সন্তুষ্টি আছে; কিন্তু স্বস্তি নেই
সাঈদ বারী
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের ১৮০ দিনের কাজ নিয়ে একটি জাতীয় জনমত জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। জরিপটির সবচেয়ে আলোচিত তথ্য ছিল, ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট। সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য স্বস্তিদায়ক। বিশেষ করে একটি নির্বাচিত সরকারের প্রথম ৬ মাসে জনসমর্থনের এমন চিত্র রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই জরিপের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক বোধ হয় এ ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ নয়; বরং এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা কিছু বৈপরীত্য। মানুষ প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের কাজকে মোটামুটি ইতিবাচক চোখে দেখছে, অথচ একই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নিত্যপণ্যের দাম, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের উদ্বেগ যথেষ্ট প্রবল।
অর্থাৎ সরকারের প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে; কিন্তু মানুষের জীবনে এখনও স্বস্তি তৈরি হয়নি। এই দুই বাস্তবতাকে একসঙ্গে বুঝতে না পারলে জরিপের প্রকৃত বার্তাটি ধরা যাবে না। জরিপে দেখা গেছে, ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাজে সন্তুষ্ট। ২১ দশমিক ৬ শতাংশ বলেছেন, তারা সন্তুষ্ট নন এবং ১২ দশমিক ১ শতাংশ কোনো মতামত দেননি। সরকারের কাজ সম্পর্কে ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ ভালো মত দিয়েছেন, বিপরীতে ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ খারাপ বলেছেন। আবার দেশের গতিপথ সঠিক বলে মনে করছেন ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ, ভুল পথে চলছে বলে মনে করছেন ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো উত্তর দেননি।
এ পরিসংখ্যানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত ছিল। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সন্তুষ্টির হার দেশের সামগ্রিক গতিপথ সম্পর্কে আশাবাদের হারের চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে বা তাঁর কাজের প্রতি যে আস্থা দেখিয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে সেই আস্থা এখনও ততটা দৃঢ় নয়। এটি সরকারের জন্য একই সঙ্গে সাফল্য এবং সতর্কবার্তা। জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের মূল্যায়নে বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা ও আয়ের বিভিন্ন শ্রেণিতেই প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্টির হার ৬১ দশমিক ৭ থেকে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে। আটটি বিভাগের প্রতিটিতেই সন্তুষ্টির হার ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ বা তার বেশি। অর্থাৎ এটি কোনো একটি অঞ্চল বা বিশেষ শ্রেণির বিচ্ছিন্ন মত নয়। বিভিন্ন শ্রেণি ও অঞ্চলে সরকারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের একটি বিস্তৃত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল, বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর কাজ নিয়ে সন্তুষ্টির একটি উল্লেখযোগ্য হার পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ, জাতীয় নাগরিক পার্টির সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সন্তুষ্ট। এ তথ্য রাজনৈতিক বিভাজনের প্রচলিত ধারণাকে কিছুটা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
কারণ কোনো সরকারের প্রতি সমর্থন শুধু দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না। মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন, পরিবার, আয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ দিয়ে সরকারকে বিচার করে। একজন জামায়াত সমর্থক বা এনসিপি সমর্থক যদি সরকারের কাজকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন, তাহলে তার অর্থ হতে পারে, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে সরকারের কিছু কাজ সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করছে। তবে এখানেই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় তর্কবার্তা।
দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, এ প্রশ্নের উত্তরে ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কথা বলেছেন। ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ বলেছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের কথা। আইনশৃঙ্খলাকে বড় সমস্যা মনে করেছেন ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানকে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি এখন রাজনৈতিক স্লোগান নয়, দৈনন্দিন জীবন।
সরকারের কোন কাজগুলো সবচেয়ে খারাপ হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর আরও সরাসরি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে খারাপ বলেছিলেন ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ, জ্বালানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে এই হার ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ। এর অর্থ খুব পরিষ্কার। সরকার সামগ্রিকভাবে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেলেও অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে এখনও মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এখানে সরকারের আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
