প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ জানুয়ারি, ২০২২
বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর অফুরন্ত সম্পদের ভান্ডার। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গোপসাগরে ১৭ থেকে ১০৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস হাইড্রেটের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এছাড়া কয়েকশ’ প্রজাতির সি-উইড আবিষ্কারের কথা বলা হয়েছে, যার ফলে আশার প্রদীপ জ্বলে উঠেছে বাংলাদেশের সামনে। এ গ্যাস হাