নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে নিবন্ধন ও তদারকি জরুরি
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিরাপদ খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। সুস্থ জীবনযাপন, রোগ প্রতিরোধ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্যের বিকল্প নেই। কিন্তু খাদ্যে ভেজাল, নিম্নমানের উপকরণের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত এবং পণ্যের উপাদান সম্পর্কে যথাযথ তথ্য না থাকার মতো সমস্যা এখনও উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতিতে খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন ও বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ সময়োপযোগী। আগামী ১ নভেম্বর থেকে 'নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬' কার্যকর হলে খাদ্য খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার নতুন সুযোগ তৈরি হবে। নতুন বিধানের আওতায় রাস্তার পাশের খাবারের দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী, প্যাকেটজাত খাবারের উৎপাদক, খাদ্য সংরক্ষণাগার এবং নির্ধারিত আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করতে হবে। এর ফলে উৎপাদক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা সহজ হবে। কোনো পণ্যের মান নিয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও বাড়বে।
প্রবিধানমালার একটি ইতিবাচক দিক হলো, নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধন বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনে উৎসাহিত করা সম্ভব হবে। তবে বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের জন্য পৃথক লাইসেন্স ও অনুমোদনের ব্যবস্থা থাকায় ব্যবসায়ীদের নিজ নিজ কার্যক্রম অনুযায়ী নিয়ম মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের ফর্মুলা দুধ, রোগী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্য, পুষ্টি-সম্পূরক এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবি-সংবলিত পণ্যের ক্ষেত্রে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এসব পণ্যের নিরাপত্তার সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য সরাসরি জড়িত। তবে শুধু নিবন্ধন ও লাইসেন্স চালু করলেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে না। নিবন্ধন নম্বর থাকাকে পণ্যের মানের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। খাদ্য উৎপাদনের পরিবেশ, কাঁচামালের গুণগত মান, সংরক্ষণপদ্ধতি, মেয়াদ, প্যাকেটের তথ্য এবং বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নতুন প্রবিধানমালার উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। তাই বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জনবল, পরীক্ষাগার, পরিদর্শন সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। রাস্তার পাশের পিঠা, পুরি-পেঁয়াজুর দোকান কিংবা ছোট খাবারের দোকানের ব্যবসায়ীদের অনেকেরই স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান বা আর্থিক সামর্থ্য নেই। তাঁদের নিবন্ধনের আওতায় আনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পানি ব্যবহার এবং খাদ্য সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া এবং অযথা হয়রানি বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় নিবন্ধনপ্রক্রিয়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে উঠতে পারে। লাইসেন্সের ফি ও অন্যান্য শর্তও ব্যবসার ধরন ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনলাইন আবেদনব্যবস্থা দ্রুত চালু করা গেলে সময়, খরচ ও দাপ্তরিক জটিলতা কমবে। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের তথ্য সহজে যাচাই করার সুযোগ থাকলে ভোক্তারাও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; উৎপাদক, বিক্রেতা ও ভোক্তা— সবারই দায়িত্ব রয়েছে। ভোক্তাদেরও পণ্যের লেবেল, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নতুন প্রবিধানমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে খাদ্য ব্যবসায় স্বচ্ছতা বাড়বে, অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে তাই আইন প্রণয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, জনসচেতনতা ও দৃশ্যমান প্রয়োগ।
