তারুণ্যের অবক্ষয়, বিপন্ন গবেষণা ও উত্তরণের পথ

রিনা আক্তার

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো তরুণ সমাজ। একটি দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করে তার যুবশক্তির সঠিক দিকনির্দেশনা, মেধা ও সৃজনশীলতার ওপর। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, আজকের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ তাদের সেই সঠিক পথ থেকে ছিটকে পড়ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ, পুলিশ বিভাগ এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার যেমন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ ও বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি তথ্য থেকে বিগত বছরগুলোর যে চিত্র পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজধানী ঢাকা শহরেই ৮০টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে স্কুল-কলেজের পড়ুয়া ও কমবয়সী কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে জড়িত।

মাদক সেবন, ছিনতাই, র‍্যাগিং, মারামারি থেকে শুরু করে খুন ও জখমের মতো গুরুতর অপরাধেও তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। পড়াশোনায় মনোনিবেশ বা সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগ নেওয়ার বদলে তারা জড়িয়ে পড়ছে কলুষিত ছাত্র রাজনীতি, সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার, অবাধ মেলামেশা, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদকাসক্তি এবং নানা ধরনের সামাজিক বিশৃঙ্খলায়। এ অবক্ষয় শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষতি করছে না, বরং সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

একসময় আমাদের দেশে ছাত্র রাজনীতির এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ছিল; যা দেশ ও সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই মূলচেতনা থেকে সরে এসে ছাত্র রাজনীতির একটি বড় অংশ পরিণত হয়েছে লেজুড়বৃত্তি, পেশিশক্তি প্রদর্শন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ারে।

ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার, মারামারি ও দখলের সংস্কৃতিতে জড়িয়ে তরুণ ও ছাত্রসমাজ পড়াশোনা এবং উচ্চতর গবেষণা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। যে সময়ে লাইব্রেরি বা গবেষণাগারে শিক্ষার্থীদের মেধা চর্চা করার কথা, সেই সময় তারা ব্যয় করছে অনর্থক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। এর ফলে উচ্চশিক্ষার মান আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে এবং তরুণদের ভেতর থেকে মৌলিক চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। ?বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু তরুণ সমাজের জন্য এটি অনেক ক্ষেত্রে আত্মঘাতী ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং বিশেষ করে টিকটকের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি তরুণদের মেধা ও সময়কে গ্রাস করছে। টিকটকের স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও তৈরিতে মজে থেকে তরুণরা পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। লাইক, কমেন্ট আর ভিউয়ের অন্ধ মোহে তারা বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক কৃত্রিম ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বাস করছে। এর ফলে তাদের মনোযোগের পরিধি মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে, যা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও চিন্তাশক্তির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।? শিক্ষাজীবন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে তরুণ সমাজের মধ্যে মূল্যবোধের এক মারাত্মক অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে।

সামাজিক ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের অভাবে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সীমাহীন ও অবাধ মেলামেশার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে টিকটক, অনলাইন চ্যাটিং কিংবা ডেটিং অ্যাপসের মাধ্যমে পরিচয় থেকে শুরু করে অনৈতিক ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে একদিকে যেমন পারিবারিক ও সামাজিক শিষ্টাচার ও নৈতিকতা ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে ব্ল্যাকমেইল, সাইবার অপরাধ এবং মানসিকভাবে বিপথগামী হওয়ার মতো নানাবিধ সামাজিক ব্যাধি সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে।? পড়াশোনা ও নৈতিকতার চর্চা না থাকার কারণে সৃষ্ট এ শূন্যতা তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে আরও ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে, যার নাম মাদকাসক্তি।

অপসংস্কৃতি, হতাশা এবং ভুল সঙ্গের প্রভাবে অনেক তরুণ মাদকের ভয়াল থাবায় জড়িয়ে পড়ছে। মাদক শুধু একজন তরুণের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকেই ধ্বংস করে না, বরং তাকে অপরাধজগতের দিকে ধাবিত করে। ছিনতাই, কিশোর গ্যাং কালচার এবং নানা ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে আজ যুব সমাজের একাংশের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সমাজের সার্বিক আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে।?

একটি দেশের অগ্রগতিতে গবেষণা এবং সামাজিক উদ্যোগের বিকল্প নেই। নতুন জ্ঞান অন্বেষণ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে তরুণদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করার কথা ছিল। অথচ আজ উচ্চশিক্ষায় বা মৌলিক গবেষণায় তরুণদের আগ্রহ আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। তারা শর্টকাট উপায়ে সফলতা অর্জনের পেছনে ছুটছে।

সমাজকল্যাণ বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মাধ্যমে নেতৃত্ব গুণের বিকাশ ঘটানোর সুযোগ থাকলেও তা আজ অবহেলিত। এর ফলে সমাজে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং তরুণরা তাদের প্রকৃত সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ?তরুণ সমাজকে এই অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে হলে বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি ক্যাম্পাসগুলোতে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার পাশাপাশি মূল মনোযোগ রাখতে হবে শিক্ষা ও গবেষণায়। লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনা ও গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার থেকে সন্তানদের ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে।

সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধুসঙ্গের বিষয়ে অভিভাবকদের সবসময় সচেতন ও সজাগ থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু গতানুগতিক পড়াশোনা নয়, বরং খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, গবেষণা ক্লাব ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক কাজে ব্যস্ত থাকে। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ?তরুণদের হাতে মাদক, অপসংস্কৃতি বা টিকটকের ফোনের বদলে বই, কলম ও সৃজনশীল কাজের উপকরণ তুলে দিতে হবে।

তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। তাই তরুণ সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং ইতিবাচক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের এই অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