অন্যের সঙ্গে তুলনা
জান্নাতুন নার্গিস চৈতী
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কখনও কি এমন হয়েছে— কাউকে কোনো কিছু করতে দেখে হঠাৎ মনে হয়েছে, আমাকেও এমন হতে হবে? তুলনা আর অনুপ্রেরণার মধ্যে পার্থক্য আছে। অন্যের কোনো গুণ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের ভেতরেও সেই দক্ষতা তৈরি করার ইচ্ছা জাগতে পারে। কিন্তু তুলনা তখনই সমস্যার হয়ে ওঠে, যখন অন্যের স্বাভাবিকতাকে আমরা নিজের ছাঁচের মাপকাঠি বানিয়ে ফেলি। আর যখন সেই ছাঁচে ঠিকমতো বসতে পারি না, তখন মনে হয় সমস্যাটা বুঝি নিজের মধ্যেই। অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে করতে মানুষ তখন নিজের কাহিনীটাই বানাতে ভুলে যায়। মানুষের মধ্যে এ তুলনা করার প্রবণতা তৈরি হয় কেন?
ছোটবেলা থেকেই আমরা নিজেদের সম্পর্কে নানা ধরনের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে বড় হই। পরীক্ষার ফলাফলে কে কত নম্বর পেল, কে কার চেয়ে এগিয়ে থাকল, কে আগে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাল— এসবের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান বুঝতে শিখি। একসময় অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করাটাই যেন আত্মমূল্যায়নের স্বাভাবিক পদ্ধতি হয়ে ওঠে। নিজের কাজ কেমন হয়েছে, তা বোঝার জন্যও তখন অন্য কারও কাজের দিকে তাকাতে হয়। অন্য কেউ ভালো করলে নিজের ভালো করার সম্ভাবনাটুকুও অনেক সময় চোখে পড়ে না। তখন মনে হয়, তার সাফল্য বুঝি নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ।
তুলনার আরেকটি সূক্ষ্ম দিক হলো, এর মধ্য দিয়ে আমরা কখনও কখনও নিজের আকাঙ্ক্ষাকেও অন্যের আকাঙ্ক্ষা দিয়ে প্রতিস্থাপন করি। কাউকে একটি নির্দিষ্ট পেশায় সফল হতে দেখে আমাদেরও সেই পেশায় যাওয়ার ইচ্ছা হতে পারে। কাউকে মানুষের প্রশংসা পেতে দেখে মনে হতে পারে, আমাদেরও তেমন স্বীকৃতি অর্জন করতে হবে। কিন্তু সেই কাজের প্রতি আমাদের সত্যিকারের আগ্রহ আছে কি না, সেই জীবনযাপন আমাদের মানসিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা ভেবে দেখার অবকাশ থাকে না। অন্যের অর্জন তখন আমাদের কাছে নিজের আকাঙ্ক্ষা যাচাই করার চেয়ে নতুন একটি মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
এভাবে চলতে চলতে মানুষ একসময় অনেক কিছু অর্জন করেও নিজের ভেতরে অপূর্ণতা অনুভব করতে পারে। কারণ, সে হয়তো এমন একটি লক্ষ্যের দিকে এগিয়েছে, যেটিকে নিজের বলে বিশ্বাস করলেও তার জন্ম হয়েছিল অন্যের সঙ্গে তুলনা থেকে। তখন সাফল্য অর্জনের পরও মনে প্রশ্ন জাগে, আরও কিছু অর্জন করতে হবে কি না, আরও কারও মতো হয়ে উঠতে হবে কি না। তুলনার এ দৌড়ে গন্তব্য বারবার বদলে যায়, অথচ নিজের কাছে ফিরে এসে বোঝার চেষ্টা করা হয় না— কোন পথে গেলে সত্যিই নিজের সঙ্গে থাকা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত, মানুষ কি সত্যিই অন্য কারও মতো হয়ে নিজের পূর্ণতা খুঁজে পেতে পারে?
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, ক্ষমতা, বিশ্বাস ও অনুভব রয়েছে। অথচ অন্যের মতো হতে না পারাকে নিজের অপূর্ণতা বলে মনে করি। মানুষের বিকাশ তখনই পূর্ণতা পেতে পারে যখন নিজের ভেতরে থাকা সম্ভাবনাকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা যায় এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করা যায়, আমি আমার নিজের সম্ভাবনার কতটা হয়ে উঠতে পেরেছি?
