ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ ও গণমাধ্যম
রুশাইদ আহমেদ
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তথ্যপ্রযুক্তির অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন বর্তমান সময়ের গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে নিয়ে এসেছে ভিন্ন উচ্চতায়। বিশেষ করে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বহুবিধ ইস্যুতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) জেনারেটেড কনটেন্ট প্রস্তুতের সংখ্যা এখন পৌঁছেছে উদ্বেগজনক মাত্রায়। এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা অন্য ব্যবহারকারীদের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিস্বার্থে ঘৃণাসূচক বক্তব্য ব্যবহারের প্রবণতাও অসচেতন জনগোষ্ঠীর মাঝে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে হরহামেশাই বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী মহল নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রয়াস পাচ্ছে সহজে। ফলে, সমাজে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব, বিশৃঙ্খলা আর সংঘাত। যা স্থিতিশীল, কল্যাণকর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে উঠছে।
ডিজিটাল ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান 'রিউমার স্ক্যানার'-এর বার্ষিক প্রতিবেদন মোতাবেক, বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমগুলোতে ২০২৫ সালে ৪ হাজার ১৯৫টি বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারিত হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ২৮১টি রাজনৈতিক ইস্যু সংক্রান্ত, আর এআই জেনারেটেড কনটেন্ট ছিল ৬০৬টি। বিপরীতে, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই দেশের ডিজিটাল ও প্রথাগত মিডিয়াগুলোতে মোট ৩ হাজার ২১০টি ভুল তথ্যের প্রচার শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮২২টি, টিকটকে ৬০০টি, ইনস্টাগ্রামে ৫৬২টি, ইউটিউবে ২৪৫টি, এক্সে (সাবেক টুইটার) ১২৪টি এবং থ্রেডসে ১০৬টি ভুল তথ্য প্রচারিত হয়েছে।
আর প্রথাগত গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রসারের সংখ্যা ১৪৬। এমনকি ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যমেও বাংলাদেশকে নিয়ে ১৭টি গুজব রটানোর ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে, 'স্ট্যাটিস্টা'-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছরের শেষ ৬ মাসে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের ২৫ লাখ ঘৃণাসূচক বক্তব্যযুক্ত কনটেন্ট মুছে ফেলার ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামাজিক মেরুকরণের মাত্রাকে কোন পর্যায়ে উন্নীত করছে কুতথ্য-অপতথ্য আর গুজবের অবাধ প্রসার।
এআই প্রযুক্তির 'ডিপফেইক' কারসাজি এক্ষেত্রে আরও জটিলতার সৃষ্টি করছে সম্প্রতি। এর মাধ্যমে সহজেই বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সেলিব্রিটিদের ভুয়া বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের ভিডিও তৈরি করে সমাজকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে দুষ্কৃতিকারী গোষ্ঠী। অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ফেলো দানিয়েল খান এক গবেষণায় দাবি করেছেন, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দেড় মাস আগে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ৮০০টি বানোয়াট রাজনৈতিক ভিডিও শনাক্ত করেছিল। যাদের অধিকাংশই সহজলভ্য জেনারেটিভ এআই টুল ব্যবহার করে তৈরি করা।
এ পরিপ্রেক্ষিত থেকে বর্তমান সময়ে এসেও দেশের নানা স্থানে রাজনৈতিক সংঘাত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টির ঝুঁকি কোনোক্রমেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে যখন ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পতিত স্বৈরাচার গোষ্ঠী সর্বদা দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারায় লিপ্ত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মূলধারার গণমাধ্যমগুলোরও এ পরিস্থিতি একটি প্রশ্নই আমাদের সামনে নিয়ে আসছে: অপতথ্য, গুজব আর ভুল তথ্যের অভিশাপ থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার উপায় কী? উপায়টা হলো গণমাধ্যম সাক্ষরতা।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের দাবি, গণমাধ্যম সাক্ষরতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নাগরিকরা সহজেই অপতথ্য, ভুল তথ্য আর গুজব শনাক্ত করতে সক্ষম হবেন। এতে করে তারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এমন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে সচেতন হয়ে উঠবেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এখনকার ডিজিটাল অ্যালগরিদমের এ যুগে ব্যবহারকারীদের সক্রিয়ভাবে জটিল চিন্তন দক্ষতার সাহায্যে বাছবিচার করে সঠিক ও সত্য তথ্য চিহ্নিত করা কিংবা শেয়ার করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করতে পারে।
