প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ জুলাই, ২০২০
যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের লেখকরা সমাজের অনাচার, অবিচার, অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য অবলম্বনে সাহিত্য রচনা করেছেন। সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন উপন্যাস, গল্প, কবিতা, গদ্য ও নাটক ইত্যাদির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন সমাজের প্রতিচ্ছবি। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হলো চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও মানুষ এসব দেখতে থাকে। আমরা সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশের সীমাহীন দুর্নীতি নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্র উপভোগ করি। আমাদের দেশে এখনও সেটি সে মাত্রায় সম্ভব হচ্ছে না। তবে, মিডিয়ায় মাঝেমধ্যে এ ধরনের নাটক মঞ্চস্থ হয় বেশ ভালোই। ধন্যবাদ আধুনিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের আলোকে প্রভাবিত মিডিয়াকে। তা না হলে মানুষের জানা সম্ভব হত না, দেশে এত বড় বড় মাপের (?) লোকজন আছেন, যারা কোটি কোটি টাকা ছাড়া চিন্তা করেন না, যারা অর্থ রাখেন বিদেশের বড় বড় ব্যাংকে। সেগুলো কীভাবে আনা হবে, বিদেশে যাতে কেউ টাকা এভাবে নিয়ে যেতে না পারে সে নিয়ে কোনো কথা, আলোচনা বা ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ এটি চলতেই থাকবে। আমরা নাটকে দেখব এরা কেমন পোশাক পরেছেন, কি খেয়েছেন, কীভাবে বোরখা পরল, কীভাবে পিস্তল রাখল ইত্যাদি। মানুষ সাময়িক এই নাটক দেখবে এবং এগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। কিন্তু দেশব্যাপী পুকুরচুরি, সীমাহীন অনাচার চলতেই থাকবে। মানুষ ধরেই নিয়েছে এ তো আমাদের ভাগ্যের লিখন, দেশের সরকারি হাসাপাতালে আমরা চিকিৎসা পাব না, কোনো যুগে পাইনি, এখনও না। আমরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ধরা খাওয়া, কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই আমাদের ডকুমেন্ট তথ্যাদি নিতে হয় টাকার বিনিময়ে, আগেও হতো, এখন টাকা বেশি লাগে। যার টাকা আছে সে তাড়াতাড়ি নিতে পারবে, যার টাকা কম তাকে অনেক ঘুরে হেস্তনেস্ত হয়ে অনেক পরে কম টাকার বিনিময়ে নিতে হয়। এই তো রাষ্ট্রের কাছে আমাদের পাওনা!
ইতালির স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্তো স্পেরাঞ্জা বাংলাদেশ থেকে আসা সব ফ্লাইট স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন (Big business in Bangladesh: Selling fake coronavirus certificates, The Nwe York Times, 16 July). বাংলাদেশিদের করোনাভাইরাস ‘পজিটিভ’ অথচ সবার কাছেই করোনাভাইরাস নেগেটিভ সনদ ছিল। অর্থাৎ তাদের শরীরে করোনাভাইরাস নেই এ ধরনের সনদ ছিল। বাস্তবে ওই সনদ ছিল ভুয়া। একইসঙ্গে জেকেজি নামে একটি কোম্পানি করোনাভাইরাসের জন্য স্যাম্পল সংগ্রহ করে সনদ দিত। তারা এরই মধ্যে ১৫ হাজার ৪৬০টি সনদ দিয়েছে। অথচ এখন জানা যাচ্ছে, তারা কোনো ধরনের টেস্ট না করেই ভুয়া সনদ দিয়েছে। তারা সনদপ্রতি প্রায় পাঁচ হাজার টাকা করে নিত। আর এভাবেই তারা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আসা বেশিরভাগ যাত্রীর মধ্য করোনাভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে। একেকজন বাংলাদেশি একেকটা ভাইরাস বোমা (ইত্তেফাক ১১ জুলাই) বহির্বিশ্বে এই হচ্ছে আমাদের পরিচয়! একেকজন বাংলাদেশি ভাইরাস বোমা! তারা প্রশ্ন তুলেছেন এসব নাগরিক কীভাবে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন পার হলো, ভাবার বিষয়। কিন্তু কে ভাববে? আমরা ক’জন প্রকৃত অর্থে দেশ নিয়ে ভাবি? ভাবলে তো এটি হতো না। ইতালিয়ান এক সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় যখন সংবাদের শিরোনাম হয় ‘উধষ ইধহমষধফবংয পড়হ ঃবংঃ ভধষংর’ (From Bangladesh with fake tests) তখন বাংলাদেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন আসে; কিন্তু আমরা কি এ নিয়ে বিচলিত? ভুয়া করোনা সনদের কারণে জাপান, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশিদের সে দেশে আপাতত প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। (ডেইলি স্টার ৯ জুলাই)। রোমের লাজিও অঞ্চলে প্রায় ছয়শ’ বাংলাদেশি করোনা ‘পজিটিভ’ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ অভিযোগ স্বাস্থ্য কাউন্সিল অ্যালেসসিও ডি আমাটোর। আমরা জানি, ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন। এখন ইতালির ঘটনাবলি যখন বিশ্বের শীর্ষ সংবাদপত্রগুলোয় ছাপা হচ্ছে, তখন তাদের অবস্থাটা কেমন হবে? শত শত বাংলাদেশির এখন নানা জটিলতায় জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশনের কড়া নজরদারিতে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে এখন। তারা বাংলাদেশের কোনো রিপোর্টকেই আর গ্রহণ করবেন কি না প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। হয়তো নতুন নতুন আইন, বিধিনিষেধ আর ডিপোটের মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশিদের। কিন্তু তাতে কাদের কী আসে যায়? কিন্তু এসব শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী যারা বহু কষ্ট করে বিদেশে গিয়ে দেশের জন্য ডলার পাঠাচ্ছেন আর যার জোরে আমরা বলছি আমাদের ‘ফরেন রিজার্ভ’ ফান্ড খুব ভালো অবস্থানে আছে, দেশের কাছে এই পাওনা?
সংবাদপত্রে আরও একটি চাঞ্চল্যকর সংবাদ হচ্ছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নোট ভারবালে বহুল আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসায় বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য ‘ডেজিগনেটেড’ বা ‘নির্দিষ্ট’ করে দেওয়া হয়েছিল (মানবজমিন ১৪ জুলাই)। এ কেমন কথা! যে হাসপাতালে আইসিইউ ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা মানসম্মত ছিল না, সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই হাসপাতালে বিদেশি কূটনীতিকদেরও চিকিৎকার কথা কীভাবে বলে? এ নিয়ে নিশ্চয়ই কেউ বিচলিত নন! করোনা নমুনা সংগ্রহের বৈধ অনুমতি পাওয়ার পরও টাকার লোভে ভুয়া টেস্ট শুরু করেছিল জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি)। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরী এবং চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে চলছিল এমন অপকর্ম। এমনকি সরকারের করোনা ফান্ডের ৫০০ কোটি টাকার দিকেও চোখ পড়ে এ দম্পতির। সেখান থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের চার কর্মকর্তাকে ম্যানেজও করেছিলেন তারা। এতসব নাটক না হলে সেটিও এতদিনে তাদের হাতে চলে যেত।
ওই দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিবি সূত্র জানিয়েছে, রিমান্ডে আরিফ ও সাবরিনা দাবি করেছেন, করোনার ভুয়া টেস্ট ও ভুয়া সনদ বিক্রি করে তারা কয়েক কোটি টাকা উপার্জন করেছেন। টাকার অঙ্ক সম্পর্কে অবশ্য তারা একেক সময়ে একেক তথ্য দিচ্ছেন। তবে দু’জনই স্বীকার করেছেন, সন্দেহ এড়াতে টাকাগুলো তারা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখেননি। জেকেজি বুথ স্থাপন করে বিনামূল্যে করোনা নমুনা সংগ্রহের অনুমতি পায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকার বিনিময়ে নমুন সংগ্রহ শুরু করে। এসব নমুন টেস্ট না করেই লোকজনকে টাকার বিনিময়ে করোনার ভুয়া সনদ দিয়ে আসছিল। তারা ভেবেই বসেছিলেন, দেশের কোথাও যেহেতু জবাবদিহিতা নেই অন্তত দেশের মালিক জনগণের