মানুষের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই ভিন্ন নিয়ম প্রয়োগ করি। যে মানুষটি সহজে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে, তার সঙ্গে তুলনা করে নিভৃতচারী মানুষটিকে সামাজিক হতে না পারার জন্য ছোট করে দেখি। যে মানুষটি দ্রুত নিজের প্রতিভা প্রকাশ করতে পারে, তার পাশে দাঁড়িয়ে ধীরগতিতে নিজেকে গড়ে তোলা মানুষটি নিজের সামর্থ্য নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ে। আমাদের দৃষ্টিতে তখন একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যই যেন যোগ্যতার একমাত্র প্রমাণ হয়ে ওঠে। অথচ মানুষের সামর্থ্য প্রকাশের ধরন এক নয়। কেউ দ্রুত নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে পারে, কেউ দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ করে তারপর কথা বলে। কেউ পরিচিত পরিসরে স্বচ্ছন্দ, কেউ নির্জনতায় নিজের চিন্তাকে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। এ পার্থক্যগুলোর কোনোটিই নিজে থেকে শ্রেষ্ঠত্ব বা হীনতার প্রমাণ নয়।
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো একটি বৈশিষ্ট্যকে সবার জন্য আদর্শ ধরে নিয়ে বাকি সব বৈশিষ্ট্যকে তার বিচারে মূল্যায়ন করা হয়। এতে মানুষ শুধু অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনাই করে না, নিজের ভেতরের এমন অনেক সম্ভাবনাকেও অবহেলা করতে শেখে, যেগুলো প্রচলিত মাপকাঠিতে সহজে দৃশ্যমান নয়। নিজের স্বভাবকে বুঝে বিকশিত করার বদলে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের মধ্যে অন্যের বৈশিষ্ট্য তৈরি করতে। অথচ কোনো বৈশিষ্ট্য অর্জন করা আর নিজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করা এক বিষয় নয়।
অন্যের কাছ থেকে শেখার সময় আমাদের উদ্দেশ্য থাকে নিজেকে বিকাশের দিকে। আমরা বুঝতে চাই, কোন দক্ষতাটি অর্জন করা প্রয়োজন, কোন অভ্যাসটি পরিবর্তন করলে আরও ভালোভাবে কাজ করা সম্ভব। কিন্তু তুলনার মধ্যে যখন নিজের মূল্য নির্ধারণের প্রবণতা কাজ করে, তখন মনোযোগ সরে যায় নিজের বিকাশ থেকে অন্যের অবস্থানের দিকে। তখন অন্যের অর্জন আমাদের শেখার সুযোগ তৈরি করার বদলে নিজের ঘাটতিগুলোকে বড় করে দেখায়। আবার একই উপলব্ধিকে নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি। ঘটনা একই, কিন্তু তার মধ্য দিয়ে নিজের সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি করছি, তা এক নয়।
অথচ অন্যের সাফল্য আমাদের ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। দুজন মানুষের একই সময়ে একই জায়গায় পৌঁছাতে না পারার অর্থ এই নয় যে একজন এগিয়ে যাওয়ার যোগ্য, অন্যজন নয়। প্রত্যেক মানুষের আগ্রহ, সামর্থ্য, অভিজ্ঞতা, সুযোগ এবং জীবনের পরিস্থিতি এক নয়। এমনকি একই ধরনের সুযোগ পেয়েও দুজন মানুষ তা থেকে ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। তাই একই মাপকাঠিতে প্রত্যেকের জীবনকে বিচার করতে গেলে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিকই অদৃশ্য থেকে যায়।
নিজের সঙ্গে নিজের তুলনা এখানে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে। আগে যে কাজটি করতে পারতাম না, এখন কি তা কিছুটা ভালোভাবে করতে পারছি? যে ভুলটি বারবার করতাম, সেটি কি বুঝতে শিখেছি? নিজের কোনো সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা কারণগুলো কি আগের চেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছি? এসব প্রশ্ন আমাদের বিকাশের দিকে মনোযোগ ফেরায়। এতে অন্যের অগ্রগতি অস্বীকার করতে হয় না, আবার নিজের পথকেও অন্যের পথের অনুকরণে বদলে ফেলতে হয় না। কারণ, উন্নতির অর্থ সব সময় অন্য কারও সমান হয়ে ওঠা নয়; কখনও কখনও এর অর্থ হলো নিজের সম্ভাবনাকে আগের চেয়ে গভীরভাবে চিনতে শেখা।
