নৈতিকতার জন্য ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব
মহিমা জান্নাত
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
শিক্ষা মানে শুধু সার্টিফিকেট নয়। শিক্ষা মানে মানুষ হওয়া। একজন শিক্ষার্থী গোল্ডেন জিপিএ পেতে পারে, কিন্তু যদি তার ভেতরে সততা না থাকে, মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা না থাকে, অন্যের প্রতি দয়া না থাকে, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ। আজ আমাদের চারপাশে তাকালে এ অসম্পূর্ণ শিক্ষার চিত্রই বেশি দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলে মাদকাসক্ত, স্কুলের মেধাবী ছাত্রী সাইবার বুলিং করছে, সামান্য কারণে বন্ধুকে ছুরি মারছে। প্রযুক্তি আমাদের মেধাবী করেছে, কিন্তু নৈতিকভাবে আমরা কি উন্নত হয়েছি? উত্তরটা কঠিন। আর এ কঠিন প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো— ধর্মীয় শিক্ষা। বিশেষ করে ইসলামী শিক্ষা। ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখানে নামাজ, রোজা যেমন আছে, তেমনি আছে কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে পথ চলতে হবে, কীভাবে ব্যবসা করতে হবে, কীভাবে প্রতিবেশীর হক আদায় করতে হবে— তার পূর্ণ নির্দেশনা। ইসলামে নৈতিকতার ভিত্তি দুটি— তাকওয়া (আল্লাহভীতি) এবং ইহসান (সুন্দর আচরণ)। একজন শিক্ষার্থী যদি মনে করে, কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন, তবে সে কখনও নকল করতে পারবে না। পরীক্ষার হলে শিক্ষক না থাকলেও সে অসৎ উপায় অবলম্বন করবে না। এটাই তাকওয়া। আজকের সিসি ক্যামেরার যুগেও আমরা দুর্নীতি থামাতে পারছি না, কারণ ক্যামেরা ফাঁকি দেওয়া যায়। কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টি ফাঁকি দেওয়া যায় না— এ বিশ্বাসই পারে একজন মানুষকে ভেতর থেকে সৎ করতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দিতে প্রেরিত হয়েছি। —মুয়াত্তা মালিক। অর্থাৎ, ইসলামের মূল লক্ষ্যই হলো চরিত্র গঠন। ইসলাম দুই ধরনের জ্ঞানের কথা বলে— দুনিয়াবি জ্ঞান এবং দ্বীনি জ্ঞান। একজন ডাক্তার যদি দ্বীনি জ্ঞান না রাখে, সে রোগীর পকেট কাটবে। একজন ইঞ্জিনিয়ার যদি নৈতিকতা না জানে, সে রডের বদলে বাঁশ দেবে। তাই দুনিয়ার শিক্ষার সঙ্গে দ্বীনের শিক্ষা থাকতেই হবে। কুরআনে আল্লাহ বলেন, আর তোমরা পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। —সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত ২৩। আজ কত শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। কারণ তার সার্টিফিকেট আছে, কুরআনের এ আয়াতের শিক্ষা নেই। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে নিজে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়। —বুখারি। একজন শিক্ষার্থী যখন কুরআন শিখবে, সে শিখবে ধৈর্য, শিখবে ক্ষমা। সূরা আল-আসরে আল্লাহ সময়ের শপথ করে বলেছেন, মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে, কিন্তু যারা ঈমান আনে, সৎ কাজ করে এবং একে অপরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়, তারা নয়। এ চারটি গুণই একজন আদর্শ শিক্ষার্থীর গুণ। ইসলামে মিথ্যা বলা কবিরা গুনাহ। রাসুল (সা.) বলেছেন, সত্য মানুষকে মুক্তি দেয়, মিথ্যা ধ্বংস করে। একজন ছাত্র যদি ছোটবেলা থেকে জানে, মিথ্যা বললে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, সে আর মিথ্যা বলবে না। পরীক্ষার খাতা, বন্ধুর গোপন কথা, রাষ্ট্রের সম্পদ— সবই আমানত। কুরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন, আমানত তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দিতে। —সূরা নিসা, আয়াত ৫৮। এ শিক্ষা পেলে শিক্ষার্থী ঘুষ খাবে না, প্রশ্নফাঁস করবে না। ইসলাম শালীন পোশাককে সম্মানের প্রতীক করেছে। মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে। —সূরা নূর, আয়াত ৩১। পর্দা মানে পিছিয়ে থাকা নয়, পর্দা মানে নিজেকে সম্মানিত রাখা। একজন পর্দাশীল মেয়ে ক্যাম্পাসেও নিরাপদ, আত্মবিশ্বাসী। তার পোশাকই তাকে বখাটেদের থেকে রক্ষা করে। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা জমিনবাসীর প্রতি দয়া করো, আসমানবাসী তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। এ শিক্ষা পেলে শিক্ষার্থী বৃদ্ধ রিকশাওয়ালাকে ধাক্কা দেবে না, বরং সাহায্য করবে। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে মাদ্রাসা মানেই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়। বাগদাদের বায়তুল হিকমা, স্পেনের কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে কুরআন, হাদিসের পাশাপাশি বিজ্ঞান, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা পড়ানো হতো। ইবনে সিনা ছিলেন একাধারে হাফেজ ও বিশ্বের সেরা চিকিৎসক। আল-বিরুনি ছিলেন মুফাসসির ও গণিতবিদ। কারণ, তাদের শিক্ষায় দ্বীন ও দুনিয়া আলাদা ছিল না। আজ আমরা দ্বীনকে আলাদা করে দিয়েছি। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা হয়েছে দুই ভাগ— একদল শুধু দুনিয়া জানে, দ্বীন জানে না, আরেকদল শুধু দ্বীন জানে, দুনিয়া জানে না। এ বিভাজনই আমাদের নৈতিক সংকটের কারণ। আজ বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং, ইভটিজিং, মাদক, আত্মহত্যা বাড়ছে। এর কারণ আত্মিক শূন্যতা। একটি ছেলে যখন ফজরের নামাজ পড়ে দিন শুরু করে, তার দিনে বরকত আসে। তার ভেতরে অস্থিরতা থাকে না। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু একটি বই পড়ালে হবে না, ব্যবহারিকভাবে চর্চা করতে হবে। স্কুলে প্রতিদিন কুরআনের একটি আয়াতের অর্থসহ আলোচনা, রাসুল (সা.)-এর জীবনী থেকে একটি ঘটনা শোনানো, নামাজের বিরতি রাখা এবং শিক্ষকদের নিজেদের আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। কারণ, ছাত্ররা বইয়ের চেয়ে শিক্ষককে বেশি অনুসরণ করে। প্রযুক্তি দিয়ে রকেট বানানো যায়, কিন্তু রকেট কোন দিকে যাবে, তা ঠিক করে দেয় নৈতিকতা। আর নৈতিকতার কম্পাস হলো ধর্ম। ইসলাম সেই কম্পাসকে সঠিক দিক দেখায়। একজন শিক্ষার্থী যখন জানবে, তার প্রতিটি কাজ লিপিবদ্ধ হচ্ছে, কিয়ামতের দিন জবাব দিতে হবে, তখন সে আর অন্যায় করতে পারবে না। সে হবে সৎ, বিনয়ী, পরিশ্রমী। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানকে শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার মেশিন না বানিয়ে, মানুষ বানানো। আর মানুষ বানাতে হলে ইসলামী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কারণ, ইসলামই আমাদের শেখায়— দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করো, কিন্তু সেই জ্ঞান যেন হয় মানুষের কল্যাণের জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ
