রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে প্রয়োজন সৎ অভিজ্ঞ ও যোগ্য এমডি
রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্র মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) ও বেসিক ব্যাংকের এমডিদের চুক্তি বাতিল করে সরকার। এরপর নতুন করে এ পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পৃথক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনে তিন এমডির চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের কথা জানানো হয়। এরমধ্যেই তিন ব্যাংকের এমডির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের সুপারিশের চিঠি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো পেয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী কর্মদিবস থেকে তিনি আর এমডি থাকবেন না।
নতুন এমডি নিয়োগ হওয়ার আগ পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ একজন ডিএমডিকে চলতি দায়িত্বের এমডি দেওয়া হবে। বেসরকারি খাত থেকে এসব ব্যাংকে দক্ষ এমডি আনা হতে পারে, এমন আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক ছাড়া বাকিগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেশি। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। নতুন নীতিমালায় বিশেষ দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সুনামসম্পন্ন প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এমডি পদের অব্যবহিত আগের পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকার বাধ্যবাধকতা শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ফলে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা না থাকলেও যোগ্য কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের জন্য বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক পদে মনোনয়ন, নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নীতিমালা, ২০২৬' জারি করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। নতুন নীতিমালায় গত ২৬ জুলাই জারি করা নীতিমালাটি রহিত করা হয়েছে। এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর অগ্রণী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) শীর্ষ নির্বাহীকে অপসারণ করা হয়েছিল। সে হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি পদই এখন শূন্য।
২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এসব ব্যাংক এমডিকে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ জারীকৃত নীতিমালায় বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি বা সিইও পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থীকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় কর্মকর্তা হিসেবে কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হবে। পাশাপাশি তাকে বর্তমানে বা আগে কোনো ব্যাংকের এমডি বা সিইও পদে কর্মরত থাকতে হবে, অথবা ওই পদের অব্যবহিত আগের পদে কমপক্ষে দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
তবে বিশেষ দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সুনামসম্পন্ন প্রার্থীর ক্ষেত্রে এ দুই বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করা যাবে। এমডি পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থীকে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তত স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণী গ্রহণযোগ্য হবে না। এ ছাড়া প্রার্থীর চাকরিজীবনের সব পর্যায়ে সততা, সুনাম ও সন্তোষজনক কর্ম রেকর্ড থাকতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন মোকাবেলা সম্পর্কেও পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে।
নতুন নীতিমালায় এমডি নিয়োগের প্রক্রিয়ায় বাছাই কমিটির সুপারিশ, প্রার্থীর গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনার বিধান রাখা হয়েছে। বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতিক্রমে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেবে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ডিএমডি পদে কমপক্ষে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসহ নবম গ্রেড থেকে অন্তত ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতার শর্ত বহাল রাখা হয়েছে। ফলে অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিলের সুযোগটি সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি পদের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। নীতিমালায় এমডি পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজনে সরকার ও পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশ অনুযায়ী পুনর্নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাকগুলোর বিদ্যমান ডিএমডিদের মধ্যে এমডি পদে উপযুক্ত ব্যক্তি খুঁজে না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত নীতিমালাই সংশোধন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর উচ্চ পদে পদোন্নতিতে এর আগে রাজনৈতিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছিল। এ কারণে যোগ্য ও দক্ষ ব্যাংকাররা ডিএমডি হতে পারেনি। ফলে এ ব্যাংকগুলোর নেতৃত্ব পর্যায়ে বড় ধরনের শূন্যতা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব এমডিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তারাও যোগ্য ছিলেন না। এ কারণে গত দুই বছরে এমডিরা ব্যাংকের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছেন। এখন যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের স্বার্থে নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে যোগ্য ব্যক্তি খুঁজে না পাওয়া গেলে প্রয়োজনে বেসরকারি ব্যাংক থেকে এমডি নিয়োগ দেয়া হবে।
দেশের সরকারি মালিকানাধীন ৯টি ব্যাংকের মধ্যে বর্তমানে সোনালী ছাড়া সবক'টি ব্যাংকই লোকসানে রয়েছে। বিতরণকৃত ঋণের প্রায় অর্ধেক খেলাপি হয়ে যাওয়ায় এ ব্যাংকগুলো বিপুল মূলধন ঘাটতিও রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ নিয়ে ব্যাংকিং খাতে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা এমডি পদে পদোন্নতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষ থেকে এমডি পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানা গেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক কর্মকর্তার শাখা ব্যবস্থাপনা, ঋণ প্রশাসন, বৈদেশিক বাণিজ্য, নিরীক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ এবং প্রধান কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের অনেকে বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বও দিয়েছেন। ফলে যোগ্য কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করে শীর্ষ পদে পদোন্নতির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। পদোন্নতি নীতিমালার সব শর্তপূরণ করেও অনেক কর্মকর্তা বছরের পর বছর পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে যোগ্য, দক্ষ, মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তা রয়েছেন। দীর্ঘদিন পদোন্নতি না পাওয়ায় এসব কর্মকর্তার মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও রয়েছেন, যারা পদোন্নতি নীতিমালায় উল্লেখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করেছেন। কেউ কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন।
অনেকের ডিএমডি পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। এরপরও তাদের এমডি পদে বিবেচনা করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ডিএমডি পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্য থেকে পদোন্নতি না দিয়ে ওই শর্ত শিথিল করা হয়েছে। মূলত পূর্বনির্ধারিত প্রার্থীদের সুযোগ করে দিতেই এ ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। একসঙ্গে সবার আগে জিএম পদে পদোন্নতি পেয়েও পরবর্তী সময়ে কোনো তদবির না থাকায় এমডি হতে পারেননি এমন অনেক দক্ষ, অভিজ্ঞ ব্যাংকার রয়েছেন। এক বছরে তিনবার নীতিমালা পরিবর্তন নিয়েও কথা উঠেছে এখন ।
এমডি পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়ে আলোচনার মধ্যে গত ১৯ অক্টোবর পদোন্নতি নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে ডিএমডি পদে ২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার বাধ্যবাধকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এক বছরে পদোন্নতি নীতিমালায় তিনবার পরিবর্তন আনার বিষয়টিও কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, চাকরির মেয়াদ, পদমর্যাদা ও কর্মদক্ষতার মানদণ্ড স্পষ্ট থাকলে কর্মকর্তারা তাদের পেশাগত অগ্রগতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান। একই সঙ্গে ব্যাংকও যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই করতে পারে।
আসলে নীতিমালার শর্ত বারবার পরিবর্তন হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যোগ্যতা অর্জন করা কর্মকর্তারা নতুন শর্তের কারণে প্রতিযোগিতার বাইরে চলে গেলে তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।পূর্বনির্ধারিত প্রার্থীদের নিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে নীতিমালায় পরিবর্তন আনার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। নীতিমালার পরিবর্তনের কারণ, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং পরিবর্তনের পর নিয়োগের ফলাফল পর্যালোচনা করা হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের দাবি রয়েছে বহু দিন ধরে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিস্থিতিতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
খেলাপি ঋণ, আর্থিক শৃঙ্খলা, সুশাসন, ব্যাংক শক্তিশালীকরণে ভূমিকা, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অবদান এবং পেশাগত সততাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কাজ করা কর্মকর্তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন করা দরকার। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে অন্য ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান থেকে আসা প্রার্থীদেরও একই স্বচ্ছ ও অভিন্ন মানদণ্ডে বিবেচনা করা যেতে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না— আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এমন বক্তব্য নিয়েও খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের ব্যাংক পরিচালনা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের মধ্যে কতজন এমডি পদে নিয়োগের নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করছেন এবং তাদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন ব্যাংকে এমডি পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থী নেই— এমন বক্তব্যের ক্ষেত্রে যোগ্যতা পূরণকারী কর্মকর্তাদের সংখ্যা, তাদের অভিজ্ঞতা এবং মূল্যায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা হলে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি কমবে।
এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের কোনো পরিকল্পনা থাকলে তার নীতিগত ভিত্তি, যোগ্যতার মানদণ্ড ও নিয়োগপ্রক্রিয়াও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল নীতিমালা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নীতিমালা পরিবর্তন করা হলে তার যৌক্তিকতা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সব যোগ্য প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষের পছন্দ বা প্রভাবের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এতে একদিকে যোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও দক্ষ নেতৃত্ব পাবে। একথা ভুলে গেলে চলবে না, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদ শুধু একটি চাকরির পদ নয়। এর সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থ, ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির বিষয় জড়িত। তাই শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে ব্যাপক লুটপাট করেছে স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের দোসররা।
স্বৈরাচারী সরকারের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরবে ভাবা হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বিশেষ ব্যবস্থায় হাজার হাজার কোটি তারল্য সহায়তা দিয়েও ব্যাংকগুলোকে টেনে তোলা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ভেতর থেকেই ভেঙে পড়ছিল। যদিও খেলাপি ঋণই ব্যাংকের একমাত্র সমস্যা নয়। তীব্র মূলধন ঘাটতি, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে কম পরিমাণ বরাদ্দ, প্রভিশন ঘাটতি ও কমতে থাকা মুনাফায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর হাঁসফাঁস অবস্থা।
এসব আঘাত সামলানোর জন্য থাকা মূলধনও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ব্যাংক খাতকে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে যত দ্রুত সম্ভব যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি যারা এসব অনিয়ম-দুর্নীতি করেছে, তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বস্তুত সুশাসনের অভাবে ব্যাংক খাতের রোগ এতটা জটিল আকার ধারণ করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে হঠাৎ খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো— গত কয়েক বছরে খেলাপি অবস্থায় থাকা ঋণগুলোকে প্রকৃত খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। ব্যাংকগুলোর টিকে থাকার জন্য সঠিক কর্পোরেট গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠা জরুরি। এর মধ্যে সদিচ্ছা, সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পতিত স্বৈরাচারের ১৬ বছরের শাসনামলে ব্যাংকগুলোতে যে লুটপাট হয়েছে, তার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে দুয়েক বছর যথেষ্ট নয়। ব্যাংকগুলোকে শক্ত অবস্থানে ফেরাতে সময় লাগবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও কথা সাহিত্যিক
