রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের চাওয়া
মো. তাহমিদ রহমান
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাষ্ট্র যখন একজন নাগরিককে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দিচ্ছে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে এবং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তখন সেই প্রক্রিয়ার শেষ প্রান্তে এসে যদি একজন যোগ্য প্রার্থী শুধু 'স্থায়ী বসতবাড়ি নেই' এ কারণে বাদ পড়ে যান, তাহলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক: রাষ্ট্র আসলে আসলেই কি বৈষম্যমুক্ত হতে পেরেছে? ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকার ভাড়াটিয়া বাসিন্দা মিশন আচার্যের ঘটনাটি সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে।
বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করেছেন। কিন্তু নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় তার স্থায়ী আবাসিক ঠিকানা বা নিজস্ব বসতবাড়ি না থাকার বিষয়টি সামনে আসে এবং এর ফলেই তিনি নিয়োগপত্র প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। এটি নিছক একজন চাকরিপ্রার্থীর দুর্ভাগ্য নয় বরং রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থা, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং নাগরিক অধিকারের সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে ভাবার মতো একটি ঘটনা। কারণ, একজন নাগরিকের নিজের নামে জমি বা বসতবাড়ি থাকা আর একজন নাগরিকের স্থায়ী নাগরিক পরিচয় থাকা দুটি এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ, নদীভাঙনপ্রবণ ও ব্যাপক অভিবাসনের দেশে কত মানুষ পৈতৃক ভিটা হারিয়েছেন, কত পরিবার ভাড়া বাসায় থাকেন, কত মানুষ কাজের প্রয়োজনে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বসবাস করেন তার হিসাব করলে নিজস্ব বসতবাড়ি কে নাগরিক পরিচয়ের পূর্বশর্ত বানানো কতটা বাস্তবসম্মত, সেটিই বড় প্রশ্ন।
পুলিশ ভেরিফিকেশন কি চরিত্র যাচাই, নাকি সম্পত্তি যাচাই? সরকারি চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশনের যৌক্তিকতা আছে। একজন প্রার্থী সম্পর্কে গুরুতর অপরাধ, জালিয়াতি, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড কিংবা পরিচয় গোপনের মতো বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন হতে পারে। রাষ্ট্র তার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তির পরিচয় ও অতীত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইতেই পারে। কিন্তু সেই যাচাইয়ের উদ্দেশ্য যদি ধীরে ধীরে 'ব্যক্তির চরিত্র ও পরিচয়' থেকে সরে গিয়ে 'তার নিজের বাড়ি আছে কি না' এতে পরিণত হয়, তাহলে প্রক্রিয়াটির উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একজন ভাড়াটিয়া কি কম নাগরিক? একজন ভূমিহীন কি কম বিশ্বস্ত? নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো একজন মানুষ কি রাষ্ট্রের কাছে কম যোগ্য? একজন ব্যক্তি যদি জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত সনদ, পরীক্ষার আবেদনপত্র এবং অন্যান্য সরকারি নথির মাধ্যমে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে তার নামে বাড়ি নেই এ তথ্যটি কীভাবে তাঁর চরিত্র বা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের নেতিবাচক প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়? এখানেই মিশন আচার্যের ঘটনা বৃহত্তর প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
'স্থায়ী ঠিকানা' এটি কি প্রশাসনিক প্রয়োজন, নাকি শ্রেণিগত ফিল্টার? বাংলাদেশের সরকারি ফরমে 'স্থায়ী ঠিকানা' দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা। কিন্তু বাস্তব জীবন অনেক বেশি জটিল। অনেকের জন্ম এক জায়গায়, পৈতৃক ঠিকানা অন্য জায়গায়, কর্মস্থল তৃতীয় জায়গায় এবং বর্তমান বাসস্থান চতুর্থ জায়গায়। কেউ ভাড়া থাকেন, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ মেসে, কেউ কর্মসূত্রে শহর বদলান। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে নিজস্ব বাড়ি না থাকা কোনো অপরাধ নয় বরং তা বাস্তবতার অংশ।
রাষ্ট্র যদি এমন একটি মানদণ্ড ব্যবহার করে যা সমাজের একটি বড় অংশের বাস্তব জীবনকে অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচনা করে, সেটি কি অনিচ্ছাকৃতভাবে শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্য তৈরি করছে না? সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে যদি শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স, মেধা, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল প্রধান মানদণ্ড হয়, তাহলে সম্পত্তির মালিকানা কেন অদৃশ্য আরেকটি যোগ্যতা হয়ে উঠবে? সেই সাথে এধরনের ভেরিফিকেশনের শতভাগ স্বচ্ছতা কোথায়? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো পুলিশ ভেরিফিকেশনে কোনো প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে তাকে কি স্পষ্ট কারণ জানানো হয়? সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে কি? একজন নাগরিক কীভাবে জানতে পারবেন, তার বিরুদ্ধে ঠিক কোন তথ্য বা প্রতিবেদন নেতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণ হয়েছে? প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যদি নাগরিকের জীবনের গতিপথ বদলে দেয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। 'পুলিশ প্রতিবেদন খারাপ' এমন অস্পষ্ট একটি বাক্য কোনো নাগরিকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। বিশেষ করে যখন তিনি একটি দীর্ঘ প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগপ্রক্রিয়ার সব ধাপ পেরিয়ে এসেছেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অবশ্যই উচিত স্পষ্ট করা কোন কোন কারণে পুলিশ ভেরিফিকেশনে একজন প্রার্থী বাদ পড়তে পারেন, কোন কারণগুলো আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য, কোন তথ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং প্রার্থী কীভাবে ভুল তথ্য সংশোধনের সুযোগ পাবেন।
মিশন আচার্য কি একা? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই। মিশন আচার্যের ঘটনা যদি সত্যিই এমন হয় যে শুধু নিজস্ব বসতবাড়ি না থাকার কারণে তিনি নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাহলে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ একই ধরনের পরিস্থিতিতে আরও কত মানুষ পড়েছেন, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান আমাদের সামনে নেই। মিশন আচার্যের বিষয়টি ফলাওভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে তাই হয়তো তিনি ভাগ্যগুণে নিয়োগপত্র পেয়ে গেলেন। কিন্তু এধরনের অসংখ্য ভূমিহীন কিংবা স্থায়ী ঠিকানাবিহীন চাকরিপ্রার্থী হয়তো পুলিশ ভেরিফিকেশনে আটকে গিয়ে আর কখনও অভিযোগ করেননি।
কেউ হয়তো বিষয়টি মেনে নিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। কেউ হয়তো আইনি লড়াই করার সামর্থ্য রাখেননি। আবার কেউ হয়তো জানেনই না যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ তার রয়েছে। সুতরাং প্রশ্নটি শুধু 'মিশন আচার্য চাকরি পেলেন কি পেলেন না' এতটুকু নয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের রাষ্ট্রে চাকুরির নিয়োগব্যবস্থায় এমন কোনো অদৃশ্য প্রক্রিয়া কেন থাকবে যা পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও আর্থসামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক মতাদর্শ, সম্পত্তি কিংবা ঠিকানার মতো বিষয়ের মাধ্যমে মানুষকে ছেঁটে ফেলে। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক, নাকি নাগরিকের কাছে রাষ্ট্র? একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র নাগরিকের কাছ থেকে পরিচয়, আইন মানার অঙ্গীকার ও প্রয়োজনীয় তথ্য চাইতে পারে।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে একজন নাগরিককে প্রমাণ করতে হয় যে তিনি 'যথেষ্ট স্থায়ী' নাগরিক। স্থায়ী নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে মানুষের বাড়ি থাকা যদি অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তাহলে দেশের ভূমিহীন, ভাড়াটিয়া, বাস্তুচ্যুত, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এবং কর্মসূত্রে স্থানান্তরিত মানুষের জন্য রাষ্ট্রের জায়গাটি কোথায়? রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকের পরিচয় নির্ধারিত হওয়া উচিত আইনি ও প্রামাণ্য নথিতে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণে নয়। তাই বাস্তবতার আলোকে প্রয়োজন আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও নাগরিকবান্ধব পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা।
ভেরিফিকেশনের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রকাশ করা উচিত। 'নিজস্ব বাড়ি নেই' এমন বিষয়কে নিজে থেকে নেতিবাচক যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না, যদি না কোনো নির্দিষ্ট আইনি বিধানে তার প্রয়োজন থাকে। সেই সঙ্গে নেতিবাচক প্রতিবেদন হলে প্রার্থীকে কারণ জানানো এবং ভুল তথ্য সংশোধনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার ওপর স্বাধীন প্রশাসনিক বা আপিল ব্যবস্থা থাকা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা, সরকারি চাকরি কোনো ব্যক্তির পারিবারিক সম্পত্তির পুরস্কার নয়; এটি যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ। মিশন আচার্যের ঘটনাটি তাই একটি ব্যক্তিগত বঞ্চনার গল্পের চেয়ে অনেক বড়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্রের ফাইলের ভেতরে নাগরিকের পরিচয় কখনও কখনও বাস্তব নাগরিক জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আর তখনই প্রশাসনিক নিয়ম ন্যায়বিচারের হাতিয়ার না হয়ে বঞ্চনার দেয়ালে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। একজন মানুষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন, রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেছেন তারপর যদি শেষ দরজায় এসে তাকে বলা হয়, 'আপনার নিজের বাড়ি নেই', তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে: রাষ্ট্র কি যোগ্য নাগরিক খুঁজছে, নাকি সম্পত্তির মালিক খুঁজছে? এ প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ নয়, আমাদের প্রশাসনিক ন্যায়বোধেরও পরীক্ষা।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
