রিটার্নের নিয়ম না জানলে জরিমানা

সুদীপ্ত শামীম

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৯ সালে ই-টিআইএন খুলেছিলাম। তখন প্রয়োজন ছিল, তাই খুলেছি। কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটাতে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত যে কয়েক বছর পর জরিমানার বোঝা হয়ে সামনে দাঁড়াবে, তা ভাবিনি। ই-টিআইএন খোলার পর থেকে কখনো আয়কর রিটার্নও দাখিল করিনি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম, ই-টিআইএন ধারী অনেকের রিটার্ন জমা না দেওয়ায় জরিমানা এসেছে। বিষয়টি জানার পর নিজেও অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করতে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ করবর্ষের জন্য আমার নামে পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ১০ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরে ২০২৬-২৭ করবর্ষে শূন্য রিটার্নও দাখিল করেছি।

জরিমানার অঙ্ক দেখে শুধু নিজের কথা ভাবিনি। মনে হয়েছে, আমার মতো আরও কত মানুষ জরুরি প্রয়োজনে টিআইএন খুলেছেন, অথচ এর সঙ্গে যুক্ত দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না। তাদের সবারই কি এখন জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে? আমার প্রশ্ন সরল, ই-টিআইএন খুললেই কেন রিটার্ন দিতে হবে, আর এই বাধ্যবাধকতার কথা নাগরিককে স্পষ্টভাবে জানানো হলো না কেন?

প্রশ্নটি কর ফাঁকি দেওয়ার পক্ষে নয়। রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রয়োজন, কর ফাঁকি রোধ করা জরুরি এবং আইন অনুযায়ী যার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাকে তা দাখিল করতে হবে। কিন্তু নাগরিকের দায়িত্বের কথা বলার পাশাপাশি তাকে সেই দায়িত্ব সম্পর্কে যথাসময়ে সচেতন করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত। নিয়ম না বুঝে কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু নিয়মটি বোঝানোর ব্যবস্থাও কি যথেষ্ট কার্যকর ছিল, সেই প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়। অনেক মানুষ জরুরি প্রয়োজনে ই-টিআইএন খোলেন। কারও ব্যাংকঋণ প্রয়োজন, কারও জমি কেনাবেচা, আবার কারও নির্দিষ্ট কোনো সেবা গ্রহণের জন্য টিআইএন দরকার হয়। তাদের সবাই যে ব্যবসায়ী, উচ্চ আয়ের মানুষ কিংবা নিয়মিত করযোগ্য আয় করেন, তা নয়। কারও আয় সীমিত, কারও আয় অনিয়মিত, আবার কারও করযোগ্য আয় নাও থাকতে পারে। কিন্তু টিআইএন খোলার সময় কতজনকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয় যে এর সঙ্গে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যুক্ত হতে পারে? কতজন জানেন, করযোগ্য আয় না থাকলেও নির্দিষ্ট আইনি শর্তে রিটার্ন দিতে হতে পারে? আর রিটার্ন দাখিল না করলে কী ধরনের জরিমানা হতে পারে?

মানুষ সাধারণত টিআইএন খোলেন একটি তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে। সেই মুহূর্তে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকে কাজটি সম্পন্ন করা। অথচ এর সঙ্গে ভবিষ্যতে কী দায়িত্ব তৈরি হবে, কখন রিটার্ন দিতে হবে, শূন্য রিটার্ন কীভাবে দাখিল করতে হবে, এসব তথ্য আগে থেকেই সহজ ভাষায় জানানো হলে অনেক অনিচ্ছাকৃত ব্যর্থতা এড়ানো সম্ভব। নাগরিককে শুধু নিবন্ধনের আওতায় আনা নয়, নিবন্ধনের পর তার করণীয়ও বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি।

আইন কী বলছে, সেটিও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৬ ধারায় কোন কোন ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল করতে হবে, তা উল্লেখ রয়েছে। এর ১(ঙ) উপধারায় ২৬১ ধারার অধীন করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত ব্যক্তির রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, শুধু আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলেই সব ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত থাকা যায় না। ব্যক্তির নিবন্ধন ও অন্যান্য প্রযোজ্য আইনি শর্ত বিবেচনা করতে হয়। তাই ই-টিআইএন খোলার সঙ্গে রিটার্ন দাখিলের সম্পর্কটি সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি।

শুধু আইনের ধারা উল্লেখ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। একজন সাধারণ নাগরিক যেন বুঝতে পারেন, তার রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক কি না, আয় না থাকলে কী করতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দিতে না পারলে কী পরিণতি হতে পারে, সেই তথ্য সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন।

