প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ নভেম্বর, ২০২৬
বাংলাদেশের কৃষি আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা, কৃষিজমি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, খরা ও রোগবালাই— সব মিলিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) অবদান নিঃসন্দেহে দেশের কৃষির জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার করে বিনা কৃষিক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ২২টি ফসলের ১৩৯টি উচ্চফলনশীল ও উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ৯৬টি জাত সরাসরি মিউটেশন ব্রিডিং বা বিকিরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত। ধান, গম, ডাল, তেলবীজ, সবজি, মসলা ও আঁশজাতীয় ফসলে বিনার গবেষণা কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিকূল পরিবেশে কৃষির নতুন পথ তৈরি করেছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে যেখানে ৮ থেকে ১২ বছর সময় লাগতে পারে, সেখানে আধুনিক আয়ন বিম প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র চার বছরে স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল বিনাধান-১৪ উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চল ও বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাত কৃষকদের নতুন করে চাষাবাদের সুযোগ করে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় এ ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান জীবাণুসার উদ্ভাবন। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমাতে প্রতিষ্ঠানটি ১০টি জীবাণুসার উদ্ভাবন করেছে। এসব সার ব্যবহারে ডাল ও শিমজাতীয় ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ইউরিয়া সারের প্রয়োজন কমে। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশও উপকৃত হয়। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ৫৭টি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে লবণাক্ত জমিতে ফসল চাষ, পানি ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগবালাই দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
কৃষিতে বিনার গবেষণার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও বাংলাদেশের জন্য গৌরবের। স্বাধীনতা পদকসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি বহু পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছে। পারমাণবিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উচ্চফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে বিনা বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে— এ তথ্য দেশের কৃষি গবেষণার সক্ষমতারই পরিচায়ক।
তবে গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে তার মাঠপর্যায়ে বিস্তারের ওপর। তাই বিনার উদ্ভাবিত নতুন জাত ও প্রযুক্তিগুলো দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া, মানসম্পন্ন বীজের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। খাদ্যনিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে বিনার গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হোক— এটাই প্রত্যাশা।