প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ ও আমাদের পাহাড়
রহমত উল্লাহ
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, সবুজের সমারোহ, মেঘের আনাগোনা, ঝরনার কলধ্বনি আর পাহাড়ি জনপদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন— সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। এ সৌন্দর্যের টানেই প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক ছুটে যান বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি কিংবা কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায়। প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানো, ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করা কিংবা পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করাই তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু যে পাহাড়ের সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে, সেই পাহাড়ই আজ মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে ক্রমশ বিপন্ন হয়ে উঠছে।
পর্যটনশিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়জুড়ে গড়ে উঠছে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও নানা বাণিজ্যিক স্থাপনা। নতুন সড়ক নির্মাণ হচ্ছে, সম্প্রসারিত হচ্ছে যোগাযোগব্যবস্থা, বাড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিবেচনায় এসব উদ্যোগ ইতিবাচক মনে হলেও এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর পরিবেশগত সংকট। নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, প্রাকৃতিক জলধারা নষ্ট করা, প্লাস্টিক বর্জ্যের বিস্তার এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ পাহাড়ের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফলে একটি প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে আমরা কি নিজেরাই সেই সৌন্দর্য ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠছি?
পর্যটন নিঃসন্দেহে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে পরিবেশগত ভারসাম্য উপেক্ষা করে পর্যটনের সম্প্রসারণ ঘটলে তা দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের পরিবর্তে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। পাহাড়ের ঢাল, মাটির গঠন, বৃক্ষরাজি, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ এবং প্রাকৃতিক জলধারা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ ব্যবস্থার কোনো একটি উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর।
২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর একটি প্রতিবেদনে বান্দরবানের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের আশপাশে অপরিকল্পিত রিসোর্ট নির্মাণ, পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে লামা উপজেলার মিরিঞ্জা উপত্যকায় পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক জলধারা ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে তাদের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এ ঘটনা কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকার সংকট নয়; বরং পর্যটন উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপের একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত। যে পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে, সেই পাহাড়ের বুক চিরেই যদি একের পর এক বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মিত হয়, তবে ভবিষ্যতে পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো প্রাকৃতিক পরিবেশ আদৌ অবশিষ্ট থাকবে কি না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
পাহাড়ের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বৃক্ষরাজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাছের শিকড় মাটির স্তরকে ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং বৃষ্টির পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। কিন্তু হোটেল, রিসোর্ট, সড়ক কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটা ও গাছপালা অপসারণ করা হলে মাটির স্বাভাবিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে অতিবৃষ্টি যুক্ত হলে ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০০১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় ৭৩০টি ভূমিধসের ঘটনা চিহ্নিত করা হয়। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি জেলার মধ্যে চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি জেলায় মোট চিহ্নিত ভূমিধসের প্রায় ৫৫ শতাংশ ঘটেছিল। যদিও এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের গবেষণালব্ধ তথ্য, তবু পাহাড়ি অঞ্চলের ভূমিধসের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব রয়েছে। ভূমিধসের অন্যতম প্রাকৃতিক কারণ অতিবৃষ্টি। তবে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এর পরিণতি শুধু পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বসতবাড়ি, সড়ক, কৃষিজমি, পানির উৎস এবং মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সুতরাং পাহাড়ে কোনো পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূপ্রকৃতি, মাটির স্থিতিশীলতা, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ এবং পরিবেশগত ধারণক্ষমতা যাচাই করা অপরিহার্য। সাময়িক ব্যবসায়িক লাভের জন্য মানুষের জীবন ও প্রকৃতিকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই দায়িত্বশীল উন্নয়নের পরিচায়ক হতে পারে না।
পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের সমাগম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বর্জ্যের পরিমাণও। খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, প্লাস্টিকের কাপ, পলিথিনসহ নানা ধরনের অপচনশীল বর্জ্য অনেক সময় পর্যটকেরা যেখানে-সেখানে ফেলে যান। পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা না থাকায় এসব আবর্জনা পাহাড়ের ঢাল, ঝরনা, ছড়া ও জলাশয়ে জমা হয়।
পাহাড়ি এলাকার প্রাকৃতিক জলধারাগুলো কেবল সৌন্দর্যের উৎস নয়; স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। অনেক পরিবার পানীয় জল, গৃহস্থালির কাজ কিংবা কৃষিকাজের জন্য এসব উৎসের ওপর নির্ভরশীল। অথচ পর্যটন স্থাপনার অপরিশোধিত বর্জ্য, অতিরিক্ত পানি ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি এসব উৎসের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
একজন পর্যটকের ফেলে যাওয়া একটি প্লাস্টিকের বোতল হয়তো তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন শত শত মানুষের একই ধরনের অসচেতন আচরণ একসময় বড় ধরনের পরিবেশগত সমস্যায় রূপ নেয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা মানুষের একাংশই অসচেতনভাবে সেই সৌন্দর্য নষ্ট করার প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন। প্রকৃতি উপভোগ করার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার কখনো প্রকৃতিকে ধ্বংস করার স্বাধীনতা হতে পারে না। পাহাড় আমাদের বিনোদনের স্থান হলেও সেখানে বসবাসকারী মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর কাছে এটি জীবনধারণের অপরিহার্য আশ্রয়।
পাহাড়ি বনভূমি অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী এবং বিরল উদ্ভিদের অস্তিত্ব এই বনাঞ্চলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। কিন্তু পর্যটকদের অতিরিক্ত সমাগম, উচ্চ শব্দ, যানবাহনের চলাচল, বনভূমি পরিষ্কার করে স্থাপনা নির্মাণ এবং যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার কারণে বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
