পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়তে চাই সম্মিলিত উদ্যোগ
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা শুধু একটি রাজধানী নয়, এটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের ঠিকানা। অথচ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, যত্রতত্র ময়লা ফেলা এবং নাগরিক অসচেতনতার কারণে শহরটির পরিচ্ছন্নতা ও বাসযোগ্যতা আজ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক আহ্বান— 'নিজের সন্তানের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, একটি স্বাস্থ্যকর শহর গড়ে তুলি'— ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নগর ভবন পরিদর্শনকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সন্তান শুধু নিজের বাসার আশপাশে থাকে না; স্কুল, কলেজ, খেলার মাঠসহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করে। তাই শুধু নিজের এলাকার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করলেই চলবে না, পুরো শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, নগরীর কোনো একটি এলাকার ময়লা-আবর্জনা অন্য এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশকেও প্রভাবিত করতে পারে। পরিচ্ছন্নতা কোনো বিচ্ছিন্ন এলাকার সমস্যা নয়; এটি পুরো নগরীর সম্মিলিত দায়িত্ব। ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে প্রথমেই প্রয়োজন নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলা এবং দ্রুত তা অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা। বাসাবাড়ি, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে উৎপন্ন বর্জ্য পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। সড়ক, নালা ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা বন্ধে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইন প্রয়োগেও কার্যকর হতে হবে। বিশেষ করে প্লাস্টিক ও পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং যত্রতত্র ফেলে দেওয়ার কারণে সৃষ্ট পরিবেশদূষণ রোধে ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়মিত কার্যক্রম তদারক, বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, নালা-নর্দমা পরিষ্কার রাখা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। কোথায় ময়লা জমছে, কোথায় বর্জ্য অপসারণে ঘাটতি রয়েছে, কোথায় সড়ক বা নালার উন্নয়ন প্রয়োজন— এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি থাকতে হবে। শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ নয়, পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ও ফলাফল মূল্যায়নও জরুরি। প্রধানমন্ত্রী লন্ডনের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ও নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে একটি শহরের পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। এ থেকে বোঝা যায়, ঢাকা রাতারাতি পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে না। প্রয়োজন ধারাবাহিক কর্মপরিকল্পনা, পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহি। পাশাপাশি নাগরিকদেরও নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলা, যত্রতত্র থুতু না ফেলা, পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজে সহযোগিতা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিচ্ছন্ন শহর গড়ার উদ্যোগে প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি পরিচালন কেন্দ্রের মাধ্যমে আবহাওয়া, বন্যার পূর্বাভাস, ভূমিকম্পের তথ্য ও বায়ুর মান পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নগরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ এবং সমস্যা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যেতে পারে। তবে প্রযুক্তির সুফল পেতে তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও বাস্তব পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়ার দায়িত্ব শুধু সরকার বা সিটি করপোরেশনের নয়; এটি নাগরিকেরও দায়িত্ব। কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি, কর্মীদের আন্তরিকতা এবং মানুষের সচেতনতা একসঙ্গে কাজ করলেই পরিবর্তন সম্ভব। নিজের সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রত্যেক নাগরিক যদি শহরকে নিজের বাড়ির মতো পরিচ্ছন্ন রাখার অঙ্গীকার করেন, তাহলেই গড়ে উঠতে পারে স্বাস্থ্যকর, সুন্দর ও বাসযোগ্য ঢাকা।
