দেশে লিভার প্রতিস্থাপন

আশার নতুন দিগন্ত

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লিভারের জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে দেশে লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রতি মাসে চারটি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে মাসে দুটি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে উন্নত চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়বে, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমবে এবং বহু রোগীর জীবন রক্ষার সুযোগ তৈরি হবে।

লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার ও লিভার বিকল হওয়ার মতো জটিল রোগের শেষ পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনই কার্যকর চিকিৎসা হয়ে ওঠে। অথচ দেশে প্রয়োজনের তুলনায় লিভার প্রতিস্থাপনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর এক হাজারের বেশি মানুষের লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে সীমিত সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১৩টি লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার তথ্য চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরে। বিএমইউর নেতৃত্বে এ পর্যন্ত আটটি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ ছয়টি প্রতিস্থাপন সরকারি অর্থায়নে বিনা মূল্যে করা হয়েছে। এতে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহযোগিতা এবং বিভিন্ন বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

লিভার প্রতিস্থাপনের ব্যয়ও বড় একটি বাধা। বিদেশে এ চিকিৎসায় কয়েক দশ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। দেশে সরকারি সহায়তায় চিকিৎসার সুযোগ বাড়লে রোগীদের আর্থিক চাপ কমবে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। তবে প্রতিস্থাপন কর্মসূচি সম্প্রসারণের পাশাপাশি চিকিৎসার মান, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী পরিচর্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিস্থাপনের পর রোগীকে আজীবন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন করতে হয়। তাই শুধু অস্ত্রোপচারের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না, পরবর্তী চিকিৎসার ব্যয়ও রোগীর সামর্থ্যের মধ্যে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে জীবিত দাতার নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। একজন সুস্থ মানুষের লিভারের অংশ দান করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার নিজের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের বিষয় জড়িত। দাতার শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রস্তুতি এবং স্বেচ্ছায় দানের বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। আর্থিক লেনদেন বা কোনো ধরনের চাপের মাধ্যমে অঙ্গদানের ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে মৃত ব্যক্তির অঙ্গদানের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে ভবিষ্যতে প্রতিস্থাপনের সুযোগ আরও বাড়তে পারে। লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, আধুনিক অস্ত্রোপচারকক্ষ, নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র এবং নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ অপরিহার্য। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয়, চিকিৎসকদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি রোগীদের জন্য স্বচ্ছ ব্যয়কাঠামো ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিএমইউর পরিকল্পনা সফল হলে তা দেশের লিভার প্রতিস্থাপন চিকিৎসায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং জবাবদিহি। মানুষের জীবন রক্ষাকারী এই চিকিৎসাকে যেন শুধু সামর্থ্যবানদের সুযোগে সীমাবদ্ধ থাকতে না হয়। দেশে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত লিভার প্রতিস্থাপনসেবা গড়ে তোলাই হোক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অঙ্গীকার।