ফুটপাত ফিরুক পথচারীর দখলে, সবুজ হোক নগর
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানী ঢাকার অন্যতম বড় নাগরিক সংকট ছিল ফুটপাত দখল। পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্মিত ফুটপাত বছরের পর বছর হকার, অবৈধ দোকান ও বিভিন্ন অস্থায়ী স্থাপনার দখলে চলে গেছে। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়কে হাঁটতে হয়েছে। এতে যেমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়েছে, তেমনি যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়ে বেড়েছে যানজট ও জনভোগান্তি। দীর্ঘদিনের এই বাস্তবতায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে নগরবাসীর জন্য স্বস্তির খবর। মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় এখন এ পরিবর্তন চোখে পড়ছে। আগে যেখানে ফুটপাতজুড়ে দোকানপাট ও হকারদের ভিড় ছিল, সেখানে এখন পথচারীরা তুলনামূলক নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছেন। শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়নি; অনেক স্থানে গাছ লাগানো, ফুলের টব বসানো এবং সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে পুনরায় দখলের সুযোগ কমানোর পাশাপাশি নগর পরিবেশেও এসেছে নতুন মাত্রা। রাজধানীর দক্ষিণ অংশেও ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। গুলিস্তান, মতিঝিল, নিউমার্কেট, মৎস্য ভবন ও সেগুনবাগিচাসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে। সড়ক-মিডিয়ান, চত্বর ও উন্মুক্ত স্থানে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক নগর গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বড় পরিসরের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে সেগুনবাগিচার ফুটপাতের সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ একটি ভিন্ন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। সেখানে পথচারীদের চলাচলের সুবিধার পাশাপাশি বেঞ্চ, ডাস্টবিন ও সংস্কারকাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের বিশিষ্ট শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের গ্রাফিতি ফুটপাতটিকে শুধু চলাচলের পথ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি, দিয়েছে সাংস্কৃতিক আবহও। নগর উন্নয়নে এমন চিন্তাশীল উদ্যোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
তবে কেবল উচ্ছেদ অভিযান চালালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। রাজধানীতে অতীতেও বহুবার হকার উচ্ছেদ করা হয়েছে, কিন্তু কিছুদিন পর আবার ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। তাই এবার নিয়মিত তদারকি, কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং দখলমুক্ত স্থানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফুটপাতের নকশা, পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও প্রতিবন্ধীবান্ধব চলাচলের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হকারদের জীবিকা। ফুটপাত অবশ্যই পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে— এ বিষয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই। কিন্তু হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থান বা পরিকল্পিত পুনর্বাসনের বিষয়টিও মানবিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। নির্দিষ্ট ও উপযুক্ত স্থানে পরিকল্পিত হকার জোন গড়ে তোলা গেলে একদিকে পথচারীদের অধিকার রক্ষা হবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকাও সুরক্ষিত থাকবে।
ঢাকাকে বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে ফুটপাত, সড়ক ও সবুজ পরিবেশ— এ তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। দখলমুক্ত ফুটপাত পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সড়কে শৃঙ্খলা আনবে। আর পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ নগরীর সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। রাজধানীর বর্তমান উদ্যোগ তাই শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়; এটি হতে পারে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং নাগরিক সচেতনতা। ফুটপাত সত্যিকার অর্থেই পথচারীর দখলে থাকুক, আর চারপাশের সবুজে বদলে উঠুক আমাদের প্রিয় রাজধানী।