ইউনেস্কোর মতে, গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা হলো— এমন একটি দক্ষতা বা প্রবণতা, যা গণমাধ্যম এবং অন্যান্য তথ্য প্রদানকারী মাধ্যমের প্রকাশিত তথ্যাবলি সঠিকভাবে যাচাই এবং গ্রহণে দর্শকশ্রোতাকে সহায়তা করে। মোদ্দাকথা, কোনো ব্যক্তি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন বিতর্কিত বা উসকানিমূলক ইস্যু নিয়ে কোনো কনটেন্ট দেখবেন, সঙ্গে সঙ্গেই সেটির বিষয়বস্তুকে বিশ্বাস করবেন না। বরং, ব্যবহারকারীকে নিজের সাধারণ বিচারবুদ্ধি খাটিয়ে প্রথমে অনুধাবন করতে হবে আদৌ যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে সেটি সত্যি হবার সম্ভাবনা কতটুকু। এরপর তাকে প্রচারিত কনটেন্টটির তথ্যাবলি বিভিন্ন আঙিক হতে যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি আসলেই ঘটেছে কি-না। এক্ষেত্রে, গুগল লেন্স, রিভার্স ইমেজ সার্চের মতো সহজলভ্য ডিজিটাল ফ্যাক্ট-চেকিং টুলসের সহায়তা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ছবি বা ভিডিওতে থাকা ব্যক্তি, পারিপার্শ্বিক বস্তুগুলো এবং সাউন্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশের জনসাধারণকে গণমাধ্যম সাক্ষরতা সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করার সবচেয়ে বড় সুবিধাটা হলো: যখনই কোনো অপতথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে, তখনই ব্যক্তিগত চেষ্টাতেই দর্শক বা ব্যবহারকারীরা নিজেরাই সেগুলোকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হবেন। এতে করে কোনো সংঘাত বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ পূর্বাভাস পাবেন এবং সতর্ক হয়ে উপর্যুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন। স্থানীয় প্রশাসন এবং কর্তৃপক্ষও এক্ষেত্রে এগিয়ে এসে সঠিক তথ্য জনসাধারণকে জানাবেন। এর মাধ্যমে বিবদমান পক্ষগুলোর মাঝে শান্তিপূর্ণ সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। এভাবেই কোনো বিতর্কিত বা উসকানিমূলক ইস্যুতে অসৎ সুযোগসন্ধানী নানা গোষ্ঠীর অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে গণমাধ্যম সাক্ষরতার মৌলিক জ্ঞানের সাহায্যে সংগ্রাম করা সম্ভবপর হবে।
কেননা, এ দক্ষতাটির সাহায্যে সাধারণ মানুষ সহজেই কোন সূত্র হতে সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলি প্রচার করা হচ্ছে তা চিহ্নিত করার সক্ষমতা অর্জন করবেন। ফলে, তারা পরখ করে নিতে পারবেন কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠী তাদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করছে এবং গোষ্ঠীটির আসল উদ্দেশ্য কী। একইসঙ্গে, এটি জনসাধারণকে নিজে থেকে সবকিছু বিশ্লেষণের সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন কাঠামোর অভ্যন্তরের অনিয়ম, অসঙ্গতি বা দুর্নীতির নানা ঘটনাকেও নির্লিপ্তভাবে দেখার সুযোগ করে দেবে। অর্থাৎ, গণমাধ্যম সাক্ষরতা সমাজে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পাশাপাশি, গণমানুষ গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্টগুলোর ব্যাপক ভিউয়ার্স বা ইন্টারেকশন সংখ্যার দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৎপর হওয়ার সুযোগ পাবে এর মধ্য দিয়ে। এসব দিক বিবেচনায় রেখে প্রথিতযশা গণমাধ্যমকর্মী, ফ্যাক্ট-চেকার এবং গবেষকদের গণমাধ্যম সাক্ষরতার প্রসার সাধনে অগ্রণী ভূমিকায় আবির্ভূত হতে হবে। দেশের আইনপ্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের কাছে গণমাধ্যম সাক্ষরতার গুরুত্ব কার্যকরভাবে তুলে ধরে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে ইউনেস্কোর গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা নীতিমালা কিংবা গাইডবুক হতে প্রয়োজনীয় ধারণা নেওয়া যেতে পারে। এমনকি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থায় গণমাধ্যম সাক্ষরতাকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি-না, সে বিষয়টির দিকেও সংশ্লিষ্টরা নজর দিতে পারেন।
এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অপতথ্য, কুতথ্য আর গুজব ছড়িয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারবে না দুষ্কৃতিকারীরা। এভাবেই সামাজিক মেরুকরণের প্রেতাত্মাকে এই জনপদ থেকে দূর করার সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যম সাক্ষরতা ন্যায়ভিত্তিক, কল্যাণকর এবং সুশাসননির্ভর একটি সমাজ বিনির্মাণে নিয়ামক হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
