নারী : পোশাক কারখানা থেকে নেতৃত্বের টেবিল

আফিয়া মোবাশসিরা ঐশী

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সভ্যতার অগ্রযাত্রায় নারীর অবদান বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ, অথচ ইতিহাসের দীর্ঘ সময়জুড়ে তারা প্রাপ্য অধিকার ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ফেলে এসেছি কত শতাব্দী, কত যুগ। অতীতের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, একসময় নারীদের জীবন ছিল নানা সামাজিক বিধিনিষেধ ও প্রচলিত প্রথার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। ঘরের চার দেয়ালই ছিল তাদের পৃথিবী। সারাদিনের গৃহস্থালি কাজ, সন্তানদের লালন-পালন এবং পরিবারের দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত তাঁদের জীবন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলার সুযোগ ছিল অনেকের কাছেই সীমিত। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্রেও এসেছে পরিবর্তন।

নারীরা এখন মুক্ত পাখির মতো আকাশে ডানা মেলছে। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি, মেধা ও শ্রমের মাধ্যমে গড়ে তুলছেন নিজেদের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে নারীরা। নারীরা যেন হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতির অন্যতম এক চালিকাশক্তি। তাদের অবদানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো পোশাকশিল্প। এ পোশাকশিল্প গুলো বিকাশের পেছনে যাদের শ্রম ও নিষ্ঠা জড়িয়ে আছে তাদের একটি বড় অংশই হচ্ছে নারী।

পোশাক কারখানার ফ্লোর লেবেল থেকে শুরু করে নেতৃত্ব দানের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা অবদান রাখছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প গুলো শুধু নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেনি বরং তাদের আর্থিক স্বাবলম্বী ও সামাজিক অবস্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একটি পোশাক শিল্পে পোশাক তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় কাপড় নির্বাচন, নকশা ও কাপড় কাটার মাধ্যমে। এরপর আসে সেলাই, সংযোজন, মান যাচাই, আয়রন, ভাঁজ এবং প্যাকেজিংয়ের কাজ। পোশাক শিল্পের এই ধাপগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর এই ধাপ গুলোতেই যুক্ত রয়েছে অসংখ্য নারী। পোশাকশিল্পের উৎপাদনের এই প্রতিটি ধাপে সময়ানুবর্তিতা, দক্ষতা ও মনোযোগের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করছে পণ্যের গুণগত মান। তাদের এ শ্রম ও কাজের মাধ্যমে তৈরি করে গুণগত মানের পোশাক যা পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক বাজারে। শুধু তাই নয়, গুণগত মানের পোশাক তৈরির পাশাপাশি নারীরা তাদের জীবনে এনেছে বহুমাত্রিক পরিবর্তন।

স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি তারা তাদের পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলা ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বহন করছে। তাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তনে এনেছে। তবে অতীত পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পোশাক কারখানার প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিক নারী হলেও সুপারভাইজার, লাইন চিফ বা উচ্চ ব্যবস্থাপনায় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে মধ্যম ও উচ্চ ব্যবস্থাপনা গুলোতে নারীদের হার ছিলো মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষার অভাব, পারিবারিক দায়বদ্ধতা এবং নেতৃত্বের দক্ষতায় ঘাটতির অজুহাতে নারীদের ফ্লোর লেবেলেই আটকে রাখা হতো। কিন্তু সময় পরিবর্তনের সাথে পোশাকশিল্পের প্রচলিত এই চিত্রে ঘটেছে এক নীরব শক্তিশালী বিপ্লব।

ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত 'জেন্ডার ইকুয়ালিটি অ্যান্ড রিটার্নস' কর্মসূচির মাধ্যমে নারী শ্রমিকদের কারিগরি ও নেতৃত্ব বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক নারী শ্রমিক নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতার মাধ্যমে সুপারভাইজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, ফ্যাশন ডিজাইনিং এবং ব্যবসায়িক প্রশাসনেও উচ্চশিক্ষিত নারীরা বিভিন্ন উচ্চ পদে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। তবে পোশাকশিল্পে নারীদের এই অগ্রযাত্রা যতটা সম্ভাবনাময় ততটাই চ্যালেঞ্জপূর্ণ।

ফ্লোর লেবেল থেকে নেতৃত্বের টেবিলে নারীদের এ যাত্রা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও উচ্চতর পদে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এবং আরও এগিয়ে যাওয়ার পথ এখনও অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতায় ঘেরা। পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নারীর নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা তাদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনেই নয় বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতেও প্রভাব ফেলছে। এতে নারীদের প্রকৃত দক্ষতা ও নেতৃত্বের সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পরছে। তাই এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী। প্রথমত, বৈষম্য আমাদের ঐক্য ও সহাবস্থানকে দুর্বল করে। তাই কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে যোগ্যতা ও দক্ষতার মূল্যায়ন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি কারখানায় দক্ষ ও যোগ্য নারী শ্রমিকদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনাবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে হবে।

তৃতীয়ত, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পর্যাপ্ত শিশুযত্নকেন্দ্র এবং নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পারিবারিক দায়িত্বের কারণে কোনো নারী কর্মজীবনে পিছিয়ে না পড়ে। চতুর্থত, কারখানার নীতিনির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে এবং তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

পঞ্চমত, রাতে বা অতিরিক্ত সময় কাজ করা নারী কর্মীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

পাশাপাশি কারখানার উচ্চ ও মধ্যম পর্যায়ের পদে নারীদের নিয়োগ বাড়াতে সরকার ও বিজিএমইএ-কে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। পোশাকশিল্পে নারীরা দীর্ঘ চার দশক ধরে তাঁদের শ্রম, দক্ষতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। তারা প্রমাণ করেছেন, নারীরা শুধু উৎপাদন কার্যক্রমেই অবদান রাখছেন না বরং দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনেরও অন্যতম রূপকার। তাই তাঁদের অগ্রযাত্রা যেন শুধু শ্রমিক কিংবা মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ না থাকে বরং নীতিনির্ধারণ ও নেতৃত্বের জায়গাতেও তাঁদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রয়োজনীয় সুযোগ, সঠিক পরিকল্পনা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব। নারীদের কর্পোরেট ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ক্ষমতায়ন শুধু পোশাকশিল্পের উন্নয়নই নিশ্চিত করবে না, বরং ২০৪১ সালের উন্নত ও 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই নিশ্চিত হবে, যখন তারা শুধু উৎপাদনে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সমান অংশীদার হবেন। নারীর মেধা, দক্ষতা ও নেতৃত্বের বিকাশই গড়ে তুলবে সমতাভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় আগামীর বাংলাদেশ।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