ঢাকার পানি এবং মাথার চুল পড়া— সম্পর্কটি কতটা সত্য?

তাহমিদা খানম

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চুল পড়া নিয়ে অভিযোগ বাড়ছে। আঙুল উঠছে ঢাকার পানির দিকে। কিন্তু পানি কি সত্যিই দায়ী? ঢাকায় নতুন করে বসবাস শুরু করার পর অনেকেরই একটি অভিজ্ঞতা হয়— চুল আগের চেয়ে বেশি ঝরছে, রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে, মাথার ত্বক শুষ্ক লাগছে। কারও কারও মনে হয়, এর সঙ্গে ঢাকার পানির নিশ্চয়ই সম্পর্ক আছে। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এক বিষয় নয়। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত— ঢাকার পানিতে এমন কী আছে, যা চুল ও মাথার ত্বকে প্রভাব ফেলতে পারে? উপলব্ধ গবেষণা ও প্রতিবেদন বলছে, বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। আবার ঢাকার পানিকে সরাসরি চুল পড়ার কারণ বলার মতো প্রমাণও এখনো নেই।

২০১৯ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ঢাকা ওয়াসার সেবা নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ করে। সেখানে জরিপে অংশ নেওয়া ৫১.৫ শতাংশ গ্রাহক পানি অপরিষ্কার বলে জানিয়েছিলেন এবং ৪১.৪ শতাংশ দুর্গন্ধের অভিযোগ করেছিলেন। সেই বছরই হাইকোর্টে ঢাকা ওয়াসার দেওয়া প্রতিবেদনে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানির দূষণ নিয়ে অভিযোগের বিষয়টি উঠে আসে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ তালিকায় ৫৭ থেকে ৫৯টি এলাকার কথা বলা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থাৎ ঢাকার পানির মান নিয়ে সরকারি সংস্থা, আদালত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান— সব পর্যায়েই আলোচনা হয়েছে। কিন্তু পানিই কি চুল পড়ার কারণ? এখানে আসে 'কঠিন পানি'র প্রসঙ্গ।

পানিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো খনিজের পরিমাণ বেশি থাকলে তাকে সাধারণভাবে কঠিন পানি বলা হয়। ঢাকার কিছু এলাকায় পানির কঠোরতা নিয়ে গবেষণায় উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মিরপুরের ছয়টি স্থান থেকে ভূগর্ভস্থ পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেখানে পানির মোট কঠোরতা প্রতি লিটারে ৩৩০ থেকে ৯০০ মিলিগ্রাম পাওয়া যায়। গবেষণার ছয়টি নমুনাতেই কঠোরতার মাত্রা গবেষণায় ব্যবহৃত গ্রহণযোগ্য সীমার ওপরে ছিল। তবে মনে রাখতে হবে, এটি মাত্র ছয়টি স্থানের নমুনা— পুরো মিরপুর বা পুরো ঢাকার পানির চিত্র নয়।

এখন প্রশ্ন— এ কঠিন পানি কি চুলের ক্ষতি করে? আন্তর্জাতিক গবেষণার ফল এখানে একেবারে একমুখী নয়। একটি গবেষণায় কঠিন পানিতে ধোয়া চুলে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামজাত খনিজ জমার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্য একটি গবেষণায় শক্ত পানির সংস্পর্শে চুলের টান সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফল পাওয়া গেছে। তবে আরেক গবেষণায় কঠিন ও নরম পানির মধ্যে চুলের শক্তি ও স্থিতিস্থাপকতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, কঠিন পানি চুলের ওপর খনিজের আস্তরণ তৈরি করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে চুলকে রুক্ষ বা ভঙ্গুর করে তুলতে পারে— কিন্তু কঠিন পানি সরাসরি চুলের গোড়া নষ্ট করে চুল পড়ায়, এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। ঢাকার পানিতে শুধু কঠোরতাই সমস্যা নয়। ঢাকার পানির আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো দূষণ।

ঢাকার ৩৫টি স্থান থেকে সংগ্রহ করা কলের পানির নমুনা নিয়ে একটি গবেষণায় বিভিন্ন ভারী ধাতু পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় পারদ, ম্যাঙ্গানিজ ও লোহার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষণায় বিশেষ করে মাতুয়াইল ও জুরাইন এলাকার পানিদূষণের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে আসে। তবে এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি। ওই গবেষণা চুল পড়া নিয়ে করা হয়নি। তাই এই তথ্যের ভিত্তিতে বলা যাবে না যে মাতুয়াইল বা জুরাইনের বাসিন্দাদের পানি ব্যবহারের কারণে চুল বেশি পড়ে।

গবেষণাটি বরং একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে— আমরা যে পানি ব্যবহার করছি, তার রাসায়নিক গুণমান সম্পর্কে আমরা কতটা জানি? পানি শোধনাগার থেকে কল পর্যন্ত পথটিও গুরুত্বপূর্ণ। পানি শোধনাগার থেকে বের হওয়ার সময় পানি নিরাপদ থাকলেও সেটি বাসার কল পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে তার মান পরিবর্তিত হতে পারে। ২০১৯ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং পরবর্তী সময়ের আলোচনায় পুরোনো পাইপলাইন, পাইপের লিকেজ ও বাসাবাড়ির পানির ট্যাংককে সম্ভাব্য দূষণের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২ সালে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকও কিছু এলাকায় পুরোনো পাইপের লিকেজের কারণে দূষণের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন এবং পানি ফুটিয়ে পান করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

২০২৫ সালেও ঢাকার মিরপুর, গেণ্ডারিয়া, শান্তিবাগ, আগারগাঁও, রামপুরা, বনশ্রী, মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের দুর্গন্ধযুক্ত, ঘোলা ও পোকাযুক্ত পানি পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব প্রতিবেদন মূলত মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত; প্রতিটি এলাকার পানির রাসায়নিক পরীক্ষা এগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ফলে অভিযোগ এবং পরীক্ষাগারের প্রমাণকে এক করে দেখা যাবে না।

চুল পড়ার কারণ বহু রকম। বংশগত প্রবণতা, পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন, মাথার ত্বকের সমস্যা, কিছু শারীরিক অসুস্থতা এবং জীবনযাপনের পরিবর্তন— সবই ভূমিকা রাখতে পারে। একজন মানুষ ঢাকায় আসার পর যদি চুল বেশি পড়তে শুরু করেন, একই সময়ে তাঁর খাবার, ঘুম, মানসিক চাপ, প্রসাধনী এবং জীবনযাপনের ধরনও বদলে যেতে পারে। তাই শুধু সময়ের মিল দেখে পানিকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়। বরং বলা যায়, পানির মান কিছু মানুষের চুল ও মাথার ত্বকের সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে কি না— এটি আরও গবেষণার দাবি রাখে।

ঢাকার পানির কঠোরতা এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। পানি সরবরাহব্যবস্থা ও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট নিয়েও বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার পানির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং সেসব এলাকার মানুষের চুল পড়ার মাত্রার মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে কি না? এটি জানতে হলে একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার পানির নমুনা পরীক্ষা করতে হবে এবং সেই এলাকার মানুষের চুল পড়ার ধরনও বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, বংশগত কারণ, হরমোন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। তবেই বোঝা যাবে, চুল পড়ার পেছনে ঢাকার পানির ভূমিকা আসলে কতটা।

মূলত ঢাকার পানি চুল পড়ার একমাত্র বা নিশ্চিত কারণ— এমন প্রমাণ নেই। কিন্তু ঢাকার পানির মান নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে এবং পানির কঠোরতা, খনিজের আস্তরণ ও চুলের গুণগত পরিবর্তনের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাও আছে। চুল পড়ার অভিযোগকে তাই কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই, আবার পানিকে একমাত্র অপরাধী বানানোরও সুযোগ নেই।

প্রয়োজন-এলাকাভিত্তিক, নিয়মিত ও প্রকাশ্য পানির মান পরীক্ষা। কারণ যে পানি আমরা পান করি, সেই পানি দিয়েই আমরা প্রতিদিন মুখ ধুই, গোসল করি এবং চুল ধুই। আর হয়তো চুল পড়ার এই আপাত ছোট অভিযোগটিই আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে— ঢাকা কি আমাদের পানি দিচ্ছে নাকি ঝুঁকি?

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়