কাছে, তখন তারা তো একাজ করতেই পারেন। কিন্তু এত বড় যে নাটক মঞ্চস্থ হতে পারে সেটি বোধ হয় আঁচ করতে পারেননি। পত্রিকায় দেখলাম একটি সূত্র র্যাবকে জানিয়েছে, সাহেদ ২০১২ সাল থেকেই বিদেশে টাকা পাচার করা শুরু করে, যার পরিমাণ ২০১৬ সালে বেড়ে যায়। আর টাকা পাচারের জন্য প্রথমেই নাকি বেছে নিয়েছেন ভারতকে, তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। ভারতে আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদ কিনেছেন। সম্প্রতি বিনিয়োগকারীর কোটায় তিনি নাকি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত একটি দেশেও টাকা পাচার করেছেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের একটি সুযোগ খুঁজছিলেন। সাহেদের অসৎ আয়ের অনেকগুলো উৎসের মধ্যে প্রধান ছিল নাকি তদবির। তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে তদবির করতেন।
এমন কোনো খাত নেই যেখানে চরম অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, লুটপাট ও দুর্নীতির কালো থাবা বিস্তার লাভ করেনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভোজন বিলাসের রেশ কাটতে না কাটতেই করোনা পরীক্ষায় বড় ধরনের জালিয়াতির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলো। মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে পরীক্ষার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশে। অর্থ ও বিত্ত অর্জনের লোভ, উচ্চপর্যায়ে বাজার ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগতকরণ, নিচুমানের গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে নাগরিকদের অংশগ্রহণ দুর্বল করা ও নিম্নমানের রাজনৈতিক স্বচ্ছতাকে দুর্নীতির কারণ হিসেবে গণ্য করা যায়। দুর্নীতি শব্দটি ব্যবহার করেছেন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল থেকে শুরু করে রোমান রাষ্ট্রনায়ক মার্কাস টুলিয়াস সিসেরোসহ বর্তমান কাল পর্যন্ত যুগদৃষ্টিসম্পন্ন সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তার অগ্রদূতরা। সিসোরোর একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে ÔMoral today is corrupted by worship of richesÕ. প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক মরিস লিখেছেন, দুর্নীতি হলো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার ব্যবহার। আবার কেউ কেউ আইনানুগ দুর্নীতির বিষয়ে আইনি ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতিকে মাহমান্বিত করার কথাও বলেছেন। যিনি যাই বলুন না কেন, আমরা বুঝি দুর্নীতি মানে রাষ্ট্রীয় সর্বনাশ।
দুর্নীতির অন্তর্নিহিত শক্তি হচ্ছে লোভ। একটি দেশের সমাজে লোভের পরিধি নির্ধারিত হয় দুর্নীতির সুযোগের ওপর। সুযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায় লোভ। তাই অক্সফোর্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ফ্রাঙ্ক বুকর্মনের একটি চমৎকার উক্তি এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘পৃথিবীতে প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট সম্পদ রয়েছে বটে; কিন্তু সবার লোভ মেটানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।’ লোভ থেকেই অতি মুনাফার আকাক্সক্ষার সৃষ্টি হয়। দুর্নীতিপ্রসূত ব্যবসা-বাণিজ্যের অর্থের চরিত্রই হচ্ছে সেটি শিল্পায়নে বিনিয়োগ না হয়ে বৈধতার প্রশ্নে দেশ ছেড়ে পালায়। তাতে দেশে আর্থিক শৃঙ্খলা ধসে পড়ে। সমাজে বৈষম্য বাড়ে। এত বড় বড় বৈষম্য আছে বলেই তো জনগণ মাঝেমধ্যে এ ধরনের নাটক উপভোগ করতে পারে। নিরীহ জনগণের ছোটপর্দায় এসব নাটক উপভোগ করার সুযোগ পাওয়াটাও কি কম কথা!
* মাছুম বিল্লাহ
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক