যে শরৎ হারিয়ে গেছে কনক্রিটের শহরে
সাবনীহা ইয়াছমিন
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
শিউলি এখনও ফোটে, ভোর হলে ঝরেও পড়ে, শুধু বদলে গেছে শিউলি কুড়ানোর সেই উঠোন, শিশিরভেজা সকাল আর ফুল কুড়াতে বেরিয়ে পড়া মানুষের ব্যস্ততাহীন দিনগুলো। ক্যালেন্ডারের পাতায় শরৎ আসে ঠিকই, আকাশে সাদা মেঘের ভেলাও ভাসে, কিন্তু সেই শরৎকে অনুভব করার অবকাশ কি আমাদের আগের মতো আছে?
শরৎ মানেই একসময় ছিল নীল আকাশ, সাদা কাশফুল আর ঘাসের ওপর ছড়িয়ে থাকা শিউলি। রাতের আঁধার পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটতেই গাছের নিচে জমত সাদা পাপড়ি আর কমলা বোঁটার ছোট ছোট ফুল। শিশিরভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটা, আঁজলা ভরে শিউলি কুড়ানো কিংবা ফুলের গন্ধে ম ম করা উঠোন এসবের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বাঙালির শরৎ-চেনা। অথচ সময়ের স্রোতে সেই চেনা দৃশ্যগুলো ক্রমেই স্মৃতির অ্যালবামে জায়গা করে নিচ্ছে। শিউলি শুধু একটি ফুল নয়, এটি বাঙালির ঋতুবোধের এক কোমল অনুষঙ্গ। এর শুভ্র পাপড়ি আর কমলা বোঁটার মধ্যে যেন মিশে আছে ভোরের স্নিগ্ধতা, শৈশবের সারল্য এবং উৎসবের আগমনী বার্তা। দুর্গাপূজার আবহ, নতুন জামার অপেক্ষা, ভোরের নির্মল বাতাস সবকিছুর সঙ্গে শিউলির এক অদৃশ্য যোগ রয়েছে।
শরৎকে চোখে দেখার পাশাপাশি হৃদয়ে ধারণ করার যে অভ্যাস, শিউলি তারই একটি অনন্য প্রতীক। কিন্তু নগরজীবনের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সেই নিবিড় সম্পর্ক কোথায় হারিয়ে গেল? শহর বড় হচ্ছে, বহুতল ভবন উঠছে, রাস্তা সম্প্রসারিত হচ্ছে, কিন্তু সেই সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে সবুজের পরিসর। হারিয়ে যাচ্ছে বাড়ির আঙিনার গাছ, পাড়ার খোলা জায়গা আর অনায়াসে প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ।
যেসব জায়গায় একসময় ঋতুর পরিবর্তন চোখে পড়ত, সেখানে এখন কংক্রিটের বিস্তার। অবশ্য সব জায়গার চিত্র এক নয়, তবু নগরায়ণের চাপে প্রকৃতির জায়গা হারানোর বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রকৃতি থেকে এই দূরত্ব শুধু গাছপালা হারানোর গল্প নয়, এটি আমাদের অনুভূতির জগতেও পরিবর্তন আনে। এখন সকালের শুরু হয় অনেকের মুঠোফোনের পর্দায় চোখ রেখে, দিনের ব্যস্ততা শেষ হয় ক্লান্ত শরীরে। ঋতুর আগমন টের পাওয়ার আগেই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি পরবর্তী কাজের হিসাব মেলাতে। জানালার বাইরে শিউলি ফুটেছে কি না, উঠোনে শিশির জমেছে কি না, কিংবা ভোরের বাতাসে শরতের গন্ধ আছে কি না—এসব খেয়াল করার সময়টুকুও যেন ক্রমে দুর্লভ হয়ে উঠছে। তবে দায় শুধু আধুনিক জীবনযাত্রার নয়।
প্রকৃতিকে আপন করে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার দায়িত্বও আমাদের। বাড়ির বারান্দায় একটি গাছ লাগানো, বিদ্যালয় কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ করা, পাড়ার অব্যবহৃত জায়গায় সবুজের পরিসর তৈরি করা— এমন ছোট উদ্যোগও প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারে। শিশুদের শুধু বইয়ের পাতায় ঋতুর পরিচয় না দিয়ে বাস্তবে ফুল, পাতা, গাছ ও পাখির সঙ্গে পরিচিত করানো প্রয়োজন। কারণ প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখা মানে শুধু সৌন্দর্য উপভোগ করা নয়, তাকে রক্ষা করার দায়ও অনুভব করা।
শিউলির একটি বিশেষ সৌন্দর্য আছে। ফুলটি গাছের ডালে ফুটে থাকলেও তার সৌন্দর্য ভোরের মাটিতে ঝরে পড়ার পরও ম্লান হয় না। বরং মাটিতে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য শিউলি মিলে তৈরি করে এক অপার্থিব দৃশ্য। এ ফুল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্যকে অনুভব করতে সব সময় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন শুধু একটু মনোযোগ, কিছুটা অবসর এবং চারপাশকে দেখার আন্তরিকতা।শরৎকে আগের মতো ফিরে পেতে হলে শুধু শিউলি গাছ লাগালেই হবে না, প্রকৃতির জন্য আমাদের মনেও জায়গা তৈরি করতে হবে। উন্নয়ন প্রয়োজন, নগরজীবনের অগ্রগতিও অনিবার্য; কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা যেন সবুজকে নির্বাসনে না পাঠায়।
শহরের পরিকল্পনায় গাছ, পার্ক, খোলা জায়গা ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনেও প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। শিউলি প্রতিবছরই ফুটবে, শরৎও তার নিয়মে ফিরে আসবে। কিন্তু সেই ঋতুকে অনুভব করার চোখ ও মন যদি হারিয়ে ফেলি, তবে ক্যালেন্ডারে শরৎ থাকলেও আমাদের জীবনে তার উপস্থিতি ক্রমেই ফিকে হয়ে যাবে। হয়তো একদিন আবার কোনো ভোরে শিউলি কুড়াতে গিয়ে আমরা বুঝতে পারব, হারিয়ে যাওয়া শরৎ আসলে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য প্রকৃতির দিকে একটু ফিরে তাকানোই যথেষ্ট। শিউলি আছে, শরৎও আছে এবার শুধু প্রকৃতির সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া আমাদের সম্পর্কটুকু ফিরিয়ে আনার পালা।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
