প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ মার্চ, ২০২১
বাঙালির ইতিহাস হাজার বছরের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার অস্তিত্ব বজায় রেখেছে সগৌরবে। ঔপনিবেশিক শক্তি শোষণ করেও বাঙালির শক্তিকে নিঃশেষ করতে পারেনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে আন্দোলন শুরু করে সংগ্রামী চেতনার মাধ্যমে বিপুল ত্যাগ-তিতিক্ষায় বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এর আগে পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু মূলত জনসম্পৃক্ত একটি রাষ্ট্র কামনা করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ভিত্তি ছিল ভাষা আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শেকড়। ভাষাসংগ্রাম থেকে শুরু হয়েছিল বাঙালির স্বতন্ত্র লক্ষ্যের অভিযাত্রা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমাদের শেকড় প্রোথিত করেছিলেন মুক্তির লক্ষ্যে। বঙ্গবন্ধুর ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং তার ভাষাসংগ্রাম বিষয়ে যে তথ্য প্রচলিত আছে, ড. আতিউর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন’ শীর্ষক রচনার মধ্য থেকে সে বৃত্তান্ত তুলে ধরতে চাই।
‘প্রথম পর্বের ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৮ সালেই। এর পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ১৯৫২ সালে। ওই সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঘটে ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার এক মর্মান্তিক ঘটনা। এ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন যে তরুণরা, তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন পূর্ব বাংলার উদীয়মান রাজনীতিক শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহনেতারা। একই সঙ্গে তারা কাজ করেছেন প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও গণতান্ত্রিক যুবলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কলকাতাফেরত শেখ মুজিব ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে রাজপথ থেকেই গ্রেপ্তার হন। ১১ মার্চের হরতাল, পিকেটিংসহ কর্মসূচির পুরো রূপরেখা তৈরি করেছিলেন শেখ মুজিব। স্মরণে রাখা চাই, ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে যে ১৪ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে ২১ দফা দাবিসহ একটি পুস্তিকা প্রচার করেছিলেন, তার মধ্যে শেখ মুজিবও ছিলেন। ওইসব দাবির মধ্যে দুটো দাবি ছিল রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত। গোয়েন্দারা যেসব গোপন প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন, তাতেও স্পষ্ট বলা হয়েছেÑ শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই তিনি তার সহনেতাদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ছাত্রদের সংগঠিত করা এবং ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট পালনের সময় তিনি কীভাবে গ্রেপ্তার হন, তার বিস্তারিত বিবরণ পাই এম আবদুল আলীমের লেখা (ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিব : তারিখ ও ঘটনাপঞ্জি, ‘অন্যদিন’ ঈদ সংখ্যা, ২০১৯)। এটি ছিল তার জীবনের প্রথম রাজনৈতিক কারাবরণ। ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ মুক্ত হয়েই তিনি ১৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং সামনের সারিতে থেকে এ আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যান। তবে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। ১৯৫০ সালেই তিনি বন্দি হন। বন্দি অবস্থায়ও তিনি ভাষা আন্দোলনকারী তার সহযোগী নেতাদের সঙ্গে সংযোগ রাখেন। কারাগার থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে তিনি ছাত্রলীগ ও ভাষা আন্দোলনের অন্য কর্মীদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিতেন। সেজন্য তাকে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। স্থানান্তর হওয়ার পথেও তিনি নারায়ণগঞ্জে নেতাকর্মীদের ভাষা আন্দোলনে কী করতে হবে, তার নির্দেশনা দিয়ে যান। এরপর আন্দোলন দানা বাঁধে। তিনি তার সহনেতা মহিউদ্দীনের সঙ্গে অনশন করেন। এরই মধ্যে একুশে ফেব্রুয়ারির মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। জেলখানা থেকে তিনি চিরকুট পাঠাতেন এবং আন্দোলনকে চাঙা রাখতেন’।
জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা-নুর-উল ইসলামের জীবন ও কর্ম নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ‘সময়ের মুখ’ শিরোনামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে, সেখানে তার আলোচনায় উঠে আসে বঙ্গবন্ধুর ভাষা আন্দোলনের সূচনা ও ভাষার জন্য সংগ্রাম সম্পর্কে কিছু অভিনব তথ্যমালা। বঙ্গবন্ধু ও ভাষা সংগ্রামবিষয়ক চর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এ তথ্যগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিধায়, অধ্যাপক মুস্তাফা-নুর-উল ইসলামের বক্তৃতার প্রাসঙ্গিক অনুলিখন উপস্থাপন করছিÑ ‘শেখ মুজিবের পাঠানো একটা খবর, ঢাকায় চলে আয় মিটিং আছে। উনি তখন বেকার হোস্টেলে, তো আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে কয়েকজন, সবাই ঢাকায় চলে আসলাম। জেলখানার সামনে বংশাল রোডে কোনো একটা বাড়িতে উঠেছিলাম। ৬ই জুন ১৯৪৭। এ ডেটটা মনে আছে। শেখ মুজিবও কিন্তু ওখানেই উঠেছিলেন। ৬ই জুন বংশালে কোনো একটা মাঠে মিটিং। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। তখন কিন্তু এর আগেই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে মানে কামিং পাকিস্তানে উর্দু ভাষা হবেÑ এই সেøাগানটা কিন্তু পাকিস্তানেও উঠেছে আর মুসলিম লীগে ভেতর তো আছেই। তো ওটাকে প্রতিহত করার জন্য একটা স্টেটমেন্ট দিয়েছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্, আজিজুল হক কলেজের তখন তিনি প্রিন্সিপাল, আর একটা মিটিং বললাম, সেটা শেখ মুজিবের, ৬ই জুন। এ মিটিং কিন্তু ছাত্রদের জন্য। শেখ মুজিব বললেন, আমরা গেলাম, তিনি বললেন : তোরা কিন্তু কেউ মিটিংয়ে যাবি না। তো আমরা একটু অবাক হলাম, বললামÑ আমরা মিটিংয়ে যাবো না তো আমাদের ডেকে আনলেন কেন? যাবো না কেন, বললেনÑ সন্ধ্যার সময় হামলা হবার আশঙ্কা আছে, আমার কাছে খবর আছে। শাহ আজিজুর রহমান ও ঢাকা নবাববাড়ীর গু-ারা এবং চকবাজার মসজিদের ইমাম সাহেবের কিছু লোকজন তারা হামলা করতে পারে। বঙ্গবন্ধু বললেন মিটিংয়ে আমি একাই যাবো। তিনি একাই গেলেন। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। সন্ধ্যার পরে শেখ মুজিব আরও কয়েকজন তারা একসাথে ফিরলেন। শেখ মুজিবের মাথায় ব্যান্ডেজ, যাকে বলে কপালে রক্তাক্ত তিলক। অর্থাৎ, হামলাটা রিয়েলি হয়েছিল। তো প্রথম ভাষা আন্দোলন নিয়ে, প্রথম হামলাটা সেটা শেখ মুজিবের উপরই হয়। এই জন্য একথাটা বলা এবং আমি এর সাক্ষী এখনও জীবিত আছি। শেখ মুজিবের কথা বলে তো শেষ নেই এবং আমার অভিজ্ঞতা আমি যেটুকু দেখেছি তিনি নিকটজনদের তুই করে বলতেন এবং খুব কাছের করে নিতেন। তো যাইহোক সেটা গেলো। তারপর তো পাকিস্তান হলো তখন। পাকিস্তানের সময় যা হবার হয়েছে। আমরা কিন্তু পাকিস্তানের পরে বিশেষ করে বিহার থেকে মুসলমান রিফিউজি যারা এসছিল তাদের সব থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। পরে যে তারা রাজাকার হয়ে যাবে এটা তো বুঝতে পারিনি। তারা যারা টেনারিং জানত তাদের গ্রামে গ্রামে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যারা আরবি-টারবি পড়াতে পারতো তাদেরকে মক্তবে শিক্ষকতা করতে দিয়েছি ইত্যাদি ইত্যাদি। তো এটা দিনাজপুরে এই জিনিসটা হয়েছিল। তো এখন দিনাজপুরের ওই ঘটনার পরে যাইহোক ঢাকায় আসলাম। তো ঢাকায় এসে বাংলায় পড়াশোনা করি আর ভাষা আন্দোলন করি। আমরা তখন করতাম কী, ও এর মধ্যে শেখ সাহেব পার্টিশনের পরে ঢাকায় চলে আসেন। এসে তিনি আইন বিভাগের ছাত্র। তার মানে রাতের ছাত্র। পার্টটাইম স্টুডেন্ট। আর দিনের বেলা ছাত্র আন্দোলন। তখন আমরা ভাষা দিবসটা ২১শে ফেব্রুয়ারি যেমন হয়, তখন ভাষা দিবস হতো ১১ই মার্চ। ১১ই মার্চ কেন? শেখ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা ভাষা আন্দোলনের দাবি নিয়ে ইভেন মেডেল এইচের দিকে একটা মিছিল নিয়ে গিয়েছিলাম। সেটা ছিল ১১ই মার্চ ১৯৪৯। ওইখানে লাঠিচার্চ হয় এবং শেখ সাহেব ইনজুরিও হন, গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। ওই দিবসটাকে স্মরণে রাখার জন্য ১১ই মার্চ ভাষা দিবস, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২ পর্যন্তু ১১ই মার্চ ভাষা দিবস পালন করা হতো, ৫৩ থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি।’
অধ্যাপক মুস্তাফা-নুর-উল ইসলামের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অংশগ্রহণের শুরুটা ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চে নয়, সেটি হবে ৬ জুন ১৯৪৭, তখন পাকিস্তান রাষ্ট্রেরও জন্ম হয়নি।
বাঙালির হাজার বছরের লড়াই-সংগ্রাম ও মুক্তি-চেতনা দানা বেঁধেছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তারপর দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে চলে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম। শোষণ-নির্যাতন-বঞ্চনার কারণে বাঙালি জনসমাজ ক্রমেই ফুঁসে ওঠেছিল পাকিস্তানি সামন্তবাদী শক্তির বিরুদ্ধে। এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণআন্দোলন, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জিত হয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু। জেল-জুলুম, অত্যাচার-নিপীড়ন সহ্য করে তিনি তার লক্ষ্যে ছিল অবিচল ও অবিচ্যুত। বঙ্গবন্ধু পূর্ববাংলার মানুষের আকাক্সক্ষাকে উপলব্ধি করে ছয় দফা প্রণয়ন করেছিলেন। তারপর একই সঙ্গে চলে আগরতলা মামলা এবং গণআন্দোলন। তখনি তিনি পরিণত হন বাঙালির নয়নের মণিতে। তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধুতে। সত্তর সালের নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ও জনরায় থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আভাস পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা হয়ে ওঠে স্পষ্ট। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। সেখানেও প্রেরণাশক্তি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বাঙালির হাজার বছরের তৃষ্ণা ছিল মুক্তি অর্জন। বাঙালি বারবার জেগে ওঠে মুক্তির লক্ষ্যে। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উজ্জীবিত করেছিল। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি সামরিক শক্তি গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। তার আগে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পশ্চিম পাকিস্তানে ৯ মাস তার বন্দিজীবন কাটে। কিন্তু বাংলাদেশে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মেহনতী মানুষসহ সর্বস্তরের জনগণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পাকিস্তানি বাহিনী নগ্নভাবে লিপ্ত হয় বাঙালি নিধনযজ্ঞে। গণহত্যা-নির্যাতন, অত্যাচার-নিপীড়নের মাধ্যমে বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করা ছিল তাদের গভীর ষড়যন্ত্র। কিন্তু বাংলার আপামর জনগণের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, ৩০ লাখ শহীদ, ৪ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। বিশ্বব্যাপী চলছিল বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আন্দোলন। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বাঙালি পায় স্বাধীন মুক্তভূমি এবং তাদের প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করে।
বাঙালি সংস্কৃতি সর্বদা উদার ও কল্যাণময়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের মধ্য দিয়ে সেই উদারনৈতিক ভাবধারার পরিচয় মেলে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদÑ এই ভাবাদর্শে সংবিধান হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশকে আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার মুক্ত-পটভূমি। হাজার বছরের লড়াই-সংগ্রামের অর্জন স্বাধীন বাংলাদেশ। সেই দেশকে পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের সঙ্গে নির্মম হত্যাকা-ের শিকার হলেও তার জীবনাদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনকে এ দেশের মানুষ মনের গভীরে স্থান দিয়েছিল সশ্রদ্ধচিত্তে। সেজন্য নানা বৈরিতা, বিরোধিতা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় জাগরুক আছেন বাংলার মাটি ও মানুষের অন্তরে।
বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম, সংগ্রামী চেতনা ও উদারতাকে গভীরভাবে ধারণ করে উত্তরকালে তার কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নেতৃত্ব গ্রহণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও আদর্শ বাস্তবায়নে সংগ্রামী ভূমিকা পালন করে চলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, বাঙালি সংস্কৃতির অমিয়ধারায়, উদার গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শের যথার্থ উত্তরাধিকার। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে তাই উপলব্ধি করা যায় বাঙালির হাজার বছরের শেকড়, সংগ্রাম ও মুক্তির জয়ধ্বনি। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও দর্শন থেকে শক্তি নিয়ে বাংলাদেশকে গড়ে নিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের আলোকে।
সংগ্রাম ও মুক্তির নিরিখে আমাদের যে অর্জন, তাকে জানান দিতে হবে বিশ্বময়। শিল্প-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও মানবতাসহ সর্বক্ষেত্রে সর্বসূচকে অগ্রগতি অর্জনের মধ্য দিয়ে বাঙালিÑ সহসাই বিশ্বদরবারে দাঁড়াবে মাথা উঁচু করে; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে এ আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচির বাস্তবায়ন করে চলেছে। ‘জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধু’ তারই একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা। সমকালে লেখালেখিতে যারা সক্রিয় তেমন ৪০ জন লেখক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা, পঠন-পাঠন ও ভাবনায় বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরেছেন। লেখকদের বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এই রচনাগুলোর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু নতুনভাবে আলোচিত ও উন্মোচিত হবেন বলে আমার প্রত্যাশা।