কারণ রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা এবং অর্থনৈতিক স্বস্তি এক জিনিস নয়। কোনো সরকার রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় থাকতে পারে; কিন্তু যদি বাজারে গিয়ে একজন মানুষ আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারেন, বিদ্যুতের বিল বা জ্বালানির ব্যয় বেড়ে যায়, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে সেই জনপ্রিয়তার ভিত ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। মানুষ প্রথমে সরকারের উদ্দেশ্যকে সমর্থন করে, পরে ফলাফল দিয়ে বিচার করে।
জরিপের ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত তথ্যটি তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এক বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের অবস্থা খারাপ হয়েছে। মাত্র ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, ভালো হয়েছে। আগামী ১২ মাসে পরিবারের অবস্থা ভালো হবে বলে আশা করছেন ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ, আর ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ মনে করছেন অবস্থা খারাপ হবে। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ আগের চেয়ে বেশি আশাবাদী হলেও ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ কম আশাবাদী।
এখানে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা ধরা পড়ছে। মানুষ বর্তমান সরকারকে নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে, কিন্তু নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে পারে। এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ রাজনৈতিক সরকারের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে উন্নতির অনুভূতি। সুতরাং জরিপের ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশকে সরকারের জন্য একটি 'চেক' বলা যায়, কিন্তু এখনই সেটিকে 'ফাইনাল সার্টিফিকেট' বলা যাবে না।
বরং এটিকে ৬ মাসের একটি মধ্যবর্তী মূল্যায়ন হিসেবে দেখা উচিত। সরকার এখনো মানুষের কাছে প্রত্যাশার জায়গায় আছে। এ প্রত্যাশাই তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে একই মানুষ দ্রুত হতাশও হতে পারেন।
রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু ধরে রাখা আরও কঠিন। জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানুষ সরকারকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে বিচার করছে না। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির প্রতি ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের সমর্থন, সংবিধান সংস্কৃতির প্রতি ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ সমর্থন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষে উচ্চ সমর্থন দেখায় যে মানুষ সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষার উদ্যোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
অর্থাৎ মানুষ পরিবর্তন চায়; কিন্তু সেই পরিবর্তনের বাস্তব সুফলও দেখতে চায়।
এখানে সরকারের সামনে একটি ভারসাম্যের প্রশ্ন আছে। রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি সফল করা সম্ভব নয়।
সরকারের উচিত এ জরিপকে প্রশংসাপত্র হিসেবে না দেখে আয়না হিসেবে দেখা। আয়নায় যেমন ইতিবাচক চেহারা দেখা যাচ্ছে, তেমনি কিছু স্পষ্ট দাগও দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সন্তুষ্টি আছে; কিন্তু অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ আছে। সরকারের কাজ নিয়ে আস্থা আছে; কিন্তু পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। দেশের গতিপথ নিয়ে আশাবাদ আছে; কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এখনও মনে করেন দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। এ বৈপরীত্যই জরিপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
রাজনীতিতে ৬ মাস খুব বেশি সময় নয়। আবার একটি সরকারের জন্য ৬ মাস একেবারেই কম সময়ও নয়। এ সময়ের মধ্যে মানুষ বুঝতে শুরু করে সরকার কোন দিকে যাচ্ছে। এখনও যদি জনমনে সরকারের প্রতি ইতিবাচক প্রত্যাশা থাকে, তাহলে সেটি ধরে রাখার দায়িত্ব সরকারেরই। সেই দায়িত্ব বক্তৃতা দিয়ে নয়, ফলাফল দিয়ে পালন করতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখন সরকারের সবচেয়ে জরুরি পরীক্ষা। কারণ মানুষের রান্নাঘর, বাজারের ব্যাগ এবং মাসের শেষে পরিবারের হিসাবের খাতাই শেষ পর্যন্ত সরকারের সবচেয়ে কঠিন জনমত জরিপ। ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাজে সন্তুষ্ট। আগামী জরিপে এই সংখ্যা বাড়বে, না কমবে, তার উত্তর নির্ভর করবে সরকার আগামী ছয় মাসে মানুষের জীবন কতটা সহজ করতে পারে তার ওপর। জনমতের এ জরিপ তাই সরকারের জন্য আনন্দের খবরের চেয়ে বেশি কিছু। এটি একটি সতর্কসংকেতও। জনগণ আস্থা দেখিয়েছে। এখন সেই আস্থার প্রতিদান দেওয়ার পালা।
লেখক : প্রকাশক ও কলাম লেখক
