পিচঢালা সড়ক যেন অকাল মৃত্যুর ফাঁদ
জান্নাত আক্তার শিলা
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মৃত্যু প্রকৃতিগত ধারাবাহিক নিয়ম তবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট এক অনাকাঙ্ক্ষিত আহাজারি। সড়ক দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি এক ধরণের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। বর্তমানে দেশের সড়কগুলো যেন এক একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। পিচঢালা সড়কে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে শত শত তাজা প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছে হাজারো মানুষ। একজন কর্মক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে গোটা পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসে। তারা তাদের আপনজন হারানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও অসহায় হয়ে পড়ে। একজন কর্মক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে শুধু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত নয় বরং দেশ হারাচ্ছে অর্থনীতিতে ভুমিকা রাখা একজন দক্ষ জনশক্তিকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অফ রোড সেফটি ২০১৮ এর তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ১৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। ৫-২৯ বয়সসীমার মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। ২০১৮ সালে রাজধানীসহ সারা দেশজুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন হয়। জনসাধারনের ধারণা ছিল এবার হয়তো সড়কের দৃশ্য পাল্টবে তবে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৬ হাজার ৯২৭টি। মৃত্যু হয়েছিল ৭ হাজার ২৯৪ জন এবং আহত হয়েছিল ১২ হাজার ১৯ জন। উক্ত সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৭ হাজার ৫৮৪টি। প্রাণ হারিয়েছিলেন ৭ হাজার ৩৫৯ জন এবং আহত হয়েছিলেন ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয় মোটর সাইকেল আরোহীরা। ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯ টি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছিল এবং নিহত হন ২ হাজার ৬৭২ জন। এ সংখ্যা মোট দুর্ঘটনার ৩৯.৯৩ শতাংশ এবং নিহতের সংখ্যা ৩৬.২৯ শতাংশ। সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী ৫ হাজার ৭২৩ জন কর্মক্ষম ব্যক্তি নিহত হয়েছিলেন, যা মোট নিহতের প্রায় ৭৮ শতাংশ। বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই দেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী এবং ৬১ জন শিশু রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী,সড়কে প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
উক্ত সংস্থার তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশ মোটর সাইকেল। আর মোটর সাইকেল চালকদের অধিকাংশই কিশোর ও যুবক। তাদের বেপরোয়া চলাচলে নিজেদের সাথে অন্যান্য যানবাহনের দুর্ঘটনা শিকার হচ্ছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তির মৃত্যুবরণ দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া যারা আহত হয় তারা পঙ্গুত্বের শিকার হয়ে আরও বেশি দুর্বিষহ জীবন যাপন করে। তারা পরিবারের কাছেও বোঝা স্বরুপ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ—
প্রথম : অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের অভাব : অনেক চালকই গাড়ি চালাতে শেখে আত্মীয়, বন্ধু বা নিজের চেষ্টায়— যা কখনোই পেশাদার প্রশিক্ষণের বিকল্প হতে পারে না। ফলে তারা ট্রাফিক আইন, জরুরি ব্রেকিং, ডিফেন্সিভ ড্রাইভিং বা রোড সিগন্যাল সম্পর্কে যথাযথ ধারণা রাখে না। এ অদক্ষতা বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত : ওভারস্পিডিং ও নিয়ন্ত্রণহীন গতি। গতি মানুষের একটি মানসিক উত্তেজনা তৈরি করে। এ উত্তেজনায় চালকরা গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, বিশেষ করে বাঁক বা ব্রেক নেওয়ার সময়। হাইওয়ে ও শহরের রাস্তায় দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ এটি। তৃতীয়ত : ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল। পুরোনো, ক্ষতিগ্রস্ত ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া গাড়ি রাস্তায় চললে যেকোনো সময় ব্রেক ফেল, চাকা ফেটে যাওয়া বা ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
চতুর্থত : রাস্তাঘাটের করুণ অবস্থা। বাংলাদেশের অনেক রাস্তা দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় গর্তযুক্ত, অসম ও সংকীর্ণ। বৃষ্টির দিনে এগুলো আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
পঞ্চমত : চালকের ক্লান্তি, ঘুমের ঝোঁক বা নেশায় আসক্ত থাকা। অনেক চালক দিনের পর দিন ১০-১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ড্রাইভ করে। পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রাম না পেলে তারা হাই তুলতে শুরু করেন, চোখ বন্ধ হয়ে আসে, রিফ্লেক্স ধীর হয়ে যায় এবং নেশায় আসক্ত থাকার নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে যা হঠাৎ বিপদে প্রাণঘাতী হতে পারে।
ষষ্ঠ : ট্রাফিক আইন না মানা ও সিগন্যাল অমান্য করা। অনেক চালকই সিগন্যাল লাল থাকলেও তা অমান্য করে। আবার মোড় ঘোরার আগে ইন্ডিকেটর না দেওয়া, ইউ-টার্ন নিয়ম না মানা এসবও দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ায়।
সপ্তম : রাস্তার পাশে অবৈধ পার্কিং ও দোকান বসানো। মার্কেট এলাকা, মেইন রোড বা হাইওয়ের পাশে দোকান বসানো ও অবৈধ পার্কিং গাড়ির চলাচলের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ফলে দুর্ঘটনা সহজেই ঘটে। অষ্টম : জনসচেতনতার অভাব। অনেক মানুষ জানে না কোন দিক দিয়ে রাস্তা পার হতে হয়, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে হয় ইত্যাদি। সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়, তবে কিছু উপায়গুলোর মাধ্যমে অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। যেমন— সরকার অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা। ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুতে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা কঠোরভাবে নেওয়া। অনলাইন ও অফলাইন সচেতনতামূলক ক্লাস চালু করা। সড়কে স্পিড লিমিট বোর্ড স্থাপন এবং তার পাশে স্পিড ক্যামেরা বসানো। ওভারস্পিডিং করলে ডিজিটালভাবে জরিমানা করা। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ক্যাম্পেইন ও রোডশো আয়োজন।
প্রতি বছর বাধ্যতামূলক ফিটনেস সনদ নবায়ণ করা। অনলাইন ফিটনেস চেকিং সিস্টেম চালু করে ডিজিটাল রেকর্ড রাখা। ফিটনেসবিহীন গাড়ির চালকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। নিয়মিত সড়ক সংস্কার ও মানসম্পন্ন নির্মাণকাজ নিশ্চিত করা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত আলো স্থাপন। বিকল্প রুট ও বাইপাস সড়ক তৈরি করা। সিগন্যাল সিস্টেমকে স্বয়ংক্রিয় ও শক্তিশালী করা। ডিজিটাল ট্রাফিক মনিটরিং ক্যামেরা বসিয়ে আইন অমান্যকারীর জরিমানা প্রণয়ন করা। গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাফিক আইন বিষয়ক প্রচার। সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান। রাস্তার পাশে সাইনবোর্ডে 'পার্কিং নিষিদ্ধ' এবং শহরে মাল্টিস্টোরি পার্কিং ফ্যাসিলিটি তৈরি করা। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ট্রাফিক আইন বিষয়ে শিক্ষা প্রদান। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে যেমন চালকের ভুল ভূমিকা থাকে, তেমনি রাস্তাঘাট, ট্রাফিক ব্যবস্থা, যাত্রী ও পথচারীর আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। সম্মিলিত উদ্যোগ, সচেতনতা এবং কার্যকর প্রতিকারের মাধ্যমে এ মৃত্যু মিছিল অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। নিয়ম মেনে সর্তকতার সহিত জীবনযাপনই নিরাপদে ঘরে ফেরা নিশ্চিত করতে পারে।
লেখক : শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ
