অত্তদীপ বিহারথ

আলোকিত বাংলাদেশ

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আলোহীন পৃথিবী অকল্পনীয়। সূর্যের উদ্গম না হলে পৃথিবীর কী হতো তা ভাবার মতো কল্পনা মানুষের নেই। সৌরজগতে যেমন সূর্যের উদ্গমে আলোকিত হয় চরাচর, তেমনি মনোজগতেও লুকিয়ে আছে এক সূর্য। মনে যখন প্রজ্ঞার দীপ্তি প্রকট হয়, তখন মনোজগতের সূর্যও কনক-কিরণে আলোকিত করে তোলে মনঘর। মনের সূর্য সহজে উদিত হয় না। মনের সূর্য সবার মনঘরে আলো দেয় না। মনের সূর্যকে জাগিয়ে তুলতে প্রজ্ঞার চর্চা আবশ্যক। সেই প্রজ্ঞার অনুশীলন ঘটাতে একটা মাধ্যম চাই। তথাগত বুদ্ধ বলেছেন, 'অত্তদীপ বিহারথ।' অর্থাৎ নিজেই নিজের দ্বীপ হয়ে জ্বলো। নিজেকে নিজের দ্বীপ হয়ে জ্বলে উঠতে হলে ধ্যানী হতে হয়, একাগ্রতা তৈরি করতে হয়। ধ্যানী বলতে বনে-জঙ্গলে গিয়ে অনাগারিক হয়ে জীবনযাপন নয়। ধ্যানী বলতে মনের ব্যায়াম। মনের লাগাম মনকে না দিয়ে নিজের হাতে রাখা। মনের নিয়ন্ত্রণ যখনই নিজের হাতে আসে তখনই মানুষ আত্মআলোকনে আলোকিত হয়ে ওঠে। মনের দ্বীপের সলতে জ্বালাতে লাগে উদ্দীপক। 'দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ মনের সে উদ্দীপক।

ক্রমশ আঁধারে ছেয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের হৃদয়। যন্ত্রের যুগে মূল্যবোধের অবক্ষয় সে আঁধারকে ত্বরান্বিত করে তুলছে। আলো চাই আলো। সে আলো কে দেবে? 'দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ'-এর মতো উদ্দীপকগুলোর দায়িত্ব সে ক্ষেত্রে অপরিসীম। আলো আসবে বললেই হবে না, আলো আসার সুড়ঙ্গটুকু তৈরি করে নিতে হবে। চকমকি ঠোকা স্ফুলিঙ্গে আলো পেয়েছিল আদিম মানুষ। যন্ত্রযুগের মানুষকে আলো পেতে হলে উদার হতে হবে। মৈত্রীবিহীন আলোর উদ্গম সম্ভব নয়। সংকীর্ণ মনে আলো আসে না। মনুষ্যত্বের সঙ্গে যাপিত জীবনের মহামৈত্রী আবশ্যক। তাহলেই আলোর সুড়ঙ্গ তৈরি হবে। একদেশদর্শী জীবন আলোর হন্তারক। তাই জীবনকে বহুজনের সুখে বহুজনের হিতের জন্যে উন্মীলিত করতে হবে। 'আমি আর্য আমি শ্রেষ্ঠ' এ বাণী আলোক বিনাশী। আলো হলো সমন্বয়ের এক চমৎকার উদাহরণ। সাতটি বর্ণালীর সমন্বয়ে আলো আসে সূর্য হতে। বেনীআসহকলা মৈত্রী মেখে এক হয় বলেই সাদা আলোয় হাসে পৃথিবী। আলো আসে ঐক্য হতে। এ ঐক্য লক্ষ্যের সখ্যের। মনের মধ্যে খাদ থাকলে আলো আসে না। আলোক পিয়াসী মন হয় নিখাদ। মৈত্রীহীন মন অমাবস্যার আতুড়ঘর। হিংসা আর বিদ্বেষ তাতে তৈরি করে রাখে অনন্ত কৃষ্ণবিবর। তাই আলোর উদ্গম সে মনে অসম্ভব।

আলোর জন্য চাই প্রজ্ঞার ভেদনবিদ্যা। অর্থাৎ মনের আঁধার যতই প্রগাঢ় হোক না কেন, প্রজ্ঞার আলোক তা ভেদ করতে পারে সহজেই। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, 'চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে...'। আত্মগরিমা লাভের জন্য আলো নয়। আলো চাই বিভেদের আঁধার বিনাশের জন্যে। আমরা বলি বটে, 'আলোকিত মানুষ চাই।' কিন্তু আলোর সুড়ঙ্গ পশ্চাৎপদতায় ঢেকে দিয়ে আলোর জন্যে আহাজারি আত্মহননের শামিল। আত্মবাদের জলাঞ্জলি না হলে মনে আলো কখনোই আসবে না। 'আমি' বা 'আমাদের' এই আমিত্ববাদকে উপড়ে না ফেললে মনে আলোর চাষ হয় না। একগ্রন্থ পাঠে যেমন জ্ঞানের স্ফূরণ ঘটে না, তেমনি সংকীর্ণ মনেও প্রজ্ঞার অবভাসন হয় না। রবীন্দ্রনাথ 'আলো আমার আলো ওগো' বলে নয়নধোয়া আলোর কথা বলেছেন। এ আলোয় চর্মচোখের অবগাহন হয় না, এ আলোয় অন্তর্চক্ষুর জ্ঞানোন্মোচন হয়। জ্ঞানের আলোয় তখন পুরো পৃথিবী মনশ্চক্ষুষ্মাণের কাছে ফকফকা হয়ে ওঠে। হাজার তারার দীপালি জ্বালিয়ে যে আলোর ঝর্ণা বয় তা ক্ষণস্থায়ী। মনের প্রজ্ঞায় যে আলোর নহর ছোটে তা হলো প্রকৃত আলো। এ আলোয় যে স্নান করে সে হয়ে ওঠে সকল 'তমসকলুষহর'।

বাইবেলে বর্ণিত 'লেট দেওয়ার বি লাইট' বস্তুত কোনো পার্থিব আলোর জন্য আকুলতা নয়। এ আকুলতা হলো মনের সংকীর্ণতা দূর করার আকুলতা। দৃষ্টিহীনেরও মনের আলো আছে। তাই সে পথ না দেখেও পথ হারায় না আপন গন্তব্যে। উতথ্য-তনয় 'দীর্ঘতমা' মাতৃজঠর হতেই বৃহস্পতির শাপে দৃষ্টিহীন ছিল। কিন্তু মনের আলোকনে সে আলোকিত ছিল বলেই গর্ভ হতে মায়ের বেদনাকে প্রশমিত করতে পেরেছিল। অর্থাৎ কাঙ্ক্ষিত আলো শুধু দৃষ্টিশক্তির আলো নয়, এ আলো মনের নির্মলতাকে প্রস্ফুটিত করে। যারা আলোর পথযাত্রী তারা দ্বীন নয়, হীন নয়, তারা মনুষ্যত্বের মুক্তির দিশারী। মন যার রৌরবের কুম্ভ জীবন তার কৌরবের ছলাশ্রম। ওপরে যতই চাকচিক্য থাক নিরালোক মন কোনো না কোনোদিন স্বরূপের উন্মোচন করবেই।

আলোয় উদ্ভাসিত রবীন্দ্রনাথ যে আলোয় ঘর-ছাড়াকে (রবির আলো সাড়া দিল আকাশ-পারে। শুনিয়ে দিল অভয়বাণী ঘর-ছাড়ারে।)

অভয়বাণী শোনালেন সে আলোর গর্ভক্ষেত্র মন। মনের আলোর অমল প্রভাতেই শক্তির উদ্বোধন হয়। 'দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ' স্বদেশকে আলোকনের যে দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে, তাতে তা অত্যন্ত দুর্বহ। কারণ দেশ আজ আগুনের আলোয় দহনক্লান্ত। এ আগুন বিদ্বেষের, এ আগুন বিভেদের। এ আগুন আত্মআর্যত্বের। ঘরপোড়া আগুনে আপাত আলো হলেও পরিণামে আনে কয়লা, আনে ভস্ম। এ আলোয় কল্যাণ নেই, এ আলোয় জনস্বার্থ নেই। মনের আলোকে জ্বালাতে হলে 'আলোকিত বাংলাদেশ'কে যেতে হবে অনেকটা পথ। খবরের পণ্য পাতে দিলে জাতি আলোকিত হবে না, দেশের আঁধার দূর হবে না। কারণ নজরুল তো 'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার'-এ বলেই দিয়েছেন, 'এ আঁধার ভারী, দিতে হবে পাড়ি।' প্রগাঢ় সাম্প্রদায়িকতার আঁধারে দেশ আজ নিমজ্জমান। তাই মনের আঁধার-খাদকে প্রজ্ঞার আলোয় তাড়াতে হবে। তবেই প্রকৃত আলো আসবে, আলো। বাংলাদেশকে আলোকিত করতে আজ কী চাই? নক্ষত্রের তারাভরা রাত আমরা চাই না। আমরা চাই জীবনের উজ্জীবন। আমরা চাই পারস্পরিক সহাবস্থান। সংখ্যালঘু প্রতিবেশিকে প্রাণে মেরে হ্যাজাকবাতির চোখ ধাঁধানো আলোর উৎসব আমরা চাই না। আমরা চাই হৃদয়ে হৃদয়ে মেলবন্ধন। আলো তাতেই দীপ্তিমান হয়ে উঠবে। আলোকিত বাংলাদেশ পেতে হলে সংস্কৃতির প্লাবন চাই। সংস্কৃতির এ প্লাবনে দূর হবে কূপমণ্ডূকতা। লাল-সবুজে আনতে হবে আলোর দীপ্তি। পেছনে ফিরে যাওয়া নয়, সামনে এগিয়ে যাওয়ার গান শোনাতে হবে। দেশ মানে ভোগের নয়, দেশ মানে তাণ্ডবের নয়। দেশ হলো দরদের। আলোকিত বাংলাদেশ গড়তে হলে দেশের প্রতি দরদকে জাগিয়ে তুলতে হবে। মনের মোমদানিতে জ্বালিয়ে তুলতে হবে শিখা অনির্বাণ। মানবিক সাহিত্যের নিরন্তর পাঠ ও পাঠচক্রে আগামীর বাংলাদেশকে ব্যস্ত রাখতে হবে। আত্মার জাগরণে সংস্কৃতিকে হাতিয়ার নয়, উপশমের ঔষধে পরিণত করতে হবে। শুধু বিজ্ঞাপন নির্ভর সংবাদ-পণ্য দিয়ে দেশ আলোকিত করা যাবে না। দেশকে আলোকিত করতে হলে নিবেদনধর্মী কর্মযজ্ঞে শামিল হতে হবে। 'দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ' যেদিন নিজেই নিজের দ্বীপ হয়ে জ্বলে উঠবে, সেদিন অনায়াসে বাংলাদেশকে আলোকিত করে তুলতে পারবে।

নির্বাণমার্গের আগারিক কবি জীবনানন্দ যে কথা বলে গেছেন তা আজও এ দেশের প্রেক্ষাপটে সমকালীন। 'সাতটি তারার তিমির' কাব্যগ্রন্থে জীবনানন্দ সাধে বলেননি, 'অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা।'

পৃথিবীর এ আঁধারকে, স্বদেশের এ আঁধারকে দূর করতে হলে চাই আত্মনির্মাণের আলো। এ আলো আসতে পারে সাংস্কৃতিক রেনেসাঁসের সুড়ঙ্গ পথে, কর্পোরেট মিডিয়া জগতের চোখ ধাঁধানো নিয়ন আলোয় নয়। যে পত্রিকা আলো আনার মহান ব্রতে পথ চলতে শুরু করেছে, যে প্রতিষ্ঠান আঁধার তাড়িয়ে স্বদেশকে আলোকিত করার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে সে প্রতিষ্ঠানের থমকে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানোর প্রমাদ যেন তাকে গ্রাস না করে। এ শুধু সংবাদ-পণ্য বিপণনের কোনো মাধ্যম যাতে না হয়। 'দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ' সর্বার্থে হয়ে উঠুক ফাগুন আলোর মলয় নাচন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পত্রিকাটির প্রতি হৃদয়ভারানত ভালোবাসায় বলতে চাই— 'ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি এখানে থেমো না।' (সলিল চৌধুরী)।

 

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, চিকিৎসক