দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা মানেই স্বপ্নের সীমাবদ্ধতা নয়
মো. তাহমিদ রহমান
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চক্ষু থাকিতে অন্ধ যারা আলোকের দুনিয়ায়, সিন্ধু সেচিয়া বিষ পায় তারা অমৃত নাহি পায়। চোখ থাকা সত্ত্বেও এ পৃথিবীর অধিকাংশ বিষয়ই আমরা বুঝতে পারি না। সুন্দর এই পৃথিবীর রূপ, রস, বৈচিত্র্য এবং সৌন্দর্য আমরা উপভোগ করি দৃষ্টি শক্তির মাধ্যমে। কিন্তু দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তিরা চোখে দেখতে না পাওয়ায় পৃথিবীর এসব সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন না। তাই তাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি, ভালোবাসা ও দায়িত্ব অনেক বেশি। দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তিরাও তাদের মেধা, দক্ষতা, শ্রম, প্রজ্ঞা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। অথচ আমাদের সমাজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতাকে ঘিরে এখনও রয়েছে নানা নেতিবাচক ধারণা, বৈষম্য, অবহেলা এবং অপ্রয়োজনীয় করুণা।
দুঃখের বিষয় পরিবার হতেই শুরু হয় তাদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন। আধুনিক সভ্য সমাজের অনেকে এখনও দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তিদের 'অন্ধ' বা 'কানা' ইত্যাদি নামে ডাকে। যা তাদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টি ভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। আমরা কি সত্যিই এমন একটি সমাজ গড়তে পেরেছি, যেখানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তিরা সমমর্যাদা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারছেন?
চোখের আলো না থাকলেও, স্বপ্ন দেখার আলো নিভে যায় না। মানুষের স্বপ্ন দেখার জন্য চোখের দৃষ্টি অপরিহার্য নয়; অপরিহার্য হলো- স্বপ্ন দেখার সাহস, এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস, সুযোগ পাওয়ার অধিকার এবং পাশে দাঁড়ানোর মতো একটি সহমর্মী সমাজ। পৃথিবীকে দেখার প্রচলিত মাধ্যম দৃষ্টিশক্তি হলেও পৃথিবীকে অনুভব করা, জ্ঞান অর্জন করা, সৃজনশীলতা প্রকাশ করা কিংবা জীবনের সাফল্য ছুঁয়ে দেখার জন্য শুধু চোখের ওপর নির্ভর করতে হয় না। পৃথিবীতে এমন অনেক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা দৃষ্টিহীনতা বা দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরেও নিজেদের অদম্য ইচ্ছা, মেধা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন এবং ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। পৃথিবীর প্রথম মহাকাব্য লিখেছিলেন জন্মান্ধ মহাকবি হোমার।
রুদাকী পারস্যের (বর্তমান ইরান/তাজিকিস্তান) একজন প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক। তাকে ফারসি সাহিত্যের জনক বা 'আদম-উশ-শুয়ারা' বলা হয়। তিনিও জন্মান্ধ ছিলেন। আরেক বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক জ্যাক লুসেইরানও ছিলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মানুষ। আধুনিক আরবী কবিতার জনক বাশশার ইবনে বুরদ জন্মান্ধ ছিলেন। তিনি শুধু জন্মান্ধই ছিলেন না, বরং তার চোখ দুটো অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড দিয়ে ঢাকা ছিল।
বিখ্যাত আমেরিকান গায়ক রে চার্লস, বিখ্যাত ইংরেজি কবি জন মিল্টন ছিলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। ৪৪ বছর বয়সে সম্পূর্ণরূপে দৃষ্টিহীন হয়ে যান জন মিন্টন, এর ১৬বছর পরে তিনি লিখেছিলেন তার অমর সৃষ্টি 'প্যারাডাইস লস্ট' এবং 'প্যারাডাইস রিগেইন্ড'-এর মতো কালজয়ী মহাকাব্য। দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ফরাসি নাগরিক লুইস ব্রেইল (১৮০৯-১৮৫২) অত্যন্ত মেধাবী, প্রতিভাবান ও অধ্যবসায়ী ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। তিন বছর বয়সে পিতার কারখানায় খেলাধুলার সময় সুই জাতীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে চামড়ায় গর্ত করার সময় সংঘটিত এক দুর্ঘটনায় চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়ে ফেলেন।
দৃষ্টিহীন হয়ে গেলেও বন্ধ হয়ে যায়নি তার মেধার দীপ্তি। চক্ষুহীন জীবনকে চক্ষুময় জীবনের মতো উপভোগের উপায় খুঁজে বের করার প্রাণান্তকর চেষ্টায় নিবেদিত হয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি দৃষ্টিহীনদের লেখা ও পড়ার জন্য কাগজের ওপর মাত্র ছয়টি ডট দিয়ে জাদুকরি একটি অতি সহজ ভাষা ও পদ্ধতি (ব্রেইল ভাষা) আবিষ্কার করে সবাইকে হতবাক করে দেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তিরা ছয়টি ডটের অনবদ্য জাদু দিয়ে নিজেকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলে তাদের জীবনযাত্রার মান সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিরাপদে পথ চলতে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতি বছর সমগ্র বিশ্বে সাদাছড়ি দিবসটি পালিত হয়।
সমগ্র বিশ্বে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে এরূপ নানা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন আয়োজনে আজকে দিবসটি পালন করছে। জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির অধিকার সনদের অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারও দিবসটি উদযাপন করছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্তকরণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে শোভাযাত্রা, আলোচনাসভা, দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে।
এ ছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের এককালীন অনুদান প্রদানসহ সারা দেশে ৬৪ জেলায় স্মার্ট সাদাছড়ি বিতরণ করা হচ্ছে। দেশে সরকারি হিসাবে প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখ তন্মধ্যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ। সাদাছড়ি দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য একটি অপরিহার্য হাতিয়ার যা তাদের অবাধে ও নিরাপদে একস্থান থেকে অন্যস্থানে চলাচলে সহায়তা করে। সাদাছড়ি এমন একটি বস্তু যা দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের গাড়ি চালক ও পথচারীদের কাছ থেকে নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে কাজ করে।
চারপাশের জগতকে অন্বেষণ করতে এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বাধা এড়াতে, শ্রবণ এবং স্পর্শ ইন্দ্রিয়গুলোর পাশাপাশি সাদাছড়ি ব্যবহার করে। দিবসটি ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ দ্য ব্লাইন্ড কর্তৃক সর্বপ্রথম পালিত হয়। দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষের সাথে কীভাবে সম্মানজনক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে যোগাযোগ বাড়ানো যায়, তাহাই এই দিবসটির মূল উপজীব্য বিষয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবেশগম্যতার বিকল্পগুলো উন্নত হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নাগরিকদের জন্য জীবন এখনও বাধা দিয়ে পূর্ণ। ঠিক যেমনটি হয়েছিল জেমস বিগস এর জীবনে। তিনি একজন ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার ছিলেন দুর্ঘটনার পরে দৃষ্টিহীন হয়ে গিয়েছিলেন। বাড়ির চারপাশে যানজটের মধ্য দিয়ে যাতায়াতের জন্য সাদাছড়ি ব্যবহার করা শুরু করেন, যা দ্রুতই অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কীভাবে সেগুলো ব্যবহার করতে হবে, সে সম্পর্কে প্রশিক্ষণের পদ্ধতি তৈরি করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে সাদাছড়িকে যথেষ্ট উন্নত করা হয়েছে।
উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের সাদাছড়ি ব্যবহারের উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। যার ফলে এটি তাদের জীবনকে সহজ করে এবং সঙ্গী ছাড়াই তারা চলাচল করতে পারে। প্রযুক্তি আধুনিক সভ্যতার অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, সেন্সর ও স্মার্ট প্রযুক্তির কল্যাণে আজ মানুষের জীবন হয়ে উঠছে আরও সহজ, নিরাপদ ও গতিশীল। এ প্রযুক্তির আলোয় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষের জীবনেও। তাই সময়ের দাবি-যে প্রযুক্তি দুনিয়া বদলে দিচ্ছে, সেই প্রযুক্তি কাজে লাগুক দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষের সাদাছড়িতে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাদাছড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপকরণ। প্রচলিত সাদাছড়ি ব্যবহার করে তাঁরা সামনের বাধা শনাক্ত করতে পারলেও গর্ত, ঝুলন্ত বস্তু, চলন্ত যানবাহন কিংবা অপরিচিত পথের বিপদ সব সময় বুঝতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট সাদাছড়ি হতে পারে আশার নতুন আলো। স্মার্ট সাদাছড়িতে আলট্রাসনিক সেন্সর, জিপিএস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শব্দনির্দেশনা প্রযুক্তি যুক্ত করা সম্ভব। এর সাহায্যে সামনের বাধা শনাক্ত করে কম্পন বা শব্দের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে সতর্ক করা যাবে।
জিপিএস ও কণ্ঠনির্দেশনার মাধ্যমে অপরিচিত গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ হবে। এমনকি বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে সড়কের সংকেত, যানবাহনের অবস্থান এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব। ফলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলাচল করতে পারবেন। এক সময় প্রযুক্তি মানে ছিল, শুধু যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ। এখন তা বদলে গেছে। প্রযুক্তি এখন আমাদের সঙ্গী, সহকর্মী, এমনকি কখনও কখনও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীও। ঘুম থেকে শুরু করে অফিসের কাজ, চিকিৎসা, পড়াশোনা বা কেনাকাটা প্রতিটি মুহূর্তে প্রযুক্তির ছোঁয়া। এ পরিবর্তন এখন আর ধীরে আসছে না; বরং ঝড়ের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাদাছড়িতে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্মার্ট সাদাছড়ি যেন ব্যয়বহুল না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। দেশীয় প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিটির সহজ ব্যবহার, দীর্ঘস্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, স্মার্ট সাদাছড়ি প্রচলিত সাদাছড়ির বিকল্প নয়; বরং এর কার্যকর সহায়ক। প্রযুক্তির প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নত করে এবং নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় পূরণে কাউকে পিছিয়ে থাকতে দেয় না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সাদাছড়ি উদ্ভাবন ও সহজলভ্য করা তাই শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, মানবিক দায়িত্বও বটে। প্রযুক্তির আলোয় তাদের পথ হোক আরও নিরাপদ, স্বাধীন ও সম্ভাবনাময়।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
