রক্তের সংকটে প্রাণহানি ও আমাদের দায়
আফিয়া আলম
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এক ব্যাগ রক্তের অভাবে যখন একজন রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে, তখন প্রশ্ন ওঠে এটি কি নিছক দুর্ভাগ্য, নাকি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের ব্যর্থতা? দুর্ঘটনা, জটিল অস্ত্রোপচার, প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ, থ্যালাসেমিয়া ও ক্যানসারের চিকিৎসায় রক্ত অপরিহার্য। অথচ প্রয়োজনের মুহূর্তে রক্তের সন্ধানে স্বজনদের হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল, পরিচিতজন থেকে অপরিচিতজনের দ্বারে দ্বারে ছুটতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসহায় আবেদন জানিয়ে অপেক্ষা করতে হয় একটি ফোনকলের। জীবন বাঁচানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের প্রাপ্যতা কেন এখনো এতটা অনিশ্চিত? রক্তের সংকটের জন্য শুধু স্বেচ্ছায় রক্তদাতার অভাবকে দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যাবে। এর সঙ্গে জড়িত অপরিকল্পিত রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণের সীমাবদ্ধতা, হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। এক স্থানে রক্তের সংকট, অন্য স্থানে সম্ভাব্য প্রাপ্যতা অথচ নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে রোগীর স্বজনেরা তা জানতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতি এড়াতে রক্তের চাহিদা ও প্রাপ্যতার তথ্য সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা জরুরি। বিশেষ করে বিরল রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রে সংকট আরও তীব্র হয়।
জরুরি চিকিৎসার পাশাপাশি স্বজনদের রক্ত সংগ্রহের অনিশ্চিত দৌড় সামলাতে হয়। ফলে যে সময়ে রোগীর পাশে থাকা সবচেয়ে জরুরি, সেই সময়টুকুও ব্যয় হয় রক্তের সন্ধানে। তাই প্রশ্ন শুধু রক্ত আছে কি নেই, তা নয়; প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনের সময় নিরাপদ রক্ত রোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর।
রক্তদানের বিষয়ে ভয় ও ভুল ধারণা এখনো অনেককে পিছিয়ে রাখে। অনেকে মনে করেন, রক্ত দিলে শরীর দীর্ঘদিন দুর্বল থাকে কিংবা স্থায়ী ক্ষতি হয়। অথচ উপযুক্ত স্বাস্থ্যপরীক্ষার পর যোগ্য ব্যক্তি নির্ধারিত নিয়মে রক্ত দিলে তা সাধারণত নিরাপদ। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনায় নেওয়া অপরিহার্য।
আমাদের সমাজে রক্তদানের গুরুত্ব অনেকেই উপলব্ধি করেন নিজের পরিবারের কেউ সংকটে পড়ার পর। অথচ রক্তের প্রয়োজন কখন কার জীবনে দেখা দেবে, তা আগে থেকে জানা যায় না। তাই রক্তদানকে সাময়িক আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচির পাশাপাশি রক্তদানের উপযুক্ততা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
রক্তের সংকটকে পুঁজি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অসহায় রোগীর পরিবারের দুর্দশাকে কাজে লাগিয়ে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া মানবিকতার পরিপন্থী। তবে বৈধ পরীক্ষা ও সরবরাহব্যয়কে অনৈতিক অর্থ আদায়ের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। রক্তের প্রাপ্যতার পাশাপাশি নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দাতার উপযুক্ততা যাচাই, সংক্রমণ পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং, সঠিক সংরক্ষণ এবং রোগীর সঙ্গে রক্তের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে অনির্ভরযোগ্য উৎস থেকে রক্ত সংগ্রহ করলে রোগীর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। রক্ত জোগাড় করাই শেষ কথা নয়; নিরাপদ রক্ত সময়মতো পৌঁছে দেওয়াই মূল লক্ষ্য।
রক্তের সংকট মোকাবিলায় সরকার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কেবল জরুরি মুহূর্তে ব্যবস্থা নেওয়া নয়। সরকারি হাসপাতাল ও ব্লাড ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানো, পরিকল্পিতভাবে রক্ত সংগ্রহ এবং সংরক্ষণব্যবস্থার মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। হাসপাতাল, অনুমোদিত ব্লাড ব্যাংক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। রক্তের গ্রুপ, প্রাপ্যতা ও জরুরি চাহিদার তথ্য নিয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা চালু করা গেলে রোগীর স্বজনদের অনিশ্চয়তা কমবে। এ ক্ষেত্রে তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ, রক্তদাতার সম্মতি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর বিচ্ছিন্ন উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় এনে নিয়মিত রক্তদাতা তৈরি ও জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
রক্তের অভাবে কোনো রোগীর মৃত্যু হয়েছে এমন অভিযোগ উঠলেই সব দায় এক পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা, রোগের জটিলতা, চিকিৎসা পেতে বিলম্বসহ বিভিন্ন কারণ মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। তবে নিরাপদ রক্তের অপ্রাপ্যতা কিংবা দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। রক্তের সংকট কোনো একক পক্ষের সমস্যা নয়; কিন্তু সম্মিলিত দায়ের কথা বলে কেউ নিজের দায়িত্ব এড়াতে পারে না। সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা গড়তে হবে, হাসপাতালকে সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সমন্বিত উদ্যোগ চালাতে হবে এবং যোগ্য ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসতে হবে।
একজনের দান করা রক্ত অন্য একজনের বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরি করে। সেই সুযোগ যেন কেবল পরিচিতজনের সহায়তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আবেদন কিংবা আকস্মিক সৌভাগ্যের ওপর নির্ভর না করে। রক্তের প্রয়োজন মেটাতে চাই পরিকল্পিত সংগ্রহ, নিরাপদ সংরক্ষণ, দ্রুত সরবরাহ ও কার্যকর জবাবদিহি। প্রশ্ন তাই শুধু 'রক্ত কোথায়?' নয়; প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনের সময় রক্ত নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তারা কতটা প্রস্তুত? রক্তের সংকটে প্রাণহানি ঠেকাতে দোষারোপের চেয়ে জরুরি কার্যকর ব্যবস্থা। আর সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলার দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
