প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬
বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতি ও জাতীয় অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। 'সবুজ স্বর্ণ' হিসেবে খ্যাত এই শিল্পের পেছনে নিরলসভাবে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন লক্ষাধিক চা শ্রমিক। দেশের প্রায় ১৬৮ টিরও বেশি নিবন্ধিত চা বাগানে, বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পঞ্চগড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, এই শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই প্রতি বছর চা উৎপাদন রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। অথচ, সময় এগিয়ে চললেও এবং চা শিল্পের উন্নতি হলেও, এই শিল্পের মূল কারিগর— চা শ্রমিকদের জীবনমান আজও যেন ঔপনিবেশিক আমলের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। 'সবই বদলায়, বদলায় না চা শ্রমিকদের জীবন'— এই কথাটি তাদের শতবর্ষের বঞ্চনা ও সংগ্রামের এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
চা শ্রমিকদের এই পিছিয়ে থাকার শেকড় গাঁথা আছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাসে। প্রায় দেড়শ বছর আগে ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে 'আরকাট্টি' নামক নিয়োগ এজেন্টদের মিথ্যা প্রলোভনে (যেমন: 'গাছ নাড়লেই টাকা পড়ে' বা 'মাটি খুঁড়লেই সোনা মেলে') হাজার হাজার নিচু বর্ণের হিন্দু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে চা বাগানে কাজের জন্য নিয়ে আসা হয়। সেই সময় থেকেই শুরু হয় এক গভীর শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস। দাসত্বের মতো জীবন, বন্য টিলা পরিষ্কারের অমানবিক পরিশ্রম এবং বাগান মালিকদের নিদারুণ নির্যাতনই ছিল তাদের ভাগ্যলিপি। ১৯২১ সালের ঐতিহাসিক 'মুল্লুকে চলো' আন্দোলনে হাজার হাজার শ্রমিক সেই শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটে শত শত শ্রমিকের রক্ত ঝরেছিল। এই রক্তস্নাত ইতিহাসই তাদের ফিরতে দেয়নি, আর তাদের নিয়তি চিরতরে বেঁধে গেছে চায়ের শেকড়ের সঙ্গে।
চা শ্রমিকদের জীবনের সবচেয়ে বড় বঞ্চনার জায়গাটি হলো তাদের দৈনিক মজুরি। বর্তমানে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি সামান্য বৃদ্ধি পেলেও, তা দেশের বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। একজন পূর্ণবয়স্ক শ্রমিকের দৈনিক মজুরি দিয়ে দু'কেজি চাল কেনার সামর্থ্যও হয় না। এই সামান্য মজুরি বৃদ্ধির জন্যেও তাদের বারবার আন্দোলন করতে হয় এবং দীর্ঘ ধর্মঘট পালন করতে হয়। একজন শ্রমিককে দিনের পর দিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, জোঁক, মশা ও পোকামাকড়ের কামড় উপেক্ষা করে দিনে গড়ে ১৮ থেকে ২৪ কেজি চা পাতা তোলার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হয়। এই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে মজুরি কাটা যায়, আবার লক্ষ্য অতিক্রম করতে পারলেও প্রতি কেজি পাতার জন্য সামান্য কয়েক টাকা বাড়তি দেওয়া হয়। এই স্বল্প মজুরির কারণে চা শ্রমিকদের একটি বিশাল অংশ (বিভিন্ন জরিপ অনুসারে প্রায় ৭৪ শতাংশ) এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যেখানে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার অনেক কম। এই মজুরির টাকা দিয়ে খাদ্য, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানো তাদের জন্য এক অসম্ভব সংগ্রাম।
আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবার দুরবস্থা চা শ্রমিকদের জীবনের আরেকটি মর্মান্তিক দিক। শ্রমিকরা যে বাসস্থানগুলোতে বাস করেন, তা 'লেবার লাইন' নামে পরিচিত এবং সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও নিম্নমানের। ২২২ বর্গফুটের ছোট ছোট খুপরি ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয় পুরো পরিবারকে। সুপেয় পানি এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থারও চরম অভাব রয়েছে অনেক বাগানে, যার ফলস্বরূপ পানিবাহিত রোগ ও ডায়রিয়া তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। বাগানের হাসপাতাল বা ডিসপেনসারিগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক বা মানসম্মত চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব থাকায় গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। কর্মক্ষেত্রে বিপজ্জনক রাসায়নিক বা কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ক্যান্সার ও অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্তের সংখ্যাও চা জনগোষ্ঠীতে বেশি। তাছাড়া, চা শ্রমিকদের প্রায় ৬৪ শতাংশই নারী শ্রমিক, যারা অপুষ্টিতে ভোগেন এবং পর্যাপ্ত স্যানিটেশন, নিরাপদ মাতৃত্বের সুযোগ-সুবিধা ও নারীদের জন্য উপযুক্ত শ্রম পরিবেশ থেকে বঞ্চিত।
এই বঞ্চনা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে মূলত শিক্ষার অভাব এবং ভূমির মালিকানা না থাকার কারণে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় চা বাগান এলাকায় শিক্ষার হার অনেক কম। স্কুলের ফি, বইপত্র ও খাতা কেনার টাকা জোগাড় করতে না পেরে অনেক শিশুই প্রাথমিক স্তর পেরোনোর আগেই ঝরে পড়ে। উচ্চশিক্ষা তো তাদের জন্য প্রায় আকাশকুসুম কল্পনা। তাই অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে অল্প বয়সেই সন্তানদের চা বাগানের কাজে লাগিয়ে দেন, যাতে পরিবারে বাড়তি কিছু আয় আসে। ফলে চা বাগানের শিশুরা বাগান-চক্রের বাইরে অন্য কোনো স্বপ্নের সন্ধান পায় না, আর তাদের জীবনও চা গাছের মতোই যেন ছেঁটে দেওয়া হয়।
তাছাড়া, প্রায় দেড়শ বছর ধরে বাগানে বসবাস করলেও চা শ্রমিকদের নিজস্ব বসতভিটার কোনো মালিকানা নেই। তারা নিজ ভূমে পরবাসীর মতো জীবনযাপন করেন। বাগান কর্তৃপক্ষ যখন খুশি তাদের উচ্ছেদ করতে পারে, যা তাদের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে। এমনকি তাদের আবাদি জমি দখল করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করতে হয়েছে। সরকারি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় বেশিরভাগ চা জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত না করায় তারা শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা থেকেও বঞ্চিত।
তবে এই অন্ধকারে সামান্য কিছু আশার আলোও রয়েছে। সরকার চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কিছু সহায়তা প্রদান করছে। কিছু সরকারি উদ্যোগে বাগানে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই সামান্য সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
আসলে চা শ্রমিকদের জীবনমানের সামগ্রিক পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্র, বাগান মালিক এবং সমাজের সম্মিলিত, মানবিক ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। প্রথমত, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের দৈনিক মজুরিকে অবশ্যই একটি ন্যায্য ও মানবিক স্তরে উন্নীত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শ্রম আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের বসতভিটার ওপর 'ভূমি অধিকার' নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বাগান এলাকায় মানসম্মত শিক্ষা, সুপেয় পানীয় জলের সরবরাহ, আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
চা শিল্প দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত। এই শিল্পের সমৃদ্ধি নির্ভর করে এর শ্রমিকদের ওপর। চা শ্রমিকরা আধুনিক সভ্যতার জীবন্ত ক্রীতদাস নন; তারা আমাদের অর্থনীতির সম্মুখ সারির যোদ্ধা। তাদের শ্রমের যথাযথ মর্যাদা এবং মানবিক অধিকার নিশ্চিত না হলে 'সবুজ স্বর্ণের' এই শিল্প এক দিন তার ঔজ্জ্বল্য হারাবে। তাই, সময় এসেছে তাদের প্রতি আমাদের দীর্ঘদিনের ঋণ স্বীকার করার এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে 'সবই বদলায়, বদলায় না চা শ্রমিকদের জীবন'—এই করুণ বাস্তবতা চিরতরে বদলে দেওয়ার।
শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা