কক্সবাজারের সংকট ও সম্ভাবনার রূপরেখা

সাইয়্যিদ মঞ্জু

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কক্সবাজার শুধু বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত পরিবেষ্টিত পর্যটননগরীই নয়, বরং দেশটির ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত দিক থেকেও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। তবে রূপসী এ জনপদ বর্তমানে নানামুখী জটিল ও বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান, সীমান্তপথে মাদকের বিস্তার, নাফ নদী ও তৎসংলগ্ন সীমান্তে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরকান আর্মি কর্তৃক নিবন্ধিত বাংলাদেশি জেলে অপহরণ, পরিবেশ বিধ্বংসী প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বন নিধন এবং স্থানীয় লবণচাষিদের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার মতো সমস্যাগুলো এখানকার জনজীবন, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। এসব বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় সঠিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও সময়োপযোগী উত্তরণের পথ খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক জান্তার নির্মম গণহত্যার মুখে বাধ্য হয়ে রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পূর্বে অবস্থানরতদের মিলিয়ে বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ঘিঞ্জি ক্যাম্পে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিলেও, এই আশ্রয় এখন কক্সবাজারের জন্য এক বিশাল সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বোঝায় পরিণত হয়েছে। বিশাল এ জনগোষ্ঠী কর্মহীন ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করায় প্রতিনিয়ত গ্যাং কালচার, অপহরণ, মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্রের মহড়া ও মাদক চোরাচালানের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আরসা এবং আরএসও-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে ক্যাম্পগুলো দিন দিন মারাত্মকভাবে অস্থির হয়ে উঠছে। প্রায় ৮ হাজার একরেরও বেশি সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক অধিবাস ও এশীয় হাতির ঐতিহাসিক পরিযায়ণ পথ ধ্বংস হয়েছে, পাহাড় ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের দরুন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মক নিচে নেমে গভীর পানীয় জলসংকট তৈরি হয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের মূল অধিবাসীদের চেয়ে রোহিঙ্গাদের জনসংখ্যা বহুগুণ বেশি হয়ে পড়ায় স্থানীয়রা নিজ ভূমিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার কারণে রোহিঙ্গারা তুলনামূলক নিশ্চিত জীবনযাপন করলেও স্থানীয় নিম্নআয়ের মানুষ চরম মূল্যস্ফীতি ও সম্পদের প্রতিযোগিতায় দিশাহারা। তদুপরি, শ্রমবাজারে সস্তা রোহিঙ্গা শ্রমিকের অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে স্থানীয় দিনমজুর ও কৃষি শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছেন। রোহিঙ্গাদের পূর্ণ মানবিক অধিকার, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তাসহ নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই এর একমাত্র টেকসই সমাধান। এর জন্য জাতিসংঘ, চীন, ভারত এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমার সরকার ও রাখাইনের নীতিনির্ধারকদের ওপর বহুমুখী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি। ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ও ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথ বাহিনীর সার্বক্ষণিক সশস্ত্র টহল, আধুনিক ড্রোন ও সিসিটিভি ক্যামেরা ট্র্যাকিং বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত ও ক্যাম্পে বায়োমেট্রিক নজরদারি জোরদার করে কোনো সন্ত্রাসী বা অপরাধী চক্রকে কোনো ছাড় না দেওয়ার 'জিরো টলারেন্স' নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না হওয়া পর্যন্ত কক্সবাজারের ওপর পরিবেশগত ও সামাজিক চাপ কমাতে আরও অধিকসংখ্যক রোহিঙ্গাকে উন্নত ও সুরক্ষিত ভাসানচরে পর্যায়ক্রমে স্থানান্তর করা আবশ্যক। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাহায্যসংস্থাগুলোর মানবিক সহায়তা হ্রাস পাওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের ওপর যেন অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না পড়ে, সে জন্য আন্তর্জাতিক ফান্ডিং পুনরুজ্জীবিত করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান এবং মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ জটিল স্থল ও নদী সীমান্ত একে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত করেছে। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা এবং বর্তমানে অত্যন্ত মারাত্মক ও জীবনঘাতী ক্রিস্টাল মেথ বা 'আইস'-এর প্রধান প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে এই সীমান্ত। টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ ও নাফ নদী কেন্দ্রিক চোরাচালান চক্রের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত কোটি কোটি টাকার মাদক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত সুসংগঠিত দেশি-বিদেশি আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক।

?স্থানীয় তরুণ ও যুবসমাজের একটা বড় অংশ দ্রুত ধনী হওয়ার লোভে 'ক্যারিয়ার' বা বহনকারী হিসেবে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে সহজলভ্যতার কারণে মাদকের সেবনে আসক্ত হয়ে অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছ, যা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকে ধসিয়ে দিচ্ছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও দুর্গম পাহাড়ি গিরিপথ, নাফ নদীর শাখা-প্রয়োজনীয় খাল এবং গভীর সাগরে মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে নিত্যনতুন উপায়ে মাদক দেশে ঢুকছে। নাফ নদী ও মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহল সমন্বিত করতে হবে। শুধু প্রথাগত পাহারা নয়, বরং থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা, নাইট ভিশন ড্রোন, আধুনিক স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং এবং শক্তিশালী রাডার স্থাপন করে পুরো সীমান্ত প্রযুক্তিগতভাবে সিল করে দিতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু খুচরা বহনকারী বা জেলেদের গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী 'গডফাদার', অর্থদাতা এবং অবৈধ সম্পদের মালিকদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি শাস্তি ও তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে। যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে এলাকায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। যারা এরইমধ্যে আসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সমাজের মূলধারায় ফেরাতে সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে আধুনিক নিরাময় ও মানসিকভাবে সক্ষম পুনর্বাসনকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠী 'আরকান আর্মি' র তীব্র ভূরাজনৈতিক সংঘর্ষের প্রভাব অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে পড়ছে কক্সবাজারের টেকনাফ, সেন্টমার্টিন ও নাফ নদী সীমান্ত এলাকায়। বিশেষ করে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় মাছ ধরতে যাওয়া নিরীহ বাংলাদেশি জেলেদের অস্ত্রের মুখে ধরে নিয়ে যাওয়া, নির্যাতন করা ও মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীতে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট জলসীমায় অবস্থান করা সত্ত্বেও বহু বাংলাদেশি জেলেকে গায়ের জোরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরকান আর্মি। এটি আন্তর্জাতিক জলসীমা নীতি ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর মারাত্মক হুমকি। জেলেদের নিরাপত্তার অভাবে বঙ্গোপসাগরের একটি বড় অংশে মাছ ধরা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী সামুদ্রিক মৎস্য খাত মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়বে একদিন। মিয়ানমার সরকার এবং বর্তমানে রাখাইনের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী আরকান আর্মির কাছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শক্ত বার্তা পৌঁছাতে হবে। অনানুষ্ঠানিক কিংবা তৃতীয় পক্ষের (যেমন সীমান্ত বাণিজ্য মধ্যস্থতাকারী) মাধ্যমে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যেন কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশি জলসীমায় আগ্রাসন বা নাগরিকদের অপহরণ সহ্য করা না হয়। বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর মোহনায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর টহল বহুগুণ বাড়া প্রয়োজন। প্রতিটি নিবন্ধিত ফিশিং ট্রলারে জিপিএস ও ভেসেল ট্র্যাকিং সিস্টেম বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেন জেলেরাও নিজেদের সীমান্ত অবস্থান স্পষ্ট বুঝতে পারেন এবং বিপদকালে দ্রুত কোস্ট গার্ডের সংকেত পাঠাতে পারেন। ঝুঁকিপ্রবণ সীমান্ত এলাকাগুলোতে যৌথ টহলের মাধ্যমে জেলে বহরকে সুরক্ষা দিয়ে মাছ ধরার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কক্সবাজারের চকরিয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, পটুয়াটেক ও নাফ নদীর মোহনায় একসময় সুবিশাল ও সমৃদ্ধ প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং সমুদ্রের নোনা জলের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে এই প্যারাবন প্রাকৃতিক মহাপ্রাচীর বা 'গ্রিন বেল্ট' হিসেবে উপকূল রক্ষা করে আসছে। তবে অসাধু চক্র ও অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক বিকাশের কারণে এই পরিবেশগত ঢাল আজ ধ্বংসের মুখোমুখি।

প্রভাবশালী স্থানীয় চক্র ও ভূ-দখলকারীরা ম্যানগ্রোভ বনের গাছ কেটে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে এবং নালা বন্ধ করে কৃত্রিমভাবে চিংড়ি ঘের, কাঁকড়া খামার এবং লবণের মাঠ তৈরি করছে। চকরিয়া সুন্দরবনের মতো ঐতিহাসিক প্যারাবন প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে। ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংসের কারণে সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি ও কাঁকড়ার প্রাকৃতিক প্রজননকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে উপকূলে প্রাকৃতিক মৎস্য উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। প্যারাবন না থাকায় সামুদ্রিক জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় মাটির ক্ষয় বাড়ছে। এর ফলে সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগেই মহেশখালী, পেকুয়া ও টেকনাফের হাজার হাজার একর লোকালয় ও কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। জবরদখলকারীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দিতে হবে। প্যারাবন কেটে গড়ে তোলা সব অবৈধ চিংড়ি ঘের ও লবণের মাঠ উচ্ছেদ করে সরকারি বনভূমি পুনর্বহাল করা সময়ের দাবি। উদ্ধারকৃত জমি এবং টেকনাফ-মহেশখালীর উপকূলজুড়ে দ্রুত বর্ধনশীল ম্যানগ্রোভ প্রজাতির সামাজিক বনায়ন শুরু করতে হবে। এই বনায়ন রক্ষা ও পরিচর্যার দায়িত্বে স্থানীয়দের অংশীদারত্ব করতে হবে, যাতে বন বাঁচলে তাদের জীবনযাত্রাও বাঁচে। ধ্বংসাত্মক চিংড়ি চাষের বদলে প্যারাবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব 'ইকো-ট্যুরিজম' চালু করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত থাকবে, অন্যদিকে স্থানীয় অধিবাসীদের বিকল্প ও টেকসই আয়ের উৎস তৈরি হবে। বাংলাদেশের লবণের বাৎসরিক চাহিদার প্রায় শতভাগই পূরণ করে কক্সবাজারের পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, টেকনাফ ও সদর উপজেলার হাজার হাজার প্রান্তিক লবণচাষি। তীব্র রোদ ও হাড়ভাঙা পরিশ্রমে তারা দেশের ভোজ্য ও শিল্প খাতের ক্রুড লবণের জোগান দিলেও, প্রতি বছরই তারা সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। লবণ উৎপাদন মৌসুমে অসাধু লবণ মিল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে মাঠপর্যায়ে লবণের দাম কমিয়ে দেয়। ফলে প্রতি কেজি লবণ উৎপাদনে যে জমি ভাড়া, পলিথিন ও শ্রমিকের খরচ হয়, চাষিরা তার চেয়ে কম মূল্যে লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হন। স্থানীয় চাষিদের ঘরে পর্যাপ্ত লবণ মজুদ থাকা সত্ত্বেও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট বা শিল্প লবণের দোহাই দিয়ে বিদেশ থেকে শূন্য বা কম শুল্কে লবণ আমদানির অপচেষ্টা চালায়। এতে দেশীয় লবণের বাজার ধসে পড়ে এবং চাষিরা দেনার দায়ে জর্জরিত হন। এখনও প্রথাগত ও পলিথিন পদ্ধতিতে সীমিতভাবে লবণ চাষ করায় খরা ও অসময়ের বৃষ্টির কারণে প্রচুর লবণ নষ্ট হয়। তাছাড়া চাষিদের কাছে লবণ দীর্ঘদিন ধরে রাখার মতো আধুনিক গুদামজাতকরণ ব্যবস্থা নেই। ধানের মতো লবণের ক্ষেত্রেও সরকার কর্তৃক 'সর্বনিম্ন উৎপাদন ও বিক্রয় মূল্য' সরকারিভাবে নির্ধারণ করে দিতে হবে। বিসিকমাধ্যমে প্রাক-মৌসুমে চাষিদের সরাসরি আর্থিক সুরক্ষা দিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে সরকার সরাসরি লবণ কেনার উদ্যোগ নিতে পারে।

