খাদ্য নিরাপত্তা শুধু কৃষির বিষয় নয় জাতীয় অর্থনীতিরও প্রশ্ন
অঞ্জন মজুমদার
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্য নিরাপত্তা শুধু খাদ্যের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, কৃষকের টিকে থাকা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির শক্তির প্রশ্ন। বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিহীনতা, কর্মসংস্থান, কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারের অস্থিরতা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যে শুল্ক ও নীতির পরিবর্তন, পরিবহন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা— সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে— এ চাপের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝার জন্য শুধু বাজারের দাম দেখলেই হবে না; দেখতে হবে মানুষের খাবার কেনার সক্ষমতা; জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও এর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখোমুখি হতে পারেন— এফ এ ও বিশ্লেষণে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হওয়া এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপের কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ বাংলাদেশের সমস্যা শুধু খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি নয়, আমাদের সামনে আরও বড় প্রশ্ন হলো— মানুষের হাতে কি খাদ্য কেনার মতো আয় আছে?
এমন বাস্তব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের অর্থনৈতিক দর্শনেও পরিবর্তন আনতে হবে; মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কিংবা বিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চলের যুদ্ধ বাংলাদেশের কৃষকের জমিতে সরাসরি না হলেও তার অভিঘাত পৌঁছে যায় ডিজেল, সার, পরিবহন, বিদ্যুৎ, খাদ্য আমদানি ও বাজারদরের মাধ্যমে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৬ সালের পূর্বাভাসেও জ্বালানি ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা কে আঞ্চলিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যয়ের চাপ অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলছে— এর অর্থ খুব সরল; আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির ভাড়া বাড়ে না। সেচের খরচ বাড়ে, কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে, হিমাগারের ব্যয় বাড়ে, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ বাড়ে। সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে, শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের একটি অংশ কৃষক বহন করেন এবং আরেকটি অংশ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে।
দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়; কিন্তু একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি ধাক্কা যেন দেশের অভ্যন্তরে ভয়াবহ সংকটে পরিণত না হয়, সে জন্য দেশের নিজস্ব উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। বাংলাদেশের ধান উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি রয়েছে অথচ একই সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে, এখানেই আমাদের বুঝতে হবে— খাদ্য উৎপাদন আর খাদ্য নিরাপত্তা এক জিনিস নয়। একজন দরিদ্র মানুষের ঘরে চাল থাকলেও যদি ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, ডাল, শাকসবজি ও ফল কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে তার পুষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। পেট ভরানো এবং পুষ্টি নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়, এখন বাংলাদেশের খাদ্যনীতির লক্ষ্য শুধু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি হওয়া উচিত নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ, বৈচিত্র?্যময় ও পুষ্টিকর খাদ্যের সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা।
আমাদের কৃষি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো— কৃষক উৎপাদন করেন কিন্তু উৎপাদনের পরের মূল্যশৃঙ্খলে তার অংশগ্রহণ সীমিত। কৃষক ধান, সবজি, ফল, মাছ, দুধ, ডিম কিংবা মাংস উৎপাদন করেন, এরপর আসে সংগ্রহকারী, পাইকার, পরিবহনকারী, সংরক্ষণকারী, প্রক্রিয়াজাতকারী, প্যাকেজিং, ব্র?্যান্ডিং ও খুচরা বাজার। পণ্যের মূল্য যত বাড়ে, কৃষকের অংশ অনেক সময় ততটা বাড়ে না— এ কাঠামো পরিবর্তন করা জরুরি।
খামারি ও কৃষককে শুধু কৃষক হিসেবে নয়, কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে হবে; তাকে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। উৎপাদনের আগে বাজারের তথ্য, উৎপাদনের সময় প্রযুক্তি, উৎপাদনের পরে সংরক্ষণ এবং শেষ পর্যায়ে নিশ্চিত ক্রেতা— এ চারটি স্তম্ভ ছাড়া কৃষিকে লাভজনক পেশায় পরিণত করা কঠিন। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের একটি বিশ্লেষণেও কৃষিকে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং কৃষির সঙ্গে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্বলতা বোঝার আরেকটি দৃশ্যমান চিত্র হলো মানুষের শহরমুখী প্রবাহ। একজন কৃষক যখন কৃষিকাজ ছেড়ে অটোরিকশা চালান, একজন তরুণ কৃষক যখন জমিতে কাজ করার বদলে শহরে অনিশ্চিত শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন কিংবা একজন গ্রামীণ যুবক যখন কোনো উৎপাদনশীল ব্যবসার সুযোগ না পেয়ে দিনের পর দিন অনিশ্চিত আয়ের পেশায় যুক্ত থাকেন— তখন সেটিকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত অথবা কারও অসহায়ত্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এর পেছনে রয়েছে কৃষির আয় অনিশ্চয়তা, জমির ক্ষুদ্রায়ন, উৎপাদন ব্যয়, নদীতে মাছ না থাকা, কুমারের হাঁড়ি বিক্রি না হওয়া, বাজারের দুর্বলতা, সংরক্ষণের অভাব এবং গ্রামীণ শিল্পের সীমাবদ্ধতা।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৬ সালের বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, স্ব-কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দৈনিক ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব মজুরি কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের কাঠামোগত দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে, অতএব শহরকে আরও বড় করে গ্রামকে আরও ছোট করা সমাধান নয় বরং গ্রামেই নতুন অর্থনৈতিককেন্দ্র তৈরি করতে হবে। অটোরিকশা চালানো কোনো অসম্মানের কাজ নয়; কিন্তু যদি একটি দেশের বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ উৎপাদনশীল খাত ছেড়ে শুধু শহরের যাত্রী পরিবহনের মতো শহর নগরের সীমিত শ্রম বাজারে ঠাঁই নেন, তাহলে অর্থনীতির উৎপাদনশীল ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত— কেনো একজন তরুণ নিজের এলাকায় কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিযন্ত্র সেবা, পরিবহন, সংরক্ষণ, বিপণন কিংবা ডিজিটাল কৃষি সেবার উদ্যোক্তা হতে পারছেন না? যদি একটি উপজেলা একশ তরুণকে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করতে পারে, তাহলে তারা শুধু নিজের কর্মসংস্থান করবে না; কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকারী ও বাজারের জন্যও নতুন কাজ সৃষ্টি করবে— এটাই উন্নয়নশীল দেশের প্রমাণিত কর্মসংস্থানের টেকসই মডেল। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে শুধু শহরকেন্দ্রিক ব্যবসা হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের একটি বিশাল সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যাবে। একটি ইউনিয়নে যদি কৃষিপণ্য সংগ্রহকেন্দ্র থাকে, উপজেলায় গ্রেডিং ও প্যাকেজিং কেন্দ্র থাকে, জেলায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থাকে এবং অনলাইন ব্যবস্থায় ঢাকা ও অন্যান্য শহরের ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত করা যায়— তাহলে কৃষির সঙ্গে বহু নতুন ব্যবসা যুক্ত হবে। একজন কৃষক উৎপাদন করবেন— একজন উদ্যোক্তা সংগ্রহ করবেন, আরেকজন প্যাকেজিং করবেন। কেউ পরিবহন করবেন, কেউ সংরক্ষণ করবেন। কেউ অনলাইনে বিক্রি করবেন, কেউ খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করবেন অর্থাৎ একটি কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে একটি স্থানীয় অর্থনীতির ইকোসিস্টেম তৈরি হবে— এ অর্থনীতিই আগামীর বাংলাদেশের গ্রামীণ কর্মসংস্থানের নতুন সফলভিত্তি হতে পারে।
বাংলাদেশে এগ্রি স্টার্টআপের ধারণাকেও আরও বিস্তৃত করতে হবে; এগ্রি স্টার্টআপ মানে শুধু কৃষকের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া বা অনলাইন পণ্য বিক্রি করা নয়— একটি শক্তিশালী এগ্রি স্টার্টআপ হতে পারে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সেতু— উৎপাদন পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাজার, সংগ্রহ, মাননিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, মূল্য সংযোজন, প্যাকেজিং, ব্র?্যান্ডিং ও বিক্রি পর্যন্ত। প্রযুক্তির ব্যবহার হবে কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং বাজারের সঙ্গে তার দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে। কৃষকের পণ্য কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, কীভাবে উৎপাদিত হয়েছে এবং কী মান বজায় রেখে বাজারে এসেছে— এসব তথ্যও ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব। এখানে ভবিষ্যতে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি অর্থনীতির সঙ্গে প্রযুক্তির একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষির আরেকটি বড় সম্ভাবনা মূল্য সংযোজন; আম, কাঁঠাল, কলা, আলু, সবজি, মসলা, চাল, ডাল, মাছ, দুধ— এসব পণ্য কাঁচা অবস্থায় বিক্রি না করে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে একই উৎপাদন থেকে কয়েক স্তরের অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা সম্ভব। কৃষিপণ্য শুকানো, হিমায়িত করা, গুঁড়া করা, প্যাকেটজাত করা, নিরাপদ ভাবে সংরক্ষণ করা, প্রস্তুত খাদ্য তৈরি করা— এসব নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র অর্থাৎ আমাদের কৃষিকে মাঠ থেকে কারখানায়, কারখানা থেকে ব্র?্যান্ডে এবং ব্র?্যান্ড থেকে বাজারে নিয়ে যেতে হবে। কৃষক উৎপাদন করলেন; কিন্তু বাজারে পৌঁছানোর আগেই পণ্য নষ্ট হলো— এটি শুধু খাদ্যের ক্ষতি নয়; এটি কৃষকের শ্রম, পানি, সার, জ্বালানি ও অর্থের অপচয়— তাই হিমাগার, শুকনো সংরক্ষণ, ঠান্ডা পরিবহন, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ ও দক্ষ বাজারব্যবস্থায় বিনিয়োগকে খাদ্যনিরাপত্তার অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। খাদ্য সংরক্ষণে বিনিয়োগ মানে শুধু খাদ্য বাঁচানো নয়; এর অর্থ কৃষকের আয় রক্ষা, বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
পুষ্টিহীনতা দূর করার জন্য শুধু সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়; বাজার ব্যবস্থাকেও পুষ্টির অংশীদার করতে হবে; স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিম, দুধ, মাছ, শাকসবজি, ফল ও ডাল স্থানীয় বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছাতে পারলে কৃষকের বাজারও তৈরি হবে এবং মানুষের পুষ্টির সুযোগও বাড়বে। স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক আবাসন ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির খাদ্য চাহিদার সঙ্গে স্থানীয় কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা গেলে একটি স্থায়ী বাজার সৃষ্টি হতে পারে। এখানে পুরো উৎপাদন ও বিপনন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকা হবে উৎপাদক ও বাজারের মধ্যে সেতু তৈরি করা, প্রতিটি ব্যবসা উদ্যোক্তাদের নিজে পরিচালনা করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
একটি কর্মহীন তরুণ সমাজ শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতারও প্রশ্ন; যে তরুণের সামনে দক্ষতা অর্জন, উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই, তার সামনে অনিশ্চয়তার দরজা খুলে যায়, এর সঙ্গে যদি মাদকের বিস্তার, অপরাধ ও দুর্বল সামাজিক পরিবেশ যুক্ত হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি পরিবারের হয় না— ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানকে আলাদা আলাদা নীতি হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মসূচির অংশ করতে হবে।বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না, হওয়াও উচিত নয়— রপ্তানি বাড়াতে হবে, সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখী করণ করে বৈদেশিক বিনিয়োগ আনতে হবে, প্রয়োজনীয় আমদানি করতে হবে; কিন্তু একই সঙ্গে দেশের ভেতরের উৎপাদন ও বাজারকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে বাইরের প্রতিটি ধাক্কা দেশের ভেতরে খাদ্য ও কর্মসংস্থানের সংকটে পরিণত না হয়। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের এপ্রিলের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের অভিঘাতের কথা উল্লেখ করেছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে উচ্চ আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক লেনদেনে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে; এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির একটি নতুন ভারসাম্য প্রয়োজন— বৈদেশিক বাজারের পাশাপাশি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার। বাংলাদেশের সামনে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়— আমরা কি শুধু সংকট এলে আমদানি বাড়াব, নাকি সংকটের আগেই দেশের উৎপাদনশীল ভিত্তি শক্তিশালী করব? আমরা কি কৃষককে শুধু ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল রাখব, নাকি তাঁকে নিশ্চিত বাজারের সঙ্গে যুক্ত করব? আমরা কি তরুণকে শুধু চাকরির আবেদনকারী বানাব, নাকি তাকে কৃষি ও খাদ্য অর্থনীতির উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলব? আমরা কি গ্রামকে শুধু শ্রমিক সরবরাহের জায়গা হিসেবে দেখব, নাকি গ্রামেই শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, প্রযুক্তি ও ব্যবসার নতুন কেন্দ্র গড়ে তুলব? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী দিনের অর্থনীতির দিক নির্ধারণ করবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিকে বাঁচাতে হবে,কৃষিকে বাঁচাতে হলে কৃষকের আয় বাড়াতে হবে, কৃষকের আয় বাড়াতে হলে বাজার নিশ্চিত করতে হবে, বাজার নিশ্চিত করতে হলে গ্রামীণ জনপদের এসএমই, এগ্রি স্টার্টআপ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে— আর এসব করতে হলে দেশের অর্থনীতির ভেতরেই অর্থের প্রবাহ বাড়াতে হবে। এখন সময় শুধু 'খাদ্য উৎপাদন' নিয়ে ভাবার নয়; খাদ্যকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনীতি গড়ে তোলার; শুধু 'চাকরি' খোঁজার নয়; কর্মসংস্থানের নতুন বাজার তৈরি করার। শুধু 'গ্রাম থেকে শহরে' মানুষ পাঠানোর নয়; গ্রামেই অর্থনীতির নতুনকেন্দ্র গড়ে তোলার। দেশের ভেতরে উৎপাদন বাড়বে, স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়বে, কৃষকের আয় বাড়বে, এসএমই বিস্তৃত হবে, এগ্রি স্টার্টআপ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে— তখনই খাদ্যনিরাপত্তা আর শুধু সরকারি গুদামের হিসাব থাকবে না; তা পরিণত হবে মানুষের হাতে থাকা আয়, বাজারে থাকা পুষ্টিকর খাদ্য এবং গ্রামীণ পরিবারের স্থিতিশীল জীবিকার বাস্তবতায়। আন্তর্জাতিক সংকটের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নয়— দেশের নিজের উৎপাদনক্ষম মানুষ, কৃষি, উদ্যোক্তা, গ্রামীণ বাজার এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি— সেই অর্থনীতিকেই এখন সবচেয়ে দ্রুত শক্তিশালী করতে হবে আর করা গেলে, এক সময় বহুমাত্রিক রপ্তানি পণ্যের পথ উম্মুক্ত হয়ে যাবে।
লেখক : কৃষিবিদ ও গ্রিন সার্কুলার ইকোনমি স্পেশালিস্ট
