শিক্ষাব্যবস্থা

পরিকল্পনাহীনতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

সাঈদ বারী

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান অবলম্বন। যে জাতি তার শিক্ষাব্যবস্থাকে যত বেশি গুরুত্ব দেয়, সেই জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির ভিত্তি তত বেশি শক্তিশালী হয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ দেখা যায়। শিক্ষার প্রায় প্রতিটি স্তরে রয়েছে নানা ধরনের সংকট। কোথাও শিক্ষার্থী আছে, শিক্ষক নেই। কোথাও শিক্ষক আছেন, শিক্ষার্থী নেই। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, আবার কোথাও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানই নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান বাড়ছে না প্রত্যাশিত হারে। সব মিলিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার একটি চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত 'দেশে শিক্ষার সব স্তরে অপরিকল্পনার ছাপ' শীর্ষক প্রতিবেদনটি এ বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। প্রতিবেদনটির তথ্য ও উপাত্ত থেকে বোঝা যায়, সমস্যাটি কোনো একটি স্তরে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা থেকে মাদ্রাসা, সরকারি থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সর্বত্রই রয়েছে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও আমরা কেন একটি সুসংহত ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলাম না? একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির পরিসংখ্যানই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনাহীনতার একটি বড় উদাহরণ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য কলেজ ও মাদ্রাসার সংখ্যা ৮ হাজার ১৮০টি। এসব প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে প্রায় ২৬ লাখ ৮ হাজার। অথচ বিপুলসংখ্যক আসন প্রতিবছরই খালি থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থী কোথায় কতজন আছে, কোন এলাকায় কতটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, কোন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা কতটুকু, এসব বিবেচনায় না নিয়ে প্রতিষ্ঠান ও আসন বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে একদিকে কিছু প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীসংকটে ভুগছে, অন্যদিকে অনেক শিক্ষার্থী মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্থানীয় চাহিদা, জনসংখ্যা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যক্তিগত উদ্যোগ, স্থানীয় প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কোথাও একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও প্রতিষ্ঠান হয়েছে, আবার কোথাও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও হয়নি। প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, এমপিওভুক্তি কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এর ফলে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না।

প্রাথমিক শিক্ষার পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭টি। অথচ এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৩৬ হাজারের বেশি। একটি বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এত বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকা স্বাভাবিকভাবেই ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন পদ শূন্য থাকলে শিক্ষার পরিবেশ, জবাবদিহি এবং বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক।

মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও শিক্ষকসংকট ও প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকট। অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নেই। কোথাও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পাওয়া যায় না। আবার কোথাও শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক বেশি। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যেও রয়েছে সুযোগসুবিধার বড় ধরনের বৈষম্য। বিশেষ করে বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের অভাব শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় না। শিক্ষার্থীরা কতটা বুঝতে পারছে, কতটা বিশ্লেষণ করতে শিখছে এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারছে কি না, সেটিই শিক্ষার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

মাদ্রাসাশিক্ষার ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। দেশে মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান, পাঠ্যক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভাষা ও আধুনিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও যেন উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে সমান সুযোগ পায়, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। উচ্চশিক্ষার পরিস্থিতি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও গড়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, শ্রেণিকক্ষ এবং গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা দেখা জরুরি। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ বিতরণ নয়। জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাই এর প্রধান লক্ষ্য। অথচ অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানের চেয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি ও সনদ প্রদানের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করছে। কিন্তু তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার অনেক ক্ষেত্রে মিল থাকছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে শিল্প, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও সেবা খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। এই বৈপরীত্য দূর করতে হলে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সময় থেকেই কর্মবাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা কিংবা শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা বাড়িয়ে শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষার মূল শক্তি শিক্ষক। একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল শিক্ষক একটি প্রজন্মের চিন্তাভাবনা বদলে দিতে পারেন। তাই শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকতা যেন শুধু একটি চাকরি না হয়ে দায়িত্বশীল পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, সে পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শিক্ষাক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য যেন বদলে না যায়। রাজনৈতিক বিবেচনা, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তার চিন্তা থেকে বেরিয়ে শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের জায়গায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কারিগরি ও উচ্চশিক্ষাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। কোন অঞ্চলে কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, কতজন শিক্ষক লাগবে, কী ধরনের দক্ষতা ভবিষ্যতে প্রয়োজন হবে, এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। শুধু বাজেট বাড়লেই শিক্ষার উন্নয়ন হবে না, বরাদ্দ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার জবাবদিহি থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, শিক্ষক উপস্থিতি, শিক্ষার্থীর শিখনফল এবং গবেষণার পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতও নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের বড় সম্পদ। এ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে না পারলে জনসংখ্যাগত সুবিধা একসময় বোঝায় পরিণত হতে পারে। তাই শিক্ষার সংকটকে শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

আজ প্রয়োজন নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা নয়, প্রয়োজন বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর ও মানসম্মত করে তোলা। কোথায় কী প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনাহীনতার মাশুল যেন আরেকটি প্রজন্মকে দিতে না হয়।

একটি দেশের ভবিষ্যৎ তার শ্রেণিকক্ষেই তৈরি হয়। সেই শ্রেণিকক্ষে যদি মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক এবং উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে উন্নয়নের বড় বড় স্বপ্নও একসময় প্রশ্নের মুখে পড়বে। শিক্ষার সংকট নিরসনে এখনই কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ শিক্ষা নিয়ে ভুল পরিকল্পনার ক্ষতি শুধু আজকের নয়, তার প্রভাব বহন করতে হয় বহু বছর, কখনও কখনও কয়েক প্রজন্মকে।

 

লেখক : প্রকাশক ও কলাম লেখক