এনআইডি সংশোধনে গতি বাড়ুক, নিশ্চিত হোক নির্ভুলতা

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক। জমা পড়া ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি করা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তবে এখনও ১ লাখ ২৮ হাজার ১০টি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন কারণে বাতিল হয়েছে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন। এই পরিসংখ্যান একদিকে কমিশনের কর্মতৎপরতার পরিচয় দেয়, অন্যদিকে এনআইডি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকেও সামনে আনে।

জাতীয় পরিচয়পত্র নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র। ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট তৈরি, সরকারি সেবা গ্রহণ, জমিজমা নিবন্ধনসহ নানা কাজে এর প্রয়োজন হয়। ফলে এনআইডিতে নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা কিংবা অন্য কোনো তথ্য ভুল থাকলে নাগরিককে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরি, বিদেশযাত্রা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে তথ্যের অসংগতি বড়

বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সংশোধনের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা নির্বাচন কমিশনের নিয়মিত প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি নাগরিকসেবা নিশ্চিত করারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইসি জানিয়েছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত জমা পড়া আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের আবেদনগুলোর নিষ্পত্তিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু প্রতি মাসে নতুন করে ৮০ থেকে ৯০ হাজার আবেদন জমা পড়ায় অপেক্ষমাণ আবেদনের চাপ পুরোপুরি কমানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় শুধু জনবল ও প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ালেই হবে না, আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে হবে।

অঞ্চলভেদে অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যায় পার্থক্য থাকায় সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোর সক্ষমতা ও কাজের চাপ পর্যালোচনা করা জরুরি। যেসব অঞ্চলে আবেদন বেশি জমে আছে, সেখানে অতিরিক্ত জনবল, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নিয়মিত

তদারকির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি আবেদনের অগ্রগতি জানার সুযোগ থাকলে নাগরিকেরা অযথা দপ্তরে দপ্তরে ঘুরবেন না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি না হলে তার কারণ জানানোও নিশ্চিত করা উচিত।

তবে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে গিয়ে যাচাই-বাছাইয়ে শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই। এনআইডি সংশোধনের নামে জালিয়াতি, বয়সের অসংগতি কিংবা ভুয়া নথি ব্যবহারের ঘটনা রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিবন্ধন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাবা ও সন্তানের বয়সের অস্বাভাবিক ব্যবধান কিংবা ভোটার হওয়ার সময় বয়সসংক্রান্ত অসংগতি যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

অনলাইনে যাচাইযোগ্য শিক্ষাসনদ ব্যবহারের উদ্যোগ এবং কর্মকর্তাদের কাজের ওপর নিয়মিত নজরদারি এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যেন প্রকৃত আবেদনকারীর জন্য অযথা জটিলতা তৈরি না করে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

একই বিষয়ে বারবার আবেদন করার প্রবণতা কমাতে আবেদনকারীদের স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। কোন ধরনের সংশোধনে কী কী নথি প্রয়োজন, কোন কর্মকর্তা আবেদন নিষ্পত্তি করবেন এবং আবেদন বাতিল হলে পুনর্বিবেচনার সুযোগ কী—এসব তথ্য সহজ ভাষায় প্রকাশ করা জরুরি। দালাল ও প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বড় কথা, ভুল তথ্য দিয়ে নিবন্ধন হওয়ার পর তা সংশোধনের চাপ তৈরি হয়। তাই শুরুতেই নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ, নথি যাচাই এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি প্রতিরোধব্যবস্থাও দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন।

৬৪ লাখের বেশি আবেদন নিষ্পত্তি নির্বাচন কমিশনের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এখন অবশিষ্ট আবেদন সময়মতো নিষ্পত্তি, নাগরিক ভোগান্তি হ্রাস এবং জালিয়াতি প্রতিরোধের মাধ্যমে এ অগ্রগতিকে টেকসই করতে হবে। দ্রুত সেবা ও নির্ভুল তথ্য—দুটির সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন ব্যবস্থা।