২০২৫ সালের ১৩ জুন প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর একটি প্রতিবেদনে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকসমাগমের কারণে জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর আয়তনের এই বনে ১৬৭ প্রজাতির গাছ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২২ প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে।
যদিও লাউয়াছড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অংশ নয়, তবু এই উদাহরণ সংবেদনশীল বনাঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের সম্ভাব্য প্রভাব বুঝতে সাহায্য করে।
একটি বন কেবল কিছু গাছের সমষ্টি নয়; এটি অসংখ্য প্রাণের আবাসস্থল এবং একটি জটিল প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ। মানুষের বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে গিয়ে যদি বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। তাই পর্যটন পরিকল্পনায় মানুষের সুবিধার পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণীর নিরাপদ বিচরণ ও আবাসস্থল সংরক্ষণকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
পাহাড়ের সংকট শুধু পরিবেশগত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি এবং অধিকার। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেকের দৈনন্দিন জীবন বন, ঝরনা, কৃষিজমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব সম্পদের ক্ষতি তাঁদের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্যটনশিল্পের বিকাশ স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। পর্যটকদের জন্য আবাসন, পরিবহন, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প ও গাইড সেবার মতো বিভিন্ন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু এই উন্নয়ন যদি স্থানীয় মানুষের মতামত, ভূমির অধিকার, পানির প্রাপ্যতা এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়, তবে তার সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে কেবল পর্যটনশিল্পের শ্রমশক্তি হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। তারা পাহাড়ের প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের সঙ্গে তাঁদের যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সেই অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞান পরিবেশ সংরক্ষণেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাই পাহাড়ে পর্যটন পরিকল্পনা গ্রহণের সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের মতামত ও অধিকারকে গুরুত্ব না দিয়ে গড়ে ওঠা উন্নয়ন প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না।
পাহাড় রক্ষার অর্থ পর্যটন বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং প্রয়োজন এমন একটি পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ সমান গুরুত্ব পাবে। অপরিকল্পিত পর্যটনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটনই হতে পারে এই সংকট মোকাবিলার কার্যকর পথ।
প্রথমেই পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশগত ছাড়পত্র, ভূমির উপযুক্ততা, নির্মাণবিধি এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব যাচাই ছাড়া কোনো পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন স্থাপনা ও পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশগত ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে কতজন পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন, তা বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে সংবেদনশীল বনাঞ্চল, ঝরনা ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
তৃতীয়ত, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা, নিরাপদ নিষ্কাশন এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে তাদের কার্যক্রমের ফলে সৃষ্ট বর্জ্যের দায়িত্ব নিতে হবে।
চতুর্থত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করতে হবে। স্থানীয় মানুষের পরিচালনায় পরিবেশবান্ধব আবাসন, পর্যটক গাইড সেবা, হস্তশিল্প ও অন্যান্য উদ্যোগকে উৎসাহিত করা গেলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয় পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারে।
পঞ্চমত, পর্যটকদের মধ্যে পরিবেশগত সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পাহাড়ে ভ্রমণের সময় যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, বন্য প্রাণীকে বিরক্ত না করা, উচ্চ শব্দ এড়িয়ে চলা, নির্ধারিত পথ অনুসরণ করা এবং সংরক্ষিত এলাকায় বিধিনিষেধ মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সর্বোপরি, পর্যটন কেন্দ্রগুলোর পরিবেশগত অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। নির্মাণকাজ, পানির ব্যবহার, বর্জ্য উৎপাদন, বনভূমির পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব মূল্যায়নের জন্য কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু অনুমোদন দেওয়াই যথেষ্ট নয়; অনুমোদনের শর্ত বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
পাহাড় কেবল ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনন্দের জায়গা নয়; এটি আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশগত নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণযোগ্য এক অমূল্য ঐতিহ্য। পাহাড়ের সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিকাশ যদি পাহাড় কেটে, বন ধ্বংস করে, পানির উৎস দূষিত করে এবং স্থানীয় মানুষের জীবনকে সংকটে ফেলে এগিয়ে যায়, তবে একসময় পর্যটনের মূল আকর্ষণই হারিয়ে যেতে পারে। একটি রিসোর্ট নির্মাণ করে স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক লাভ অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক বন, হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি প্রতিবেশব্যবস্থা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন, অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভবও হতে পারে।
তাই পর্যটনের সাফল্য কেবল পর্যটকের সংখ্যা, হোটেলের আয় কিংবা নতুন স্থাপনার পরিমাণ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং মূল্যায়ন করতে হবে, পর্যটনের বিকাশের পরও পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ কতটা অক্ষত থাকছে, জীববৈচিত্র্য কতটা সুরক্ষিত থাকছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী কতটা উপকৃত হচ্ছেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পাহাড়ের সৌন্দর্য কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একক সম্পদ নয়; এটি প্রকৃতি, মানুষ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্মিলিত উত্তরাধিকার। এই উত্তরাধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র, পর্যটন ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রতিটি পর্যটকের।
পাহাড়কে বাঁচিয়ে পর্যটন, পর্যটনের জন্য পাহাড় ধ্বংস নয় এই নীতিই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ পাহাড় হারিয়ে গেলে আমরা শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র হারাব না; হারাব প্রকৃতির ভারসাম্য, অসংখ্য প্রাণের আশ্রয়, মানুষের জীবন-জীবিকা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার মতো এক অমূল্য সম্পদ।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
