নারী গার্মেন্টস কর্মীর জীবন সংগ্রাম
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভোরের প্রথম আলো ফোটার অনেক আগেই বাংলাদেশের নারী গার্মেন্টস কর্মীদের কঠিন জীবনযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। গ্রামীণ জনপদ থেকে ভাগ্য অন্বেষণে আসা এ সংগ্রামী নারীরা বর্তমান দেশের অর্থনৈতিক চাকার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। অবর্ণনীয় কষ্ট, সামাজিক অবহেলা এবং সীমাহীন বৈষম্য সহ্য করে তারা প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
ফজরের মধুর আযান ধ্বনিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের যান্ত্রিক ও ব্যস্ত দিনলিপি শুরু হয়ে যায়। চোখে ঘুম জড়িয়ে থাকলেও বিছানা ছাড়ার কোনো বিকল্প উপায় তাদের আর থাকে না। ট্রাফিক জ্যাম, ওভারটাইম আর কারখানার কঠোর নিয়মের বেড়াজালে কাটে তাদের সারাদিন। মাঝরাতে যখন তারা ঘরে ফেরে, তখন শরীরে অবশিষ্ট থাকে না বিন্দুমাত্র শক্তি। এই দীর্ঘ ক্লান্তিকর চক্রটি তাদের জীবনের নিত্যদিনের নিষ্ঠুর বাস্তব চিত্র।
শিল্প এলাকার অন্ধকার, নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে ছোট ঘরগুলোই এই অভাগী নারীদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। আলো-বাতাসহীন এই অবাসযোগ্য কুঠুরিতে প্রতিনিয়ত তাদের মানবেতর বসবাস করতে হয়। দেয়ালের নোনা ধরা স্যাঁতসেঁতে ভাব আর মেঝের অতিরিক্ত আর্দ্রতা শরীরকে প্রতিনিয়ত অসুস্থ করে তোলে। অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে থাকার ফলে বিভিন্ন ছোঁয়াচে রোগ সহজেই তাদের আক্রমণ করে। এ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই কাটে তাদের কষ্টের রাতগুলো। সকাল বেলা লাইনের পানি সংগ্রহ আর বাথরুম ব্যবহারের জন্য শুরু হয় দীর্ঘ ও বিরক্তিকর প্রতীক্ষা। দশটি পরিবারের জন্য একটিমাত্র সাধারণ রান্নাঘর আর বাথরুম বরাদ্দ থাকে এই বস্তিতে। কারখানায় সময়মতো পৌঁছানোর তাগিদে ভোর থেকেই চলে তীব্র প্রতিযোগিতা ও বাকবিতণ্ডা। সিরিয়াল পাওয়ার তাড়নায় অনেক সময় সকালের খাবার রান্না করাই সম্ভব হয়ে ওঠে না।
কারখানার চার দেয়ালের ভেতরে সুপারভাইজারের গালিগালাজ আর কাজের লক্ষ্যমাত্রার তীব্র চাপ তাদের নীরবে কাঁদায়। অসুস্থ শরীরেও ছুটি না পেয়ে অনেকে কারখানার টয়লেটে গিয়ে চোখের জল মোছেন। মাস শেষে নামমাত্র বেতনের টাকা যখন হাতে আসে, তখন বেদনায় বুক ফেটে যায়। নিজের মৌলিক চাহিদাগুলো বিসর্জন দিয়ে তারা শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যান।
মাসিক এই স্বল্প বেতন দিয়ে বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেই তাদের বেতনের সিংহভাগ টাকা শেষ হয়ে যায়। হঠাৎ অসুস্থ হলে উন্নত চিকিৎসার খরচ চালানোর মতো অতিরিক্ত কোনো সঞ্চয় তাদের থাকে না। ধারদেনা আর সুদের কিস্তির চক্রে জড়িয়ে পড়ে তাদের অর্থনৈতিক জীবন সবসময় বিপর্যস্ত ও চরম ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে।
ক্লান্ত দুপুরে সুইং মেশিনের একটানা ঘড়ঘড় শব্দের মাঝে শ্রমিক রহিমা আপন মনে গুনগুন করে গায়। ওরে ও দরদি ও দয়াল রে, আমার এই ভাঙা ঘরে জলো না তো প্রদীপ রে। গ্রামীণ লোকসংগীতের এই চেনা সুর তার মনের জমে থাকা গভীর কষ্টগুলোকে কিছুটা হালকা করে দেয়। এই গানগুলো যেন তাদের জীবনের দীর্ঘ নিঃশ্বাস আর ভাগ্যহীনতার এক করুণ ও মর্মস্পর্শী কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ।
কাজের ফাঁকে অন্য আরেকজন শ্রমিক সুমি গেয়ে ওঠে তার নিজের চিরচেনা সেই বেদনার গান। মন আমার কেমন কেমন করে, গাঁয়ের ঐ মেঠো পথ আমায় যে রোজ ডাকে রে। এই সুর তাকে মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা সবুজ গাঁয়ের শান্ত পরিবেশে। মেশিনের সুইয়ের সুতোর সঙ্গে সঙ্গে যেন তাদের মনের হাজারো অতৃপ্ত গান ও রঙিন স্বপ্ন বোনা হতে থাকে।
