প্রযুক্তির চাকচিক্যে আছে ফাঁদ

এআই শৈশবকে যেভাবে পুনর্লিখন করছে

জান্নাতুল রুহী

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চীনের খেলনা নির্মাতারা ২০২৫ সালকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বছর ঘোষণা করেছে। তারা এমন রোবট ও টেডি বিয়ার তৈরি করছে, যা শেখাতে পারে, খেলতে পারে এবং গল্প বলতে পারে। অন্যদিকে, বয়সে কিছু বড় শিশুরা ভাইরাল এআই ভিডিও এবং এআই-দ্বারা পরিচালিত গেমে মগ্ন হয়ে থাকে। বিদ্যালয়ে চ্যাটজিপিটির মতো টুল ব্যবহার করে অনেককে পড়ানো হচ্ছে। কেউ কেউ তো আবার চ্যাটবট শিক্ষকের সঙ্গেই পড়াশোনা করছে।

কাজ ও খেলাধুলা— এ দুই ক্ষেত্রেই এআই শৈশবকে যেন পুনর্লিখন করছে। এখানে থাকবে ব্যক্তিগত শিক্ষক, ব্যক্তিকেন্দ্রিক পাঠ্যক্রম এবং বিশেষভাবে তৈরি বিনোদন। অর্থাৎ, এটা এমন একটা শৈশবের প্রতি ঝোঁক দেখাচ্ছে, যেটা অতীতে শুধু ধনীদের জন্যই সম্ভব ছিল। শিশুরা নিজেদের নিয়ে রচিত গান শুনতে পারে, এমন গল্প পড়তে পারে, যেখানে তারাই প্রধান চরিত্র, এমনকি এমন ভিডিও গেমও খেলতে পারে, যেখানে তাদের দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হয়েছে। শুধু এটাই নয়, বরং তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্যও আছে অনেক চ্যাটবট বন্ধু। ফলে একসময়ের রাজাদের জন্য প্রযোজ্য শৈশব হয়তো সবার জন্যই এখন সাধারণ হয়ে উঠছে।

এ ধরনের একটা ভবিষ্যতে সুবিধার পাশাপাশি ফাঁদও আছে। এভাবে বিশেষভাবে গড়ে তোলা শৈশবও অনেক সময় একাকী ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। বাস্তব জগতের রাজারা প্রায়ই এমনটা উপলব্ধি করেন। আরও বড় বিষয় হলো, এ ধরনের পরিবেশ শিশুদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে মানানসই করে প্রস্তুত করতে পারে না। অর্থাৎ, এআই শিশুর শৈশবকে ভালো ও মন্দ— দুভাবেই পরিবর্তন করে দিচ্ছে। সুতরাং, শিশুদের এ বড় হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি নিয়ে সমাজকে নতুন করে ভাবতে হবে।

রোবটের মাধ্যমে শিশুকে লালন-পালন করার বেশ কিছু সুবিধা আছে। প্রযুক্তিবিষয়ক কোম্পানিগুলো এরইমধ্যে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে এআই কীভাবে শিক্ষাকে উন্নত করতে পারে। বিশেষ করে যেসব জায়গায় শিক্ষক বা শিক্ষাসামগ্রী কম। এটা সত্য যে, শুরুর পর্যায়ের সাক্ষরতা ও ভাষা শেখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল দেখা গেছে। তবে আশার কথা হলো, এআই শিক্ষকের সাহায্যে শিশুদের এমন শ্রেণিকক্ষের পাঠদান থেকে বাঁচানো যাবে, যেখানে পাঠদান করা হয় মাঝারি মানের শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে। এতে করে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিরক্ত হয় এবং কম দক্ষরা হারিয়ে যায়। আপনি যদি এ সম্পাদকীয়টি আট বছর বয়সী কোনো হিন্দিভাষী শিশুর জন্য উপযোগী করে চান, তাহলে এআই সেটিকে নতুন করে লিখে দিতে পারে। তারা যদি এটিকে কার্টুন বা গান হিসেবেও পেতে চায়, তাতেও কোনো সমস্যা নেই।

প্রযুক্তি নতুন ধরনের বিনোদনের জগৎও তৈরি করেছে। হলিউড হয়তো এআই-জেনারেটেড ভিডিওকে 'নিম্নমানের' কনটেন্ট বলে তাচ্ছিল্য করতে পারে। কিন্তু তরুণরা এগুলো খুবই আগ্রহভরে উপভোগ করছে এবং নিজেরাও বানাচ্ছে। পুরোনো খেলনাগুলোর নতুন সংস্করণ করা হচ্ছে। এআই-কর্তৃক পরিচালিত 'ট্রিভিয়াল পারস্যুট' (সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক বোর্ড গেম) সংস্করণটি যেকোনো বিষয়েরই প্রশ্নের উত্তর করতে পারে। ভিডিও গেমগুলোও নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করছে। যেমন : 'ফোর্টনাইট' গেমে ডার্থ ভেডারের সঙ্গে কথোপকথন করা।

