শিশুদের জন্য নিরাপদ শৈশব
কে এম মাসুম বিল্লাহ
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিকতার সংকট ও জবাবদিহির অভাবের নির্মম শিকার হচ্ছে আমাদের শিশুরা সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে শিশুদের প্রতি নির্মমতার এক ভয়াবহ চিত্র। সংবাদপত্রের পাতা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম— সবখানেই বারবার উঠে আসছে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা ও নিখোঁজ হওয়ার মর্মান্তিক খবর। চলতি বছরের মে মাসে মিরপুরের পল্লবীতে রামিসা হত্যাকাণ্ড, গত মাসে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ছেলে অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড কিংবা পারিবারিক সম্পত্তির বিরোধের জেরে আপন ফুফুর হাতে ভাতিজি হত্যার মতো ঘটনা আমাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। প্রতিটি ঘটনা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমাদের সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা কতটা নাজুক হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা ও দেশজুড়ে শিশু নিখোঁজ হওয়ার উদ্বেগজনক খবর। প্রশ্ন জাগে, সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিকতার সংকট কোন পর্যায়ে পৌঁছালে শিশুদের জীবনই এভাবে বিপন্ন হয়ে ওঠে?
একটি শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা রঙিন, নির্ভার ও নিরাপদ। বাবা-মায়ের স্নেহ, শিক্ষকের সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রতিবেশীর মমতা এবং সমাজের আশ্রয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার কথা তার। অথচ সেই শৈশয়ই যখন নির্যাতন, নিপীড়ন, যৌন সহিংসতা ও মৃত্যুভয়ের মুখোমুখি হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে— আমরা আসলে কোন সমাজ নির্মাণ করছি? যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খেলনা আর স্বপ্ন, সেই বয়সে তাকে কেন ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে লড়তে হবে?
শিশু নির্যাতনের ব্যাপকতা বোঝার জন্য পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো জরুরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ আগের এক মাসে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ, শাসন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নামে সহিংসতা এখনও বহু শিশুর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। শিশুকে মানুষ করার নামে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করার এই প্রবণতা আমাদের অভিভাবকত্ব ও সামাজিক মূল্যবোধ— উভয়কেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
যৌন নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩০৬ জন মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল; আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১৭৫। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার ১২৯টি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর অন্তত ৩৬ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও জানায় সংস্থাটি। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ২৩৬ নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়। তাদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৭৯ জনের ৪৭ জন ছিল শিশু ও কিশোরী। প্রতিবেদনটি ১৬টি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর ও সংস্থাটির নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল বলে জানানো হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, এসব সংখ্যা নথিভুক্ত ও বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত ঘটনার হিসাব; প্রকৃত চিত্র আরও বিস্তৃত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জা, ভয়, পারিবারিক চাপ কিংবা অপরাধীর প্রভাবের কারণে নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ পায় না। ফলে পরিসংখ্যানের বাইরেও অসংখ্য শিশু নীরবে সহিংসতার শিকার হতে পারে।
এ পরিসংখ্যান শুধু অপরাধের হিসাব নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক বিবেকের সামনে দাঁড় করানো একেকটি প্রশ্ন।
যে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের, সেই শিশুই যদি পরিচিত মানুষের হাতে নির্যাতিত হয়, তাহলে নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণা কতটা কার্যকর? শিশুর সরল বিশ্বাস যখন তার অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়ার পথ হয়ে ওঠে, তখন শুধু অপরাধীকে দোষারোপ করেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়?
শিশু নির্যাতনকে বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের সমষ্টি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিকৃত মানসিকতা, শিশুর প্রতি অসম্মান, পারিবারিক অবহেলা, অপরাধ গোপন করার প্রবণতা এবং অপরাধীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা। অনেক পরিবারে শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না; বরং ভয় দেখানো, অপমান করা কিংবা শারীরিক শাস্তিকে স্বাভাবিক শাসন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ফলে শিশুরা নিজের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায় সম্পর্কে কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলে। আবার যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে তাকে কিংবা তার পরিবারকে দোষারোপ করার প্রবণতাও দেখা যায়। এমন মানসিকতা অপরাধীর সাহস বাড়ায়, আর শিশুকে ঠেলে দেয় আরও গভীর অসহায়ত্বের দিকে।
এ বাস্তবতায় প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। ব্যস্ততার অজুহাতে সন্তানের মানসিক বিকাশ, নিরাপদ বিনোদন ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষার বিষয়গুলো উপেক্ষা করা যাবে না। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, অনলাইনে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে— এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। একই সঙ্গে সন্তানকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে সে ভয় বা লজ্জা ছাড়াই নিজের সমস্যা, অস্বস্তি কিংবা নির্যাতনের কথা বলতে পারে। শিশুকে অপরিচিত ব্যক্তির পাশাপাশি পরিচিত মানুষের অনুপযুক্ত আচরণ সম্পর্কেও বয়সোপযোগী ধারণা দিতে হবে। কারণ, শিশু সুরক্ষা মানে শুধু বিপদ থেকে দূরে রাখা নয়; বিপদের লক্ষণ চিনতে শেখানো এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে সাহসী করে তোলাও।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে শিশু সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষকদের জন্য শিশু সুরক্ষা ও নির্যাতন শনাক্তকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদব্যবস্থা, নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং অভিযোগের দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। পাড়া-মহল্লায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এসব কমিটির কাজ হবে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের চিহ্নিত করা, পরিবারকে সচেতন করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া। তবে এসব উদ্যোগ যেন শুধু নামসর্বস্ব কমিটি কিংবা আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিশু নির্যাতনের অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও বিচার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ভুক্তভোগীবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে যেন কোনো পরিবার হয়রানি বা অবহেলার শিকার না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে দ্রুত অনুসন্ধান, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আলাদা টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে নতুন বাহিনী গঠনের চেয়ে বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও শিশু সুরক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, সমন্বয় এবং জবাবদিহি বাড়ানো অধিক জরুরি হতে পারে।
অপরাধীর দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার শিশুর চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। শুধু শাস্তি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; শিশুটিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয়, ছবি কিংবা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে, যা তার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা। একটি শিশুর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি করে না, বরং সমাজের ভবিষ্যৎকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর পাশাপাশি অপরাধের অনুকূল পরিবেশ দূর করতে হবে। পরিবারে সহমর্মিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা, সমাজে সচেতনতা এবং রাষ্ট্রে জবাবদিহি—এই চারটি ভিত্তি শক্তিশালী না হলে শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা কঠিন।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক, নেতৃত্ব ও সমাজ নির্মাতা। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি তাদের অধিকার এবং রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক দায়িত্ব। আমরা যদি শিশুদের জন্য নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে না পারি, তবে উন্নয়ন, অগ্রগতি কিংবা সভ্যতার বড় বড় দাবি শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়বে।
ভুলে গেলে চলবে না, আজকের প্রতিটি কুঁড়ির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের সুন্দর ফুল। সেই ফুল প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই যেন ঝরে না পড়ে। প্রতিটি শিশু বেড়ে উঠুক ভয়মুক্ত পরিবেশে, ভালোবাসা ও মর্যাদা নিয়ে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই প্রমাণ হোক— আমরা শুধু উন্নত রাষ্ট্র নয়, একটি মানবিক সমাজও গড়ে তুলতে চাই।
লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট
