অদম্য ইচ্ছাশক্তির নাম কলি, পাশে দাঁড়াক সমাজ
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষের জীবনে স্বপ্ন থাকে, থাকে সেই স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সবার পথ এক রকম হয় না। কারও সামনে থাকে আর্থিক সংকট, কারও থাকে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, আবার কারও লড়াই করতে হয় শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে। তবে প্রবল ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রতিকূলতা জয় করাও যে সম্ভব, তার অনন্য দৃষ্টান্ত রংপুরের কলি রানী। দুই হাতে আঙুল না থাকলেও পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৫ অর্জন করেছেন তিনি। এখন তার স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা শেষে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করা।
কলি রানীর এ সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনও মানুষের মেধা, যোগ্যতা কিংবা স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে না। প্রয়োজন সুযোগ, সহযোগিতা ও অনুকূল পরিবেশ। কলি নিজের অদম্য মনোবল দিয়ে সেই সত্যই সামনে এনেছেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও এসএসসি পরীক্ষায়ও পা দিয়ে লিখে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এবার এইচএসসিতেও সাফল্য অর্জন করেছেন। এমন ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং পরিবারের সহযোগিতা।
কলির জীবনের পথ অবশ্য সহজ ছিল না। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন। জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি পারিবারিক প্রতিকূলতাও মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। মা রূপালী রানীর সাহস, স্নেহ ও অনুপ্রেরণা তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। সহপাঠী ও শিক্ষকদের সহযোগিতাও তার এগিয়ে চলার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমনকি পরীক্ষার সময় আলাদা কক্ষে বসার সুযোগ থাকলেও কলি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে সেই ব্যবস্থাও করা হয়েছে। বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় পাওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়ার এ ঘটনা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তাদের নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সহায়ক প্রযুক্তি, সহজ যাতায়াত এবং উপযুক্ত শিক্ষা উপকরণের অভাব অনেকের পড়াশোনার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। আবার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও অনেককে অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। অথচ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা মানেই কারও সক্ষমতা কম—এমন ধারণা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। প্রত্যেক মানুষের মেধা ও যোগ্যতা বিকাশের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই একটি মানবিক সমাজের দায়িত্ব।
কলি রানী উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান। তার এ স্বপ্ন পূরণে পরিবার ও সমাজের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও প্রয়োজন। আর্থিক সংকট যেন তাঁর শিক্ষাজীবনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য বৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, যাতায়াত ও পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলাও জরুরি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তার পাশে দাঁড়াতে পারেন। তবে সহায়তা যেন শুধু সাময়িক অনুদানে সীমাবদ্ধ না থাকে; উচ্চশিক্ষা শেষ করা পর্যন্ত ধারাবাহিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
কলির স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়া। এ স্বপ্ন পূরণে তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। সেই পথের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন হবে শিক্ষা, প্রস্তুতি, সুযোগ ও সহযোগিতা। তার প্রতি আমাদের দায়িত্ব শুধু প্রশংসা জানানো নয়, বরং এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি করা। একই সঙ্গে দেশের সব প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ, সহায়ক অবকাঠামো এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
কলি রানীর সংগ্রাম আমাদের শেখায়, মানুষের পরিচয় তার শারীরিক সীমাবদ্ধতায় নয়, বরং তার স্বপ্ন, সাহস ও কর্মপ্রচেষ্টায়। তার স্বপ্ন পূরণ হোক— এ প্রত্যাশা সবার। সমাজ ও রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে পাশে দাঁড়ালে কলির মতো আরও অনেক তরুণ-তরুণী নিজেদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবেন। তখন তাদের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সমৃদ্ধ হবে দেশ ও সমাজও।
