শিক্ষিত বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান

শরীফ মো. আক্তারুজ্জামান

প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একজন তরুণ বহু বছরের অধ্যবসায়, পরিবারের ত্যাগ আর নিজের স্বপ্নকে সঙ্গী করে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। তার চোখে তখন নতুন জীবনের স্বপ্ন— একটি সম্মানজনক চাকরি, পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া এবং নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে গিয়ে অনেক তরুণের সামনে খুলে যায় দীর্ঘ অপেক্ষার দরজা। একের পর এক আবেদন, চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি, সাক্ষাৎকার আর প্রত্যাশা ভঙ্গের মধ্য দিয়ে তাদের স্বপ্নে জমতে থাকে হতাশার মেঘ।

বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব এখন শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগের নাম নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। যে তরুণেরা দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবেন, তাদের একটি অংশ যদি দীর্ঘদিন কর্মসংস্থানের বাইরে থাকেন, তবে সেই ক্ষতি শুধু তাদের নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের সম্ভাবনাও।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১৩.৫ শতাংশ। এ তথ্য উচ্চশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। উচ্চশিক্ষা মানুষের জ্ঞান ও যোগ্যতা বাড়ায়, কিন্তু সেই যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর উপযুক্ত সুযোগ তৈরি না হলে শিক্ষার প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন হলো, শিক্ষিত তরুণেরা কেন কর্মসংস্থানের জন্য এত দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকবেন? এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য অন্যতম। অনেক শিক্ষার্থী তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগক্ষমতা ও সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। ফলে চাকরির বাজারে প্রবেশের সময় তাঁদের অনেকেই প্রত্যাশিত দক্ষতার ঘাটতিতে পড়েন।

অন্যদিকে, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সীমিত পদে বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর প্রতিযোগিতা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থী নিয়োগের প্রবণতা নতুনদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে। কোথাও কোথাও নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

দীর্ঘদিন বেকার থাকার প্রভাবও কম নয়। একজন তরুণের কর্মহীনতা তাঁর আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে, পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। অনেক অভিভাবক সন্তানের শিক্ষার জন্য সঞ্চয় ব্যয় করেন, নিজেদের প্রয়োজন বিসর্জন দেন। অথচ সেই সন্তান যখন নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান না, তখন পরিবারের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে তৈরি হয় বেদনাদায়ক ব্যবধান।

তবে বেকারত্বের সব দায় তরুণদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত দায়িত্ব। একই সঙ্গে তরুণদেরও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

এ সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মজগতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পাঠ্যক্রমে ব্যবহারিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, বাস্তব জীবনে কাজ করার সক্ষমতা অর্জনকেও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পাশাপাশি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সহজ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। কৃষিভিত্তিক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা, পর্যটন ও স্থানীয় সম্পদনির্ভর উদ্যোগে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে তরুণদের জন্য বিকল্প কর্মপথ তৈরি হতে পারে।

চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ পর্যন্ত অযথা দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। পাশাপাশি শ্রমবাজারে কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা দরকার। এতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও বাস্তবসম্মতভাবে সাজাতে পারবেন।

একই সঙ্গে তরুণদেরও আত্মবিশ্বাস হারালে চলবে না। নিজের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা, কম্পিউটার, যোগাযোগ ও বিশ্লেষণী দক্ষতা বাড়াতে হবে। চাকরির প্রস্তুতির পাশাপাশি নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মকর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও খুঁজে দেখা যেতে পারে। তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগের কথা বলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানবসম্পদ। সেই সম্পদকে কাজে লাগাতে হলে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষিত তরুণেরা যেন বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকেন, বরং তাঁদের মেধা, শ্রম ও সৃজনশীলতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর সুযোগ পান— এটাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।

সনদ অর্জনই শিক্ষার শেষ কথা নয়; সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করাই প্রকৃত সাফল্য। শিক্ষিত তরুণের হাতে শুধু সনদ নয়, কাজের সুযোগও তুলে দিতে হবে। কারণ, তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশ।

 

লেখক : গবেষক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া