এতে করে যেকোনো শিশু তাদের নায়কদের সঙ্গে দেখা করতে পারে (এবং তাদের গুলি করতেও পারে)।

বিকাশমান একটি প্রযুক্তির সঙ্গে শিশুদের অবাধভাবে মিশতে দেওয়ার ফলে তৈরি হওয়া সংকটগুলো নিয়ে এরইমধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে। এআই শিক্ষক কখনও কখনও ভুল উত্তরও তৈরি করে দ্বিধান্বিত করতে পারে। এমনকি খেলনাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সম্প্রতি দেখা গেছে, বিকৃত যৌনতার প্রসঙ্গ জুড়ে একটি এআই টেডি তার কথোপকথনে তা চালিয়ে যাচ্ছিল। তাই অভিভাবকদের অবশ্য কর্তব্যই হলো উপহার হিসেবে দেওয়া খেলনাগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখা। শিশুরা খুব সহজেই এআইয়ের অপব্যবহারও করতে পারে। যেমন : বাড়ির কাজের ক্ষেত্রে প্রতারণা করা বা 'ডিপফেক' ভিডিও দিয়ে একে অন্যকে হয়রানি করা। চ্যাটবট কখনও কখনও মানসিকভাবে দুর্বল কিশোর-কিশোরীদের নিজেদের ক্ষতি করতে উসকে দিতেও পারে। এসব বাধা বা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আশ্বস্ত করছে। চ্যাটজিপিটির বয়স এখনও মাত্র ৩ বছর।

এআই ঠিক যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবেই কাজ করতে পারলে শৈশবকে সবচেয়ে গভীরভাবে পরিবর্তন করতে পারবে। প্রযুক্তিগুলো দ্রুতই ব্যবহারকারীর পছন্দ বুঝে যায় এবং তাকে আরও বেশি করে সেটাই দেখায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডগুলো এরমধ্যেই এমন ইকো চেম্বার তৈরি করেছে, যেখানে মানুষ শুধু সেই মতামতই দেখে, যেগুলোর সঙ্গে তারা একমত (অথবা যেগুলোকে অপছন্দ করতে ভালোবাসে)। এ ইকো চেম্বারগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে এআই। শিশুদের অল্প বয়সেই এর ভেতরে আটকে দিতে পারে। যে শিশু ফুটবল পছন্দ করে, তার টেডি তাকে ফুটবলের গল্প শোনাতে পারে এবং তার এআই শিক্ষকও ফুটবলের উদাহরণ দিতে পারে। এতে শুধু আকস্মিক নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগই নষ্ট হয় না। বরং শুধু নিজের পছন্দের জিনিসের মধ্যেই আবদ্ধ থাকার অর্থ হলো, শিশুর আর অচেনা বা নতুন কিছু সহ্য করতে বা শেখার প্রয়োজনই বোধ করে না।

চ্যাটবটের সঙ্গে এ ধরনের একতরফা সম্পর্কও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। এসব এআই সঙ্গী কখনো সমালোচনা করে না, আবার নিজেদের কোনো অনুভূতিও ভাগ করে না। এরকম অপূর্ণ মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক আসলে প্রকৃত যোগাযোগ করার জন্য কোনো ভালো বিষয় নয়, মোটেই। আমেরিকার এক-তৃতীয়াংশ কিশোর-কিশোরী বলেছে, তাদের কাছে এআই সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার মতোই সন্তোষজনক। এমনকি এটা তাদের কাছে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে সহজ। এভাবে সব সময় ইতিবাচক কথা বলা বট শিশুদের এমনভাবে গড়ে তুলবে যে তারা পালা করে কথা বলা, বড় হয়ে এমন সহকর্মী হয়ে উঠবে, যারা সমঝোতা করতে পারবে না। কিংবা এমন সঙ্গী হতে পারে, যারা সম্পর্কের মধ্যকার প্রয়োজনীয় পারস্পরিক দেওয়া-নেওয়ার বিষয়টিও বুঝবে না।

একই প্রবণতাগুলো আরও শক্তিশালী করছে অন্যান্য কিছু পরিবর্তনও। জন্মহার কমে যাওয়ায় এখন কম শিশুই ভাইবোনের সঙ্গে বড় হচ্ছে। অথচ ভাইবোনই একসময় শিশুর আচরণের খারাপ দিকগুলো যথার্থ করে দিত। তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশের ধারণা তৈরি হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদি প্রেমের সম্পর্কে জড়ানো, অর্থাৎ ঝামেলা পোহানোর চেয়ে তা এড়িয়ে চলাই উত্তম। দূরবর্তী কাজের সুযোগের ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও অসামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ এমন পেশায় যুক্ত হতে পারছেন, যেখানে সহকর্মীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয় শুধু পর্দার মাধ্যমে। আর এআইয়ের কল্যাণে বর্তমানে সেই কাজকে বিরক্তিকর মনে হলে খুবই সহজেই তা ছেড়ে দিচ্ছেন কোনো এআই এজেন্টের হাতে।

কিছু প্রাথমিক প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া এখনই জরুরি। শুধু শব্দ আওড়ানো এমন যন্ত্রের হাতে সন্তানকে ছেড়ে দেওয়ার আগে অভিভাবকদের দুবার ভাবা উচিত। শব্দ আওড়ানো সেই যন্ত্র ভালুকের ভেতরে সেলাই করা থাকুক বা না থাকুক। চ্যাটবট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়সের সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং তা যথাযথভাবে কার্যকর করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে সরকারগুলো যে ছাড় দিয়েছিল, এআই কোম্পানিগুলোকে সেই ছাড় দেওয়া চলবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন শুধু অনেক চাপাচাপি করে বয়সভিত্তিক প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হচ্ছে। শিক্ষকরা যদি মনে করেন, বাড়িতে লেখা রচনাগুলো এখনও নির্ভরযোগ্য বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে তারা নিজেদেরই ভুল বোঝাচ্ছেন। এআইয়ের যুগে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের জন্য স্কুলের ভেতরে আরও বেশি পরীক্ষা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।

দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হলো গভীরভাবে ভেবে দেখা, এআই শিশুদের জীবন থেকে যে সামাজিকীকরণ মুছে দিতে পারে, তা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়। শৈশবের বড় অংশ কাটে স্কুলে, তাই এ কাজের জন্য স্কুলই সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষাদান যেহেতু কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে, সুতরাং স্কুলগুলোর উচিত সেই সুযোগ কাজে লাগানো। তবে একই সঙ্গে এমন কিছু শেখানোর প্রচেষ্টাও দ্বিগুণ করতে হবে, যা কোনো রোবট শেখাতে পারে না। যেমন: কীভাবে বিতর্ক করতে হয়, কীভাবে মতভিন্নতা সত্ত্বেও একসঙ্গে চলতে হয় এবং কীভাবে এমন মানুষের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতে হয়— এমনকি তাদের মূল্যায়ন করতেও শিখতে হয়— যারা চ্যাটবটের মতো সব সময় তোষামোদ করে কথা বলেন না।

সুখী রাজপুত্র, কিন্তু অন্তঃসারশূন্য রাজ্য : স্কুলগুলোকে আবিষ্কারের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে হবে। এআই যদি শিশুদের যা চাওয়া, তাই বেশি করে জোগায়, তাহলে স্কুলগুলোর জন্য এমন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এবং এমন সব ধারণার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ তৈরি করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার পরিধির বাইরে। অ্যালগরিদমভিত্তিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা সামাজিক গতিশীলতার পথে শক্তিশালী বাধা হয়ে উঠতে পারে, যদি তা মানুষকে জীবনের শুরুতে যে অবস্থানে ছিল, সেই গণ্ডির মধ্যেই আটকে থাকার জন্য প্ররোচিত করে। আবার দরিদ্র স্কুলগুলো যদি মানবশিক্ষকের সস্তা বিকল্প হিসেবে শুধু চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তাহলে সমাজে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এআই শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিনোদনকে সমৃদ্ধ করার জন্য অনেক সম্ভাবনাই দেখাচ্ছে। হয়তো একদিন এটা প্রতিটি শিশুকে রাজকীয় জীবনযাপনের সুযোগ করে দেবে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে লাভবান হবেন তারাই, যাদের বাবা-মা ও শিক্ষকরা জানেন, কখন এআই বন্ধ করে দিতে হবে।

(২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর দ্য ইকোনমিস্ট-এর কভার স্টোরি অবলম্বনে ভাষান্তর।)

 

লেখক : সাংবাদিক ও লেখক