রাজধানীর যাতায়াতে মনোরেলের সম্ভাবনা
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার যানজট আজ শুধু নগরবাসীর দৈনন্দিন দুর্ভোগ নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি, কর্মঘণ্টা, পরিবেশ ও মানুষের জীবনমানের ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় রাজধানীর সড়কগুলো প্রায়ই স্থবির হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় ঢাকার গণপরিবহন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে নতুন পরিবহনব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। ২০৩০ সালের মধ্যে রাজধানীতে দুটি মনোরেল রুট নির্মাণের সরকারি পরিকল্পনা তাই নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) উদ্যোগে মনোরেল চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ এগোচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরামর্শকেরা প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করেছেন এবং এখন বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্যায়নের মাধ্যমে চূড়ান্ত রুট নির্বাচন করা হবে। যাত্রী চাহিদা, সম্ভাব্য সুফল এবং আর্থিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে রুট নির্বাচন করা হলে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে নতুন পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সড়কের জায়গা সীমিত, ভূমি অধিগ্রহণ জটিল এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বিদ্যমান নগর কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করাও কঠিন। এ ক্ষেত্রে উড়াল কাঠামোর ওপর দিয়ে চলাচলকারী মনোরেল একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। তবে শুধু নতুন একটি আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা চালু করলেই যানজট সমস্যার সমাধান হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি বিদ্যমান ও পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়।
রাজধানীতে মেট্রোরেল ধীরে ধীরে গণপরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন এমআরটি লাইন চালু হলে একটি সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন আরও বাড়বে। মনোরেলের সম্ভাব্য রুটগুলোকে মেট্রোরেল, বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করতে হবে, যাতে যাত্রীরা সহজে এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে যেতে পারেন। বিশেষ করে যাত্রার শেষ অংশ বা 'লাস্ট মাইল' যোগাযোগ সহজ করা গেলে নতুন ব্যবস্থার প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে।
হালনাগাদ সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি সম্ভাব্য মনোরেল রুটের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে পূর্বাচল, জলসিঁড়ি, বিমানবন্দর, বসুন্ধরা, মধ্য বাড্ডা, ভুলতা, রামপুরা, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, পোস্তগোলা ও সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো বিবেচনায় এসেছে। তবে সব রুট একসঙ্গে বাস্তবায়নের পরিবর্তে যেসব এলাকায় যাত্রীচাহিদা বেশি এবং অন্য গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সংযোগ সম্ভব, সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া যুক্তিসংগত হবে।
এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণ ব্যয়, জমির প্রাপ্যতা, স্টেশন ও ডিপোর অবস্থান, যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা এবং পরিচালন ব্যয়— সবকিছু বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণের সক্ষমতা নয়, ভবিষ্যতে সেটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হবে এবং যাত্রীদের জন্য কতটা সাশ্রয়ী হবে, সে বিষয়েও পরিকল্পনা থাকতে হবে।
মনোরেল নির্মাণের আগে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ঢাকার পরিবহন সমস্যার সমাধানে এমন প্রকল্প দরকার, যা নগরবাসীর জীবনকে সহজ করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগর গঠনে ভূমিকা রাখবে।
২০৩০ সালের লক্ষ্য সামনে রেখে দুটি মনোরেল রুট নির্মাণের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে বড় সম্ভাবনার কথা বলছে। তবে প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক রুট নির্বাচন, স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যমান গণপরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর। ঢাকার মানুষ আর শুধু নতুন প্রকল্পের ঘোষণা শুনতে চায় না; তারা চায় সময়মতো বাস্তবায়িত, কার্যকর ও স্বস্তিদায়ক গণপরিবহনব্যবস্থা। মনোরেল পরিকল্পনা সেই প্রত্যাশা পূরণে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপে পরিণত হোক— এটাই কাম্য।