দেশে লবণের মজুত ও চাহিদা সঠিকভাবে হিসাব করে দেশীয় উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকলে বিদেশ থেকে যেকোনো ধরনের লবণ আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। অসাধু উপায়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট এনে ভোজ্য লবণ হিসেবে বাজারজাত করার পথ আইনিভাবে পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। চাষিদের আধুনিক পলিথিন প্রযুক্তি ও ড্রায়ার ব্যবহারে সরকারি ভর্তুকি প্রদান করে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের প্রধান লবণ উৎপাদন অঞ্চলগুলোতে জলবায়ু সহনশীল আধুনিক 'সল্ট ব্যাংক' বা সরকারি গুদাম নির্মাণ করা প্রয়োজন, যেন দাম কম থাকার সময়ে চাষিরা লবণ সেখানে জমা রেখে স্বল্প সুদে ঋণ নিতে পারেন এবং পরে ভালো দামে বিক্রি করতে পারেন।

কক্সবাজারের এ সংকটগুলো মোটেই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং প্রতিটি সমস্যা একটির সঙ্গে অন্যটি গভীরভাবে অনুঘটক হিসেবে যুক্ত। সীমান্ত নিরাপত্তা দুর্বল হলে যেমন মাদক চোরাচালান ও আরকান আর্মির উৎপাত বাড়ে, তেমনি আবার লবণের সঠিক দাম না পেলে বা সমুদ্রে জেলেদের নিরাপত্তা না থাকলে প্রান্তিক মানুষ বাধ্য হয়ে পরিবেশ বিধ্বংসী প্যারাবন নিধন কিংবা অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

তাই এ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন অঞ্চলকে রক্ষা করতে হলে খণ্ড খণ্ড উদ্যোগের বদলে একটি দীর্ঘমেয়াদি কক্সবাজার স্পেশাল অ্যাকশন প্ল্যান গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই প্ল্যানে টেকসই পর্যটন শিল্প, নীল অর্থনীতি সীমান্ত নিরাপত্তা, এবং সামাজিক সুরক্ষা— এ চার স্তম্ভকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের একটি অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বা পর্যটনকেন্দ্রই নয়, এটি আমাদের জাতীয় ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব, ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির প্রতীক। এ অঞ্চলকে যদি অপরাধের স্বর্গরাজ্য, পরিবেশগত বিপর্যয় ও চরম অর্থনৈতিক ধস থেকে রক্ষা করা না যায়, তবে তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে গোটা বাংলাদেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর। রোহিঙ্গা সমস্যার আন্তর্জাতিক সমাধান, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারকরণ, প্রাকৃতিক প্যারাবন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রান্তিক লবণচাষি ও জেলেদের অর্থনৈতিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই শুধু কক্সবাজারকে তার হারানো সৌন্দর্য, নিরাপত্তা ও গৌরব ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। সরকারি সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর ও স্বচ্ছ আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় সমন্বয়ের মাধ্যমেই একটি নিরাপদ, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও পরিবেশগতভাবে টেকসই কক্সবাজার গড়ে তোলা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক : কবি