেওয়ার বিষয়টি নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
বর্তমানে বাংলাদেশে অনুমোদিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬০টি। এর মধ্যে ৫৭টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান। তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান ২০২৩ সালের BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন ১৬,৩৯৯ জন এবং শিক্ষার্থী ছিলেন ৭,২৫,৯৭১ জন। এদের মধ্যে পিএইচডিধারী শিক্ষক ছিলেন মাত্র ৬,৪০৭ জন, যা মোট শিক্ষকের ৩৮ শতাংশ। কিন্তু সমস্যা হলো এই পিএইচডিধারী শিক্ষকদের বড় অংশই আবার পুরোনো ও বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই। বিশেষ করে, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের একাডেমিক অবকাঠামো, গবেষণার পরিবেশ এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকায় পিএইচডিধারী শিক্ষকও বেশি।
অন্যদিকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতা ভিন্ন। উদাহরণ হিসেবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলা যাক, যেখানে প্রায় ২৩০ জন শিক্ষকের মধ্যে পিএইচডিধারী শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৪৮ জন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক বিভাগই শুরু হয়েছে— Lecturer I Assistant Professor-দের দিয়ে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কম। এখন প্রশ্ন হলো— এ বাস্তবতায় গবেষণার নেতৃত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
ইউজিসির নীতিমালায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের গবেষণার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক চও বা সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এখানে পিএইচডি ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ একজন পিএইচডিবিহীন শিক্ষক শিক্ষার্থীর গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিতে পারেন। কিন্তু একই শিক্ষক যখন নিজের গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করতে চাইবেন, তখন কাঠামোটি ভিন্ন। Faculty Research-এর ক্ষেত্রে পিএইচডিধারী শিক্ষককে PI এবং Lecturer বা Assistant Professor-কে Co-PI হিসেবে রাখার বিধান রয়েছে। এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি আসে— একজন শিক্ষক পিএইচডি ছাড়াই শিক্ষার্থীর গবেষণার PI হতে পারলে নিজের গবেষণার PI হতে পারবেন না কেন? একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর গবেষণা পরিচালনার মতো দায়িত্ব পালনের যোগ্য হলে তাঁর নিজের গবেষণা প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা শুধু পিএইচডি না থাকার কারণে কেন প্রশ্নবিদ্ধ হবে?
পিএইচডি অবশ্যই একজন গবেষকের গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক যোগ্যতা। কিন্তু পিএইচডি ডিগ্রি আর গবেষণা সক্ষমতা এক বিষয় নয়। একজন গবেষকের পূর্ববর্তী গবেষণা, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা, Scopus বা Web of Science-এ প্রকাশিত প্রবন্ধ, গবেষণার অভিজ্ঞতা, গবেষণা প্রস্তাবের মান এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তার দক্ষতাও গবেষণার সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একজন পিএইচডিধারী শিক্ষক যে বিষয়ে গবেষণা করেছেন, একই বিভাগের আরেকজন পিএইচডিবিহীন শিক্ষক হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। শুধু ডিগ্রির ভিত্তিতে প্রথমজনকে PI এবং দ্বিতীয়জনকে Co-PI করা হলে গবেষণার বিষয়গত সমন্বয় কতটা কার্যকর হবে, সেটিও বিবেচনার বিষয়। আরেকটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে। একজন অভিজ্ঞ অধ্যাপক যদি পিএইচডিধারী না হন, তাহলে তাকে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র একজন শিক্ষকের অধীনে Co-PI হিসেবে কাজ করতে হবে। বাস্তবে একজন দীর্ঘদিনের শিক্ষক তার চেয়ে জুনিয়র একজনের নেতৃত্বে গবেষণা পরিচালনায় কতটা আগ্রহী হবেন, সেটিও প্রশ্নের বিষয়। ফলে কাগজে কলমে এই নীতিমালা গবেষণার সহায়ক হলেও বাস্তবে তা নতুন ও তরুণ শিক্ষকদের হতাশাগ্রস্থ ও নতুন বৈষম্য তৈরি করবে। এ নীতিমালার ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন তরুণ শিক্ষকরা।
বাংলাদেশে একজন শিক্ষক Lecturer হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর পিএইচডি অর্জন করতে অনেক সময় ৮-১০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, অর্থসংকট, প্রশাসনিক জটিলতা, ছুটি ও নানা বাস্তব সমস্যার কারণে এ সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে। আবার অনেক শিক্ষক পিএইচডি ছাড়াই দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। তাহলে প্রশ্ন হলো— পিএইচডি অর্জন না করা পর্যন্ত একজন তরুণ শিক্ষক কি স্বাধীন গবেষণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকবেন? তিনি কি বছরের পর বছর শুধু অন্য একজন পিএইচডিধারী শিক্ষকের Co-PI হিসেবেই কাজ করবেন? এখানে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি পর্যাপ্ত পিএইচডিধারী শিক্ষকই না থাকেন, তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কীভাবে Faculty Research-এর নেতৃত্ব দেবেন? গবেষণা বরাদ্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়বে না? ফলে একই নীতিমালা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হলেও এর বাস্তব প্রভাব সমান হবে না। পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেখানে বহু পিএইচডিধারী শিক্ষক রয়েছেন, সেখানে এ শর্তসহজেই পূরণ হবে। কিন্তু নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এতে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গবেষণাগত বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ ইউজিসি চাইলে গবেষণার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য অন্য পথও বেছে নিতে পারে।
PI হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু পিএইচডি ডিগ্রিকে প্রধান শর্ত না করে একটি Research Performance-Based মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একজন গবেষকের পূর্ববর্তী গবেষণা, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, Scopus বা Web of Science-ভুক্ত জার্নালে প্রকাশনা, গবেষণা প্রস্তাবের মান, গবেষণার প্রাসঙ্গিকতা এবং পূর্ববর্তী প্রকল্প বাস্তবায়নের সফলতা— এসব সূচক বিবেচনায় নিয়ে চও নির্বাচন করা যেতে পারে। ইউজিসি চাইলে একটি স্বাধীন Research Cell বা Expert Review Committee গঠন করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠানো গবেষণা প্রস্তাবগুলো অভিন্ন মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হলে স্বজনপ্রীতি, সিনিয়রিটির প্রভাব কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ভিন্ন মূল্যায়নের সুযোগও কমবে। একই সঙ্গে গবেষণার ফলাফলকেও মূল্যায়নের আওতায় আনা প্রয়োজন। কত টাকা ব্যয় হলো— তার পাশাপাশি গবেষণার ফল কী, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা হয়েছে কি না, নতুন জ্ঞান তৈরি হয়েছে কি না কিংবা নীতি প্রণয়ন ও সমাজে গবেষণাটির কী প্রভাব পড়েছে— এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। দীর্ঘদিন গবেষণার সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় গবেষণা তহবিলের যথাযথ ব্যবহার হয়নি— এটি অবশ্যই একটি সমস্যা। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে যদি গবেষণার নেতৃত্বের সুযোগ একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির শিক্ষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষ করে তরুণ শিক্ষকরা যদি মনে করেন পিএইচডি অর্জন না করা পর্যন্ত তারা স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে পারবেন না, তাহলে গবেষণার প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। অথচ আগামী দিনের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার বড় শক্তি এ তরুণ শিক্ষকরা। পিএইচডি একজন গবেষকের গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা; কিন্তু গবেষকের একমাত্র পরিচয় নয়।
গবেষণার মান নিশ্চিত করতে হলে শুধু ডিগ্রি নয়, গবেষকের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা, প্রস্তাবের মান এবং গবেষণার সম্ভাব্য প্রভাব— সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে। গবেষণার অর্থ শুধু একটি প্রকল্প অনুমোদন করা নয়; গবেষণা হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। তাই গবেষণা নীতিমালার লক্ষ্য হওয়া উচিত গবেষণার সুযোগ সংকুচিত করা নয়, বরং যোগ্য গবেষককে সামনে নিয়ে আসা। এরই মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নীতিমালা নিয়ে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গেছে, সম্প্রতি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নীতিমালা সংশোধনের জন্য মানববন্ধন ও হয়েছে।
ইউজিসির এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রেখে এ নীতিমালায় অল্প কিছু পরিবর্তন এনে তরুণ গবেষক ও শিক্ষকদের আরও বেশি উৎসাহী করে তুলবেন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