টিফিন বিরতিতে মর্জিনা, আসমা ও লাইলী একসাথে বসে দুপুরের সাধারণ খাবার খাচ্ছিল। মর্জিনা বলল, এবার বাড়িওয়ালা আবার পাঁচশত টাকা ভাড়া বাড়াইয়া দিছে রে বোন। আসমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিল, আমার তো ওভারটাইমের টাকাটাই এখনো হাতে পাইলাম না, চলব কেমনে। লাইলী বলল, পোলাপানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে আমি এবার পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেলাম রে।
তাদের আলোচনার মোড় ঘোরে কারখানার কাজের ভেতরের তীব্র মানসিক ও শারীরিক অতিষ্ঠ নির্যাতন প্রসঙ্গে। মর্জিনা বলল, আজ সুপারভাইজার টার্গেট পূরণ না হওয়ায় অনেক খারাপ গালিগালাজ করছে রে। আসমা সান্ত্বনা দিয়ে বলল, আমাদের কপালটাই এমন মন্দ, মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই। লাইলী বলল, শরীরটা বড্ড অসুস্থ, তাও কালকে ডিউটি করতে হবে, ছুটি তো দেবে না। কারখানার নিয়ম বড় কঠিন।
কথোপকথনের শেষাংশে তারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুন্দর, নতুন ও রঙিন কিছু আশার কথা বলে। মর্জিনা বলল, নিজের জীবন তো শেষ করলাম; কিন্তু মেয়েটারে অনেক বড় মানুষ বানাতে চাই। আসমা সায় দিয়ে বলল, হ্যাঁ বোন, আমাদের মতো এই কঠিন কষ্ট যেন ওদের কোনোদিন করতে না হয়। লাইলী চোখের পানি মুছে বলল, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখি, আমাদের সুদিন নিশ্চয়ই আসবে। আমাদের স্বপ্ন পূরণ হবে।
ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে রান্না ও বাথরুমের দীর্ঘ সিরিয়াল ধরা তাদের প্রতিদিনের সকালের কাজ। সকাল সাড়ে সাতটায় কারখানার প্রধান ফটকে হাজিরা দেওয়া এবং আঙুলের ছাপ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করা। আটটা থেকে শুরু হয় একটানা সেলাইয়ের কাজ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের তীব্র তাগিদ থাকে। দুপুর একটা থেকে দুইটা পর্যন্ত মাত্র এক ঘণ্টার সামান্য বিশ্রামের বিরতি দেওয়া হয় তাদের।
দুপুর দুইটা থেকে পুনরায় কাজ শুরু হয়ে চলে সাধারণ সময় বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। এরপর রাত আটটা কিংবা দশটা পর্যন্ত চলে বাধ্যতামূলক ওভারটাইমের ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ ডিউটি। রাত এগারোটায় বাসায় ফিরে আবার রাতের খাবার রান্না করা এবং ঘরকন্নার কাজ সামলানো। রাত সাড়ে ১২টায় কোনো রকমে ঘুমোতে যাওয়া এবং মাত্র চার ঘণ্টা পর আবার নতুন করে জেগে ওঠা। এই তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিষ্ঠুর টাইমলাইন।
অসুস্থতা, পুষ্টিহীনতা আর মানসিক নির্যাতনকে প্রতিদিন সঙ্গী করেই নারী শ্রমিকরা কারখানায় কাজ করেন। মাতৃত্বকালীন ছুটির অভাব আর কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব তাদের জীবনকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক স্বীকৃতির অভাবে তারা প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নিয়োজিত মোট শ্রমিকের প্রায় ষাট শতাংশের বেশিই হচ্ছে নারী শ্রমিক। দেশের মোট জিডিপিতে এই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জাতীয় অর্থনীতিতে অনস্বীকার্য ভূমিকা রাখছে। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় এই নারী শ্রমিকদের গড় মজুরি এখনো অনেক কম। দীর্ঘ সময় অক্লান্ত কাজ করলেও পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় তাদের পদোন্নতির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত, অসম ও চরম বৈষম্যমূলক।