আমার ক্ষেত্রে ই-টিআইএন খোলার পর থেকে কোনো রিটার্ন দাখিল করা হয়নি। এটিকে নিজের দায়িত্বের ঘাটতি হিসেবে স্বীকার করতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু সেই স্বীকারোক্তির অর্থ এই নয় যে জরিমানার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও হারাব। দুই করবর্ষে পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা নির্ধারণের ভিত্তি কী, কোন বিধান প্রয়োগ করা হয়েছে এবং আমার ক্ষেত্রে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, তা জানার অধিকার আমার রয়েছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে পাঁচ হাজার টাকা সবার জন্য স্বয়ংক্রিয় জরিমানা নয়।

আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়নি, এমন ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা পাঁচ হাজার টাকা হতে পারে। আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে জরিমানার সীমা নির্ধারণের হিসাব ভিন্ন হতে পারে।

ফলে আমার নামে দুই করবর্ষে পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা এসেছে বলেই হিসাবটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আবার শুধু আপত্তি তুলেই একে ভুল বলা যায় না। জরিমানার আদেশ, আইনি ভিত্তি ও হিসাব যাচাই করেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

আমি জানতে চাই, আমার ক্ষেত্রে আগে কখনো আয় নিরূপণ হয়েছিল কি না, জরিমানা নির্ধারণের সময় কোন তথ্য বিবেচনা করা হয়েছে এবং কোন আইনি বিধানের ভিত্তিতে প্রতিটি করবর্ষে পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

হিসাব সঠিক হলে তার ব্যাখ্যা চাই, আর কোনো ভুল বা অসংগতি থাকলে সংশোধনের সুযোগ চাই। এটি বিশেষ সুবিধার দাবি নয়, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার দাবি। এখন আমি ২০২৬-২৭ করবর্ষে শূন্য রিটার্ন দাখিল করেছি। তবে শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে আগের করবর্ষগুলোর দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যাবে।

একইভাবে, আগের রিটার্ন দাখিল না করার বিষয়টি সামনে এলেই জরিমানার ভিত্তি যাচাই না করে তা মেনে নিতে হবে, এমনও নয়। দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ যেমন থাকা দরকার, তেমনি জরিমানার হিসাবও আইনের আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।

এখানে কর প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র যদি চায় নাগরিকেরা নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করুন, তাহলে নিয়মটি বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও কার্যকর হতে হবে। টিআইএন খোলার সময় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সহজ পদ্ধতি সম্পর্কে সহায়তা থাকলে মানুষ আরও সচেতনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। পাঁচ হাজার টাকা কারও কাছে সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু সীমিত আয়ের একজন মানুষের কাছে এই অর্থ পরিবারের বাজার, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা জরুরি চিকিৎসার খরচের বড় অংশ। তাই জরিমানার বিষয়টি শুধু হিসাবের অঙ্ক নয়, এর সঙ্গে মানুষের বাস্তব জীবনও জড়িয়ে আছে। আইন প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু সেই প্রয়োগের ভিত্তি ও প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ হতে হবে।

আমি করব্যবস্থার বিরোধিতা করছি না, কর ফাঁকির পক্ষেও নই। আমি চাই, নাগরিক যেন নিজের দায়িত্ব বুঝে তা পালন করতে পারেন। কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, কিন্তু জরিমানার ভিত্তি যেন পরিষ্কার থাকে এবং কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ যেন পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে জরুরি প্রয়োজনে ই-টিআইএন খুলেছিলাম। এরপর রিটার্ন দাখিল করিনি, এটি আমার ভুল। ২০২৬-২৭ করবর্ষে শূন্য রিটার্ন জমা দিয়ে বর্তমান করবর্ষে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় ফিরেছি। এখন আগের দুই করবর্ষের মোট ১০ হাজার টাকা জরিমানার মুখে দাঁড়িয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমার দাবি, আমার ক্ষেত্রে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক এবং জরিমানার হিসাবের ভিত্তি স্পষ্ট করা হোক।

ই-টিআইএন খোলা যদি নাগরিককে করব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার প্রথম ধাপ হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে কী কী দায়িত্ব জড়িয়ে আছে, তা বুঝিয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীল কর প্রশাসনের কাজ। নাগরিকের ভুল থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হোক, কিন্তু সেই ব্যবস্থার যৌক্তিকতা ও আইনি ভিত্তি জানার অধিকারও অক্ষুণ্ণ থাকুক। রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রয়োজন, নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে।

কিন্তু করব্যবস্থার প্রতি আস্থা শুধু জরিমানা আদায় করে তৈরি হয় না। আস্থা তৈরি হয় স্পষ্ট নিয়ম, সহজ প্রক্রিয়া, ন্যায্য আচরণ ও জবাবদিহির মাধ্যমে। নাগরিককে শুধু নিয়মের আওতায় আনলেই হবে না, নিয়মটি বুঝতে এবং মানতে সহায়তা করাও একটি দায়িত্বশীল করব্যবস্থার অংশ।

লেখক : কলামিস্ট