শৈশব

মাঠ থেকে মোবাইলে

মো. রিফাত হাসান

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিকালের রক্তিম সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ত, তখন গাঁয়ের কাঁচা মেঠোপথ কিংবা শহরের অলিগলি মুখরিত হয়ে উঠত শিশুদের কলকাকলিতে। ধুলোবালি মেখে গায়ে ঘামের গন্ধ জড়িয়ে বাড়ি ফেরার মধ্যে যে এক অনাবিল আনন্দ ছিল, তা আজ এক দূর অতীতের রূপকথা মনে হয়। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ আর আধুনিকতার দাপটে আজকের শৈশব চারদেয়ালের আবদ্ধ ঘরে। চার-পাঁচ ইঞ্চির স্পর্শকাতর একখণ্ড আয়তাকার কাচের স্ক্রিনে বন্দী হয়ে পড়েছে। হারিয়ে গেছে শৈশবের সেই মুক্ত বাতাস, খোলা মাঠ আর দূরন্তপনা।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন শৈশব মানে শুধু চার দেয়ালের বন্দিদশা ছিল না। শৈশব ছিল প্রকৃতির কোলে ছুটে চলা। প্রকৃতির মাঝেই নিজেদের বিলিয়ে দেওয়া আর প্রকৃতিকেই আকড়ে ধরে নতুন স্বপ্ন বুনা। শৈশবের অতৃপ্ত রসনার কথা যা এখনও আমাদেরকে এক প্রশান্তির মায়া আকর্ষণ করে। প্রতিদিনের আনন্দময় সব খেলায় মেতে থাকা। বিকালের আলো লালচে হতে না হতেই উঠানে কিংবা খোলা মাঠে জমে ওঠা গোল্লাছুটের আসর। দাগ কেটে সীমানা নির্ধারণ করে এক পক্ষ যখন দৌড় দিত, আর অন্য পক্ষ তাদের ছোঁয়ার জন্য ওত পেতে থাকত, তখনকার সেই উত্তেজনার মুহূর্তগুলো আজ আর নেই। আজ যেন খোলা আকাশ আর কাউকে আকর্ষিত করে না।

কানামাছি খেলায় চোখ দুটো বেঁধে দিয়ে যখন চারপাশ থেকে ছড়া কাটা হতো 'কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ' তখন চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্য আর আনন্দের যে দোলা মনে লাগত, তা কোনো মোবাইল গেমসের হাই-ডেফিনেশন স্ক্রিনে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। এখনকার শৈশবকাল তিক্ততা আর বিষন্নতায় মোড়ানো।

একসময় গ্রামীণ শৈশবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বউচি আর ডাংগুলি। বউচি খেলায় বুড়িকে মুক্ত করার জন্য শিশুদের সেই মরণপণ লড়াই, নিঃশ্বাস বন্ধ করে বউয়ের ডাক দেওয়ার মধ্যে ছিল এক দারুণ শারীরিক ও মানসিক কসরত। অন্যদিকে, কাঠের তৈরি ছোট 'গুলি' আর বড় 'ডাং' বা 'লাঠি' নিয়ে ডাংগুলি খেলার মধ্যে লুকিয়ে থাকত অসাধারণ দূরদর্শিতা ও লক্ষ্যের নির্ভুলতা। আজ আর গ্রামের কোনো মেঠোপথে চোর-পুলিশ বা ডাংগুলির খটখট শব্দ শোনা যায় না। লাটিম আর মার্বেল খেলার আমেজটাই ছিল আলাদা। হাতের আঙুলের সূক্ষ্ম মোচড়ে সুতা পেঁচানো লাটিমকে মাটিতে ফেলে ঘূর্ণির নাচ দেখানো কিংবা মাটির গর্তে মার্বেল ফেলে নিখুঁত নিশানায় অন্য মার্বেলকে আঘাত করার মধ্যে যে দক্ষতা ছিল, তা শিশুদের মনোযোগ ও লক্ষ্য স্থির করতে শেখাত।

বর্ষার দিনে এক হাঁটু কাদা মেখে ফুটবল খেলা, কিংবা গ্রীষ্মের প্রখর রোদে গাছ থেকে আম কুড়ানোর পর কাবাডি খেলায় মেতে ওঠা এসবই ছিল বাঙালির আবহমান শৈশবের অপরিহার্য অংশ। সাঁতার কেটে দিঘি পার হওয়া, একি-বেকি, এক্কা-দোক্কা, কিংবা কানিছোঁয়া খেলার মতো অসংখ্য আঞ্চলিক খেলাধুলা আজ আধুনিকতার অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে। খোলা মাঠ যেন পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে।

প্রকৃতি আজ নীরব, বাস্তবতা বড়ই নির্মম। বিকালের রোদে যখন মাঠ ভরপুর থাকার কথা, তখন খেলার মাঠগুলো নির্জন, খাঁ খাঁ করে। মাঠের স্থান দখল করেছে ইট-কাঠের দালানকোঠা আর উঁচু উঁচু ভবন। আর যতটুকু খোলা জায়গা অবশিষ্ট আছে, সেখানেও শিশুদের পদচারণা নেই। শিশুদের হাতে এখন ফুটবল বা ব্যাটের বদলে শোভা পায় স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা গেমিং কনসোল। পাবজি, ফ্রি ফায়ার আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় তারা তৈরি করে নিয়েছে নিজেদের এক কৃত্রিম জগৎ। এ স্ক্রিন-আসক্তি শিশুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। তাদের চোখে উঠছে চশমা, শরীরে বাসা বাঁধছে স্থূলতা, আর মানসিকভাবে তারা হয়ে পড়ছে আত্মকেন্দ্রিক ও চরম সহনশীলতাহীন।

খেলার মাঠ শুধু শারীরিক কসরতের জায়গা ছিল না, এটি ছিল সামাজিকীকরণের প্রথম পাঠশালা। দলবদ্ধভাবে খেলাধুলা করার মাধ্যমে শিশুরা শিখত কীভাবে সবাইকে নিয়ে এক হয়ে কাজ করতে হয়, কীভাবে জয়কে বরণ করতে হয় আর পরাজয়কে হেসে মেনে নিতে হয়।

গোল্লাছুট বা বউচির মতো খেলাগুলো শিশুদের শেখাত দলের প্রতি দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা। কিন্তু আজকের এই ডিজিটাল প্রযুক্তি শিশুকে বানাচ্ছে একাকী ও স্বার্থপর। তারা পাশের বাড়ির সমবয়সী খেলার সঙ্গীকে চেনে না, কিন্তু পৃথিবীর অন্য প্রান্তের কোনো অচেনা গেমারের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চ্যাট করে চলেছে।

এ কৃত্রিম জীবনের বন্দিদশা থেকে শৈশবকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। শুধু শিশুদের দোষ দিলে চলবে না, অভিভাবক ও সমাজকেও এর দায় নিতে হবে। প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা, বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার পাশাপাশি বাধ্যতামূলক ক্রীড়াচর্চার পরিবেশ তৈরি করা এবং সন্তানদের হাতে প্রযুক্তির বদলে খেলাধুলার সরঞ্জাম তুলে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ছুটির দিনে তাদের নিয়ে যেতে হবে প্রকৃতির কাছাকাছি, চেনাতে হবে আমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে।

যে শৈশব ধুলোবালি মেখে বড় হয় না, যে শৈশব আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে বাতাসের সাথে কথা বলে না, তা কখনও পূর্ণাঙ্গ শৈশব হতে পারে না। স্ক্রিনের কৃত্রিম নীল আলো থেকে শিশুদের ফিরিয়ে আনতে হবে মেঠোপথের সোনালি রোদে। গোল্লাছুট, কানামাছি, ডাংগুলি আর লাটিমের সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে পুরোপুরি মুছে যেতে দেওয়া যাবে না। শৈশব আবার ফিরে পাক তার মুক্ত ডানা, আমাদের চারপাশের বাতাস আবার মুখরিত হয়ে উঠুক শিশুদের চঞ্চল কোলাহলে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া