নিজেকে চেনার জন্য তাই অন্যের দিকে তাকানো নিষিদ্ধ নয়; বরং অন্যের দিকে তাকানোর পর নিজের কাছে ফিরে আসতে শেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের মধ্যে যে গুণটি ভালো লাগে, তা থেকে শেখার আছে কি না, নিজের জীবনে তার প্রয়োজন কতটা, কিংবা নিজের স্বভাব ও বিশ্বাসের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য কোথায়— এসব প্রশ্নের উত্তর নিজের কাছেই খুঁজতে হয়। কারণ, অন্যের জীবন আমাদের সামনে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কোন পথে এগোব, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের।
তবে নিজের স্বাতন্ত্র্যকে গ্রহণ করার অর্থ এই নয় যে নিজের সীমাবদ্ধতাগুলোকে উপেক্ষা করতে হবে কিংবা পরিবর্তনের সব সম্ভাবনা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে হবে। মানুষ প্রতিনিয়ত শিখবে, নিজের ভুল বুঝতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুসারে নিজেকে পরিবর্তন করবে— এটাই স্বাভাবিক। অন্যের কোনো গুণ দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া কিংবা নিজের কোনো দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য কারও কাছ থেকে শেখার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। বরং অন্যের অভিজ্ঞতা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করতে পারে। প্রশ্ন হলো, এই শেখার প্রক্রিয়ায় আমরা নিজেদের কোথায় রাখছি।
প্রকৃতি আমাদের সামনে প্রতিনিয়ত তার নিজস্বতার নিদর্শন রেখে যায়। নদী, পাহাড়, সমুদ্র, বন— প্রত্যেকের নিজস্ব রূপ ও স্বাতন্ত্র্য আছে যা হারিয়ে একে অন্যের মতো হয়ে যায়নি। পাহাড়ের সৌন্দর্য এক রকম, সমুদ্রের আরেক রকম। নদীর প্রবহমানতা যেমন আমাদের আকৃষ্ট করে, তেমনি বনের নীরবতাও আমাদের অনুভবকে স্পর্শ করে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়েই আমরা চিনতে শিখি। একটির সৌন্দর্য অন্যটির অনুপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। বরং প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়েই পাশাপাশি অবস্থান করছে। তাহলে মানুষকেই বা কেন অন্য কারও মতো হয়ে নিজের পূর্ণতা খুঁজতে হবে? অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যের সাফল্য তখন নিজের অবস্থান হারানোর আশঙ্কা তৈরি করে না; বরং তার অর্জনকে তার জীবনের একটি স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখতে শেখা যায়। প্রত্যেক মানুষকে একই প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে না দেখে, ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে ওঠা একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। এতে অন্যের অর্জনের স্বীকৃতি দিতে গিয়ে নিজের অর্জনকে অস্বীকার করতে হয় না, আবার নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য অন্যের স্বাতন্ত্র্যকেও ছোট করে দেখতে হয় না। আমরা প্রত্যেকে যদি অন্যের মতো হয়ে ওঠার তাড়নার বদলে নিজের সম্ভাবনাকে চিনতে এবং বিকশিত করতে মনোযোগ দিই, তাহলে হয়তো ভিন্নতাকে আর অসম্পূর্ণতা বলে মনে হবে না। তখন অন্যের জীবনকে নিজের জীবনের মাপকাঠি না বানিয়েও তার সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যাবে। নিজের পথকে মূল্য দিতে গিয়ে অন্যের পথকে অস্বীকার করতে হবে না। আর নিজেকে বোঝার জন্য বারবার অন্য কারও প্রতিচ্ছবি খুঁজতে গিয়ে নিজের কাছ থেকেই দূরে সরে যেতে হবে না। তাই তুলনা যদি করতেই হয়, তবে অন্যের সঙ্গে নিজের নয়, বরং গতকালের নিজের সঙ্গে আজকের নিজের তুলনা করাই শ্রেয়।
লেখক : শিক্ষার্থী, ফারসি
ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