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় আশি শতাংশ নারী গার্মেন্টস কর্মী রক্তশূন্যতা ও পুষ্টিহীনতায় ভোগেন। বস্তি এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুপেয় পানির অভাবে তারা নানা জটিল চর্মরোগে আক্রান্ত হন। মাত্র ৩০ শতাংশ শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত ডে-কেয়ার সেন্টার ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষের উচিত শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি সময়মতো পরিশোধ করা এবং উৎসব বোনাস নিশ্চিত করা। কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ, ওভারটাইমের সঠিক হিসাব ও সাপ্তাহিক ছুটি বাধ্যতামূলক করা অত্যন্ত প্রয়োজন। নারী শ্রমিকদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন এবং মাতৃত্বকালীন স্ববেতন ছুটির পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারের উচিত গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে মিল রেখে পুনর্নির্ধারণ করা। শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নারী শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং রেশন কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তার বিশেষ ব্যবস্থা করা জরুরি।
পাড়া-প্রতিবেশীদের উচিত এই সংগ্রামী নারী শ্রমিকদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক, সহনশীল ও সম্মানজনক করা। বিপদে-আপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের অবহেলিত সন্তানদের প্রতি স্নেহের হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তাদের পেশাকে খাটো করে না দেখে সমাজের মূলধারার পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। প্রতিবেশীর সহানুভূতিশীল আচরণ তাদের একাকীত্ব ও মানসিক কষ্ট দূর করতে অনেক বড় ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাড়িওয়ালাদের উচিত মানবিক বিবেচনায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের ঘরভাড়া সহনীয়, সাশ্রয়ী ও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা। তাদের জন্য সুপেয় পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং পরিচ্ছন্ন বাথরুমের ন্যূনতম সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণে-অকারণে ঘরভাড়া বৃদ্ধি করা বা অসময়ে উচ্ছেদের মানসিকতা পরিহার করতে হবে। তাদের কষ্টার্জিত আয়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আবাসন পরিবেশ উন্নত করা বাড়িওয়ালাদের অন্যতম প্রধান নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
পিতা-মাতার উচিত কন্যাসন্তানদের বোঝা না ভেবে তাদের মানসিক ও নৈতিক সমর্থন সবসময় জুগিয়ে যাওয়া। গার্মেন্টস কর্মী মেয়েদের উপার্জনকে শ্রদ্ধা করা এবং তাদের বিয়ের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করা প্রয়োজন। দূর শহরে থাকা মেয়ের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের পাশে থাকা উচিত।
সন্তানদের উচিত মায়ের হাড়ভাঙা খাটুনি ও রোজগারের মূল্য অনুধাবন করে নিজেদের পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া। ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করা এবং মায়ের কষ্টের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। মায়ের স্বপ্নপূরণে নিজেদের সৎ ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা করতে হবে।
ক্রেতা গোষ্ঠী, সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের উচিত নারী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় একযোগে কাজ করা। আন্তর্জাতিক ব্র?্যান্ডগুলোকে পোশাকের ন্যায্য মূল্য প্রদান নিশ্চিত করতে হবে যেন মালিকরা শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে পারেন। গণমাধ্যমে তাদের জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সকলের সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টাই পারে এ অসহায় নারী শ্রমিকদের জীবনের অন্ধকার দূর করতে সফল হতে।
পরিশেষে বলা যায়, নারী গার্মেন্টস কর্মীরা আমাদের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হলেও তাদের জীবন এখনো অবহেলিত। তাদের শ্রমের মূল্যে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে দেশ এগিয়ে গেলেও তারা পেছনে পড়ে আছেন। তাদের মানবিক অধিকার, উন্নত জীবনযাত্রা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক
