জনস্বার্থে চাই দায়িত্বশীলতা ও দৃশ্যমান পরিবর্তন
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
জনগণের সরকার মানে শুধু নীতিনির্ধারণ বা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ নয়; মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা বোঝা, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নাগরিকদের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে সরেজমিন পরিদর্শন, মানুষের কথা শোনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কয়েকটি আকস্মিক পরিদর্শন এ বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে। ১৭ অক্টোবর রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট পরিদর্শনে গিয়ে এক চিকিৎসককে নিজ কক্ষে ধূমপান করতে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। কক্ষটির অপরিচ্ছন্ন পরিবেশও তার নজরে আসে। এ ঘটনায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে হাসপাতালের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে ওই চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে বাসসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। হাসপাতাল এমন একটি জায়গা, যেখানে অসুস্থ শিশুদের সুস্থ করে তোলার জন্য চিকিৎসা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ— দুটিই অপরিহার্য। সেখানে চিকিৎসকের দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। বিশেষ করে শিশুদের মতো সংবেদনশীল রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রে ধূমপান জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগজনক। এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগে পরিচ্ছন্নতা, ধূমপানমুক্ত পরিবেশ ও পেশাগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই দিন আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টার পরিদর্শনে গিয়ে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই সপ্তাহ সময় দেন তিনি। এ সময় বাসিন্দারা পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাদের অভিযোগ তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী সেসব অভিযোগ শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। রাজধানীর সরকারি আবাসিক এলাকাগুলোতে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন শুধু থাকার জায়গা নয়; সেখানে শিশু, নারী, প্রবীণসহ নানা বয়সী মানুষ বসবাস করেন। তাদের সুস্থ ও নিরাপদ জীবনযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। দুই সপ্তাহের সময়সীমা নির্ধারণের ফলে কাজের অগ্রগতি মূল্যায়নের একটি নির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং পরবর্তী সময়ে তা বজায় রাখা। এদিকে মিরপুর-১০ এলাকায় দখলমুক্ত ফুটপাত পরিদর্শন করে পথচারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাদের চলাচলের সুবিধা-অসুবিধা জেনে ফুটপাতকে পথচারীবান্ধব রাখা এবং সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। নগরজীবনে ফুটপাতের গুরুত্ব অপরিসীম। নিরাপদে হাঁটার সুযোগ নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজনের অংশ। ফুটপাত দখলমুক্ত থাকলে শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সাধারণ পথচারীরা উপকৃত হন। তবে হকারদের জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় রেখে আইনসম্মত ও মানবিক সমাধান খুঁজতে হবে। এসব ঘটনার মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র রয়েছে— জনস্বার্থে দায়িত্বশীলতা, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্ব পালনে সচেতন করতে পারে। কিন্তু কোনো সমস্যার সমাধান এক দিনের পরিদর্শন কিংবা তাৎক্ষণিক নির্দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সরকারি হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা ও নগরীর ফুটপাত— সব ক্ষেত্রেই নিয়মিত তদারকি, কার্যকর অভিযোগ গ্রহণব্যবস্থা এবং দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কাজের অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগগুলো ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রত্যাশা, পরিদর্শনের নির্দেশগুলো বাস্তবায়িত হবে, সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং নাগরিকরা তার সুফল পাবেন। কারণ, জনগণের আস্থা অর্জিত হয় প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং দায়িত্বশীলতা ও দৃশ্যমান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
