অবরুদ্ধ অবকাশ
মো. তাহমিদ রহমান
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় কিছুটা দেরিতেই সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠা হয়। অন্যান্য দিনের মতো কাজের তাড়া না থাকায় চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে টেলিভিশন অন করতেই চোখের সামনে মনিটরে ভেসে এলো হৃদয় বিদারক এক দৃশ্য। স্বজন হারানো এক নারী দাউদাউ করে জ্বলন্ত এক রিসোর্টের সামনে দিকভ্রান্ত হয়ে বিলাপ করে ছুটোছুটি করছে। তার সামনেই অগ্নিগর্ভ কেড়ে নিচ্ছে স্বজনদের প্রাণ। দুর্ঘটনাটি কক্সবাজারের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ নামক রিসোর্টে। অবশ্য এটিকে দুর্ঘটনা না বলে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলাই শ্রেয়।
কোনো দুঃখজনক ঘটনা যখন স্রেফ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো কারণে ঘটে, তখন তাকে দুর্ঘটনা বলা হয়। কিন্তু যখন কোনো ঘটনা ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা, নিয়মের চরম অবহেলা এবং মুনাফা বা উদাসীনতার কারণে ঘটে তখন সেটি আর দুর্ঘটনার থাকে না, সেটি হয়ে যায় কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তার প্রকৃতিতে, আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সেই প্রকৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটনশিল্পের চরম অব্যবস্থাপনায়। একদিকে পাহাড়, সমুদ্র, বন, নদী ও বিস্তীর্ণ উপকূলের হাতছানি; অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতা, অব্যবস্থাপনা, তদারকির ঘাটতি এবং দুর্ঘটনার পর দায় এড়ানোর প্রবণতা। ফলে যে অবকাশ মানুষের মনে প্রশান্তি আনার কথা সেই অবকাশই কখনও কখনও পরিণত হচ্ছে আতঙ্কের অভিজ্ঞতায়।
সমুদ্রের নীল জলরাশি, দিগন্তজোড়া বালুকাবেলা, সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য আর ঢেউয়ের অবিরাম গর্জনে কক্সবাজার মানেই বাঙালির কাছে এক টুকরো মুক্তি। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, নাগরিক কোলাহল ও জীবনের ক্লান্তি থেকে সাময়িক অবকাশ পেতে মানুষ ছুটে যায় এই সমুদ্রনগরীতে। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকতের পরিচিতি কক্সবাজারকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যটনের সম্ভাবনা। অথচ সেই সম্ভাবনার কেন্দ্রেই আজ জমেছে অনিশ্চয়তার মেঘ। অনিরাপদ সড়ক, সৈকতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব, হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিঝুঁকি, খাবারের মান ও মূল্য নিয়ে অভিযোগ এবং অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সব মিলিয়ে পর্যটকের কাঙ্ক্ষিত অবকাশ যেন ক্রমেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে। সমুদ্রসৈকতকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
শুধু কলাতলী থেকে লাবণী পর্যন্ত কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকাতেই যেনতেনভাবে গড়ে উঠেছে প্রায় চার শতাধিক বহুতল ভবন। আর ৩২ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ শহরে ভবনের সংখ্যা আরও সাড়ে তিন হাজারের বেশি। কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোন ছাড়াও শহরের টেকপাড়া, নুরপাড়া, পেশকারপাড়া, ঝাউতলা, নতুন বাহারছড়া, বাহারছড়া, রুমালিয়ারছড়া, পাহাড়তলী, বইল্ল্যাপাড়া, ঘোনারপাড়া ও লাইট হাউস পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক ভবনগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে রাস্তা বলতে রয়েছে মাত্র কয়েক ফুট প্রশস্ত পথ।
এসব পথ এতটাই সরু যে রিকশা চলাচল করাও কঠিন। আশপাশে নেই কোনো জলাশয়ও। এ অবস্থায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সহজেই আশপাশের ভবনগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। টুপটুপ রিসোর্টের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এই নির্মম সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে। মেরিন ড্রাইভ এলাকার স্থাপনাগুলোর অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে যে উদ্বেগ উঠে এসেছে, তা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। কাঠ, বাঁশসহ দাহ্য উপকরণে নির্মিত স্থাপনায় পর্যাপ্ত জরুরি নির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কিংবা কার্যকর সতর্কীকরণব্যবস্থা না থাকলে সামান্য একটি দুর্ঘটনাও মুহূর্তে গণবিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।
পর্যটকের কাছে একটি রিসোর্ট শুধু রাত কাটানোর জায়গা নয়; সেটি তার ও পরিবারের নিরাপদ আশ্রয়। সেই আশ্রয়ই যদি মৃত্যুফাঁদ হয়ে ওঠে, তাহলে পর্যটনশিল্পের চাকচিক্য দিয়ে ব্যর্থতা ঢেকে রাখা যাবে না। কক্সবাজারের নিরাপত্তাসংকট অবশ্য হোটেলের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তাও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো ছুটিতে সৈকতে বিপুল সংখ্যক পর্যটকের সমাগমের মধ্যে সাগরে চোরাগর্ত, চোরাবালি ও প্রবল স্রোতের সতর্কসংকেত উপেক্ষা করে অনেকেই পানিতে নামেন। তাই বিপদ এড়াতে শুধু সতর্কতামূলক পতাকা উত্তোলন যথেষ্ট নয়।
বিপজ্জনক এলাকায় নিয়মিত টহল, প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, উদ্ধার সরঞ্জাম, তাৎক্ষণিক চিকিৎসা এবং পর্যটকদের বোধগম্য ভাষায় সতর্কবার্তা প্রয়োজন। সৈকতের সব অংশে সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও কোথায় সাঁতার নিরাপদ, কোথায় বিপজ্জনক এবং কোন সময়ে পানিতে নামা নিষেধ তা স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি। বিপদসংকেত উপেক্ষা করলে পর্যটকের ব্যক্তিগত দায় থাকতে পারে; কিন্তু কার্যকর উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যুক্ত হয়েছে সড়ক ও যোগাযোগের দুর্ভোগ।
শহরের যানবাহন চলাচল, পথচারীদের নিরাপদ চলাচল, সৈকতসংলগ্ন সড়কের শৃঙ্খলা এবং মেরিন ড্রাইভে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। পর্যটন মৌসুম কিংবা ছুটির দিনে যানজট, অপরিকল্পিত পার্কিং ও সড়কে বিশৃঙ্খলা মানুষের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নষ্ট করে; জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুলেন্স বা অগ্নিনির্বাপণ গাড়ির চলাচলও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে সড়কের নিরাপত্তাকে শুধু যানজট নিরসনের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দেখতে হবে পর্যটকের জীবন রক্ষা, উদ্ধার কার্যক্রম এবং সামগ্রিক নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে।
কক্সবাজারের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো— সেবার মানের সঙ্গে ব্যয়ের অসংগতি। পর্যটকেরা হোটেলভাড়া, খাবারের দাম ও পরিবহন ব্যয়ের বিনিময়ে যে মানের সেবাপ্রত্যাশা করেন, বাস্তবে তা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত হয় না। খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে অবহেলার সুযোগ নেই। সমুদ্রের মাছ, শুঁটকি কিংবা সামুদ্রিক খাবার কক্সবাজারে পর্যটক আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু খাবার তাজা কি না, সংরক্ষণ সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, রান্নাঘর পরিচ্ছন্ন কি না, নিরাপদ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না এবং মেনুতে উল্লেখ করা দামের সঙ্গে বিলের মিল আছে কি না এসব বিষয়ে পর্যটককে নির্ভরযোগ্য নিশ্চয়তা দিতে হবে। খাবারের মান নিয়ে প্রতিটি অভিযোগকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়; একইভাবে অভিযোগকে গুরুত্বহীন বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি তদারক, মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি ছাড়া এ আস্থা তৈরি হবে না। পর্যটকের পক্ষে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, রান্নাঘর কিংবা জরুরি নির্গমনপথ পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। সেই কারণেই রাষ্ট্রীয় তদারকি, স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ এবং নিয়মিত পরিদর্শনের বিকল্প নেই। সৈকতের নির্দিষ্ট কয়েকটি পয়েন্টে দোকানপাট, বিচ বাইক, ঘোড়া, ফটোগ্রাফার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রমের আধিক্য পর্যটকের স্বস্তি এবং সৈকতের স্বাভাবিক পরিবেশকে নষ্ট করছে। প্রকৃতিকে কেন্দ্র করেই কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের জন্ম। অথচ সেই প্রকৃতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, সৈকতকে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যের জায়গায় পরিণত করে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়ে দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব নয়।
পর্যটকের ভিড় বাড়লেই পর্যটনশিল্পের উন্নতি হয় না; পর্যটক কতটা নিরাপদ, কতটা স্বস্তিতে সময় কাটাতে পারেন, পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকে এবং স্থানীয় মানুষের জীবনে কী ধরনের ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে এসব দিয়েই উন্নয়নের মান নির্ধারিত হওয়া উচিত। টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি স্থাপনার ক্ষতি নয়; এটি পর্যটন ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তাব্যবস্থা, তদারকি এবং প্রস্তুতিরও পরীক্ষা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস পাঠানো কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো— এমন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা কমে আসে। অগ্নিকাণ্ড ঘটার পর উদ্ধারকাজ পরিচালনা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আগুন যাতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে না পারে, মানুষ যাতে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারে এবং বিপদের মুহূর্তে জরুরিসেবা যাতে দ্রুত পৌঁছাতে পারে, সেই প্রস্তুতি আগেই নিশ্চিত করা। কোনো স্থাপনায় নিয়মিত পরিদর্শন না হলে, নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কিংবা অনিয়ম জেনেও কর্তৃপক্ষ নীরব থাকলে সেই ব্যর্থতা শুধু স্থাপনার মালিকের নয়; তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোরও। পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব একক কোনো সংস্থার নয়।
পর্যটন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার, প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, ভবন নির্মাণ ও ব্যবহারের অনুমোদনদাতা প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে। দায়িত্বের এ বিভাজন যেন দায় এড়ানোর সুযোগে পরিণত না হয়। কোনো দুর্ঘটনার পর এক প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের দিকে আঙুল তুলবে, আর শেষ পর্যন্ত তদন্তের ফলাফল ও জবাবদিহি আড়ালে থেকে যাবে এমন সংস্কৃতি চলতে পারে না। পর্যটনশিল্পে নিরাপত্তার প্রশ্নে সমন্বিত দায়িত্ব এবং কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যটি হলো, বিপদের আশঙ্কা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই অবগত ছিল।
একাধিক জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিস জুন মাসে রিসোর্টটি পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং ১১ জুন সতর্কতামূলক নোটিশ দিয়েছিল। এরপরও রিসোর্টটি কার্যক্রম চালিয়ে যায়। অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় ফায়ার লাইসেন্স ছিল না এবং অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থায়ও ঘাটতি ছিল। এখানেই রাষ্ট্রীয় তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন দেখা দেয়।
একটি স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও কীভাবে সেখানে পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ অব্যাহত থাকে? নোটিশ দেওয়াই কি কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের শেষ ধাপ? ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা বন্ধ করা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নিয়ম মানার বিষয়টি পুনরায় যাচাই করার দায়িত্ব কার? সতর্কবার্তা যদি বাস্তব পদক্ষেপে রূপ না নেয়, তাহলে সেই সতর্কবার্তার কার্যকারিতা কোথায়? দেশের পর্যটনশিল্পের বিকাশের সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো।
কক্সবাজার, ইনানী, সেন্ট মার্টিন, সাজেক, বান্দরবান, সুন্দরবন ও সিলেটের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের সঙ্গে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মানদণ্ডের বাস্তবায়ন সমানতালে এগোচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কক্সবাজারের পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৮০ কিলোমিটার এলাকায় আনুমানিক ২৫০টি স্থাপনার প্রয়োজনীয় অনুমোদনসংক্রান্ত ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতির মধ্যে অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয় রয়েছে।
প্রকৃতির সৌন্দর্যকে পুঁজি করে পর্যটন ব্যবসা করা যায়; কিন্তু মানুষের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে সেই ব্যবসার নৈতিকভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কাঠের কটেজ, পাহাড়ি রিসোর্ট কিংবা সমুদ্রতীরের স্থাপনা যে ধরনের অবকাঠামোই হোক, নির্মাণসামগ্রীর প্রকৃতি, আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি, বাতাসের প্রবাহ, পর্যটকের সংখ্যা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কক্সবাজার শুধু একটি সমুদ্রসৈকত নয়; এটি বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, বহু মানুষের জীবিকার উৎস এবং জাতীয় পরিচিতির অংশ।
তাই এখানে নিরাপত্তার ঘাটতি মানে শুধু কয়েকজন পর্যটকের ভোগান্তি নয়। এটি দেশের পর্যটনশিল্পের ভাবমূর্তি, বিনিয়োগের আস্থা, স্থানীয় মানুষের আয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সমুদ্রের ঢেউকে থামানো যাবে না, প্রকৃতির সব ঝুঁকিও দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু অবহেলা, অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং পরিকল্পনার অভাব থেকে তৈরি বিপদ অনেকটাই প্রতিরোধ করা যায়। কক্সবাজারে পর্যটক বাড়ানোর প্রচারণার আগে তাই নিশ্চিত করতে হবে পর্যটকের নিরাপত্তা, সেবার মান এবং প্রকৃতির সুরক্ষা। কারণ, অবকাশ তখনই অবকাশ হয়ে ওঠে, যখন মানুষ নিশ্চিন্তে তার আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
কক্সবাজারের সৈকত যেন আতঙ্কের স্মৃতি নয়, নিরাপদ আনন্দের প্রতীক হয়। পর্যটনশিল্পের সাফল্য শুধু কত মানুষ এলেন, তা দিয়ে নয়, বরং কত মানুষ নিরাপদে ফিরে গেলেন, কতটা আস্থা নিয়ে আবার আসতে চান, তা দিয়েও বিচার করতে হবে। অবরুদ্ধ অবকাশকে মুক্ত করার দায়িত্ব এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
