নভেম্বর এবং জুলাইয়ের রাজনৈতিক যোগসূত্র

সাকিব জামাল

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঐতিহাসিক সাতই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক যোগসূত্র বা পলিটিক্যাল লিগ্যাসি একইসূত্রে গাঁথা। সাতই নভেম্বর, ১৯৭৫ এর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের পলিটিক্যাল ফোর্স আর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পলিটিক্যাল ফোর্স দুটোর অরিজিন একটাই। পার্থক্য শুধু জেনারেশনের। পচাত্তর এবং চব্বিশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে ঘটে যাওয়া এই দুইটা ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পলিটিক্যাল ফোর্সের অরিজিন আসলে কী? সহজ উত্তর হলো, বাংলাদেশপন্থার রাজনীতির পিপলস পাওয়ার। নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশপন্থার রাজনৈতিক গণপরিসর সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব একটি প্রতিবেশি দেশের প্রতি এতোটাই নতজানু ছিল, যেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ শুধুমাত্র একখণ্ড নিজস্ব ভূমি পেয়েছে যার সার্বভৌমত্ব মূলত প্রতিবেশির দয়ার ভান্ডারে রক্ষিত গণিমতের মাল এবং এ নতজানুতার মাত্রা এতোটাই বেশি ছিল যে, এ দেশের সর্বমহলের জনতা এইটাকে অরক্ষিত স্বাধীনতা যা মূলত পরাধীনতার একটা রূপ মনে করতে শুরু করেছিল তখন। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল চরম দুর্নীতি, জনজীবনে মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতা, দুর্ভিক্ষ— এসব পেরিফেরাল ফ্যাক্টর। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নকে উপেক্ষা করে তখনকার রাজনৈতিক ডোমেইন থেকে ডেমোক্রেসি উদাও হয়ে গেল একটি দলের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল রাখার প্রতি লোভের কারণে। সকল প্রকার ভিন্নমত দমন করে চিরস্থায়ী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে গঠিত হয়েছিল বাকশাল। এবং এসব নন-ডেমোক্রেটিক পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিটিস, দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতি শাসক আওয়ামীলীগের উদাসীনতায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়লে বাংলাদেশের জনগণ বিপ্লবী মোডে চলে যায়। তারা তৎকালীন দালালদের উৎখাতে রাজপথে নেমে আসে বঙ্গোপসাগরের সুনামি হয়ে। অপরদিকে রক্ষীবাহিনী কর্তৃক সেনাবাহিনী ধ্বংসের নীল নকশা ও সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়ার চেষ্টাকে প্রতিহত করতে সাধারণ সিপাহীরা যুদ্ধাবস্থার মুখোমুখি হয়ে পড়েন। তখন সংগতকারণেই সিপাহী-জনতার ঐক্য হয়ে যায়। নভেম্বরে এইটা মূলত পলিটিক্যাল ফোর্স হিসেবে রূপ নেয়। যেই ফোর্স স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে ঘিরে সার্কুলেটেড হতে থাকে। এবং সর্বশেষ সিপাহী-জনতার বিপ্লবে রূপ নেয় এবং চূড়ান্ত সফলতা অর্জিত হয় যখন জেনারেল জিয়াউর রহমান, বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে জনতার জিয়ায় পরিণত হন। রাজনৈতিক গণপরিসরি উদ্ভব ঘটে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির এবং পুনরুদ্ধার হয় বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু সার্বভৌমত্ব। ইতিহাস পাঠে এমনটাই জানতে পেরেছি ছেটোবেলা থেকে। যাহোক ইতিহাসের আলাপ করা আলোচ্য বিষয় নয়, বরং মূলত সাতই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের পলিটিক্যাল ফোর্সের অরিজিন যে শুধুমাত্র বাংলাদেশপন্থি রাজনৈতিক গণপরিসর বিনির্মাণের লক্ষ্যে উৎসারিত পিপলস পাওয়ার সেটিই মূল আলোচ্য। এবার একটু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পলিটিক্যাল ফোর্সের অরিজিন খোঁজখবর করে দেখা যাক! আমরা নব্বই পরবর্তী প্রজন্ম থেকে বর্তমান জেনজি প্রজন্ম যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলাম, প্রাপ্ত বয়স্ক হলাম, এর মধ্যে এক দশক কিছুটা গণতান্ত্রিক উত্তরণ লক্ষ্য করেছিলাম বাংলাদেশের রাজনীতিতে। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য আমাদের, কী দুর্ভাগ্য জাতির! এক/এগারো সরকারের এক্সিট পলিসি'র নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেই সেই আওয়ামীলীগ আবার একাত্তর থেকে পচাত্তরের নীতিতে ফিরে গেল! আবার অন্ধকার! সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়ার উৎসব সর্বত্র! শতভাগ পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্যনীতি হলো প্রতাবেশীর পলিসিনির্ভর। ফলতঃ সীমাহীন দুর্নীতি আর পরোক্ষ দুর্ভিক্ষের কবলে দেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একইসাথে সার্বভৌমত্ব রক্ষাপন্থিদের গুম, খুন, নির্যাতন চলে অবিরত। নন-ডেমোক্রেটিক রাজনীতিনির্ভর মাফিয়াতন্ত্র গড়ে তোলা হয়। ঠিক যেন একাত্তর থেকে পচাত্তরের রিপিটিশন কিন্তু মাত্রা আরও বেশি, সময় আরও দীর্ঘ। এমতাবস্থায় বাংলাদেশপন্থার রাজনীতি পুনরুদ্ধারে অনিবার্য ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান। জুলাইয়ে ছাত্রজনতার অভূতপূর্ব ঐক্য হলো।

লেখক : কবি ও ব্যাংকার