সৌরবিদ্যুতের প্রসারে নতুন সম্ভাবনা
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার চাপ এবং পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে কার্যকর বিকল্প। এ বাস্তবতায় সর্বোচ্চ পাঁচ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ রেখে 'বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬' জারি সরকারের একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগের প্রকৃত সুফলনির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, জবাবদিহি ও জনসম্পৃক্ততার ওপর।
অধ্যাদেশটির অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শুধু বড় প্রকল্প বা বিপুল পরিমাণ জমির ওপর নির্ভর করতে হবে না। বাড়ির ছাদ, আঙিনা, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পকারখানা, পার্কিং লট, পরিত্যক্ত জমি, চা বাগান ও জলাশয়েও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং কৃষি-সৌরবিদ্যুতের মতো প্রযুক্তির ব্যবহারও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে অব্যবহৃত ছাদ ও অন্যান্য উপযোগী স্থান কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের চাপও কমতে পারে।
অধ্যাদেশে ওপেক্স মডেলকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যবস্থায় গ্রাহককে নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে না; সার্ভিস প্রোভাইডার বিনিয়োগ, স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবেন। ফলে প্রাথমিক বিনিয়োগের সামর্থ্য না থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পাবে। তবে এ ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত, বিদ্যুতের মূল্যহার, সেবার মান এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্পষ্ট হওয়া জরুরি। অন্যথায় গ্রাহক ও সেবাদাতার মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে। প্রতিযোগিতামূলকভাবে সেবাদাতা নির্বাচন এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
নেট-মিটারিং সুবিধা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। উৎপাদিত বিদ্যুতের যথাযথ ব্যবহার এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ গ্রাহককে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উৎসাহিত করবে। তবে এ সুবিধা পেতে সংযোগপ্রক্রিয়া সহজ করা, প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া এবং বিদ্যুৎ সমন্বয়ের নিয়ম স্বচ্ছ রাখা দরকার। পাশাপাশি সৌরপ্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির মান নিশ্চিত করতে হবে। নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে উৎপাদন কমে যাবে, ব্যয় বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকের আগ্রহ নষ্ট হবে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোও জরুরি। অধ্যাদেশে জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয় কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এসব কমিটি যেন শুধু সভা ও প্রতিবেদন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। অনুমোদন, সংযোগ, পরিদর্শন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের তালিকা, প্রকল্পের অগ্রগতি, উৎপাদনক্ষমতা ও সচল থাকার তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার চুরি, ভাঙচুর ও অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান থাকাও যৌক্তিক। তবে শাস্তির পাশাপাশি নিরাপত্তা, নিয়মিত তদারকি এবং অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি অর্থ ব্যয় ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। দ্রুত বাস্তবায়নের নামে জবাবদিহি যেন দুর্বল না হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৌরবিদ্যুতের প্রসার যেন শুধু নীতিমালা ও স্থাপনার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বাস্তবে কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এবং গ্রাহক কতটা উপকৃত হচ্ছেন, তার মূল্যায়ন করতে হবে। সৌরপ্যানেলের মেয়াদ শেষে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও কৃষকদের জন্য সহজ অর্থায়ন এবং কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্বনির্ভরতার পথে এ অধ্যাদেশ নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং কঠোর জবাবদিহি। এসব নিশ্চিত করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প হবে না, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠবে।
