প্লাস্টিক দূষণ

মানবজাতির নীরব ঘাতক

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক বিশ্বের এক অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো- প্লাস্টিক দূষণ। উনিশ শতকের শেষ দিকে আবিষ্কৃত এবং গত শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এ 'অলৌকিক' উপাদানটি তার স্থায়িত্ব এবং সহজে পচন না হওয়ার গুণের কারণেই আজ বিশ্বের পরিবেশ এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে— খাদ্য প্যাকেজিং থেকে শুরু করে পরিবহন, নির্মাণ শিল্প, এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম— প্লাস্টিক অপরিহার্য হলেও, এর একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যগুলোর যথেচ্ছ ব্যবহার পরিবেশকে এক অসহনীয় ভারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ দূষণের মাত্রা এতটাই মারাত্মক যে, বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, বর্তমান হারে প্লাস্টিক দূষণ চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের সমুদ্রে মাছের চেয়ে প্লাস্টিকের পরিমাণই বেশি হবে। প্লাস্টিক দূষণ শুধু পরিবেশের দৃশ্যমান ক্ষতি নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের বিনাশ এবং জনস্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতির কারণ। এটিকে শুধু একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যা হিসেবে দেখার দিন শেষ, এটি এখন মানবসভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্ন।

পরিসংখ্যানের কষ্টিপাথর : আমাদের দেশে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে প্লাস্টিক দূষণের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশে প্রতিদিন উৎপন্ন প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই সঠিকভাবে প্রক্রিয়াকরণ করা হয় না। এর ফলস্বরূপ, এই বর্জ্যের একটি বিশাল অংশ— যার মধ্যে ঢাকার ক্ষেত্রে প্রায় ৩৬% খোলা জায়গায় এবং ২৩% সরাসরি নদী, খাল ও জলাশয়ে ফেলা হয়— প্রকৃতিতে মিশে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতি করছে। প্লাস্টিক এমন একটি রাসায়নিক যৌগ, যা প্রকৃতিতে সম্পূর্ণরূপে পচে যেতে কয়েকশ' বছর সময় নেয় (যেমন: একটি সাধারণ প্লাস্টিক ব্যাগ পচতে প্রায় ৪০০-৫০০ বছর সময় নিতে পারে)। এ অপচ্য পদার্থ যখন নদী বা সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়, তখন তা জলজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। অন্যদিকে, ভূমি ভরাটের ক্ষেত্রে এটি মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেয় এবং বিষাক্ত রাসায়নিক ভূগর্ভস্থ জলে মিশিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, সূর্যের আলো, বাতাস এবং ঢেউয়ের প্রভাবে বড় প্লাস্টিকের টুকরোগুলি ভেঙে গিয়ে অতি ক্ষুদ্র কণা, অর্থাৎ মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক-এ পরিণত হচ্ছে। এই ক্ষুদ্র কণাগুলি এতটাই বিপজ্জনক যে, সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, গর্ভফুল এবং মায়ের বুকের দুধেও এদের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। এর ফলে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হরমোনজনিত সমস্যা ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে, যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক সতর্কতা।

জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ুর ওপর প্লাস্টিকের আঘাত : প্লাস্টিক দূষণ জীববৈচিত্র্যের ওপর বহুমাত্রিক আঘাত হানছে। সামুদ্রিক কচ্ছপ, সিল, তিমি, এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্লাস্টিক বর্জ্যকে খাবার ভেবে ভুল করে গিলে ফেলছে, যা তাদের হজম প্রক্রিয়া বন্ধ করে মৃত্যু ঘটায়। ২০১৩ সালে দ্য সিটলস টাইমসে প্রকাশিত এক খবরে জানা গিয়েছিল, সিটল সমুদ্রসৈকতে মৃত এক তিমির পাকস্থলীতে বহু প্লাস্টিক পদার্থ পাওয়া গিয়েছিল, যা তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে গণ্য হয়। সামুদ্রিক প্রাণীদের খাদ্যচক্রের মাধ্যমে প্লাস্টিক কণা শেষ পর্যন্ত মানুষের প্লেটে এসে পৌঁছাচ্ছে। এছাড়া, প্লাস্টিক ব্যাগ ও অন্যান্য বর্জ্য যখন ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়, তখন সামান্য বৃষ্টিতেও শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এই জমা জলে মশা ও অন্যান্য রোগ-জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ঘটে, যার ফলস্বরূপ ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্লাস্টিক উৎপাদন প্রক্রিয়া নিজেই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের অন্যতম উৎস। তাই প্লাস্টিকের অত্যধিক উৎপাদন ও বর্জ্য পোড়ানো জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটকেও আরও তীব্র করে তুলছে।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর চরম প্রভাব: প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার হয় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যারা বস্তি বা নদীপাড়ে বসবাস করেন এবং যারা বর্জ্য সংগ্রহের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তারা সরাসরি এই দূষণের মুখে পড়েন। বর্জ্য সংগ্রাহকরা প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে নিয়মিতভাবে চর্মরোগ, ত্বকের সংক্রমণ এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভোগেন। GAIA ও UNEP-এর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্জ্য সংগ্রাহকদের মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি নিয়মিত ত্বকের সংক্রমণ বা চর্মরোগে ভোগেন। এ ছাড়া, দরিদ্র মানুষরা সাধারণত ছোট ছোট প্লাস্টিক প্যাকেটে বিক্রি হওয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস (যেমন : তেল, শ্যাম্পু, মশলা) বেশি ব্যবহার করেন, যা সামগ্রিকভাবে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে চলেছে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দূষিত পরিবেশে বসবাস তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

প্রতিরোধের পথে প্রতিবন্ধকতা ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা : প্লাস্টিক দূষণ রোধে বিভিন্ন দেশ পদক্ষেপ নিলেও, বৈশ্বিক পর্যায়ে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হচ্ছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের আন্তঃসরকারি আলোচনাকারী কমিটির একটি বৈঠক এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়। একদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্লাস্টিক উৎপাদন কমানোর পক্ষে থাকলেও, অন্যদিকে তেল উৎপাদনকারী কিছু দেশ শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকেই মনোনিবেশের কথা বলছে। এই মতপার্থক্য প্লাস্টিকের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন এবং দূষণ রোধের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। আমাদের দেশেও ২০০২ সালে পলিথিন নিষিদ্ধ করার আইন করা হলেও, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়নি। স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা, জনগণের সচেতনতার অভাব এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্পের উচ্চমূল্য এই সমস্যার গভীরতা বাড়িয়ে তুলছে। তবে আশার আলো এই যে, কেনিয়া ও রুয়ান্ডার মতো কিছু দেশ একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে সফল হয়েছে, যা আমাদের জন্য অনুকরণীয়।

প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য আবশ্যক পদক্ষেপ: এই সর্বনাশা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকার, শিল্পোদ্যোক্তা এবং সাধারণ জনগণ— সকলকেই একযোগে কাজ করতে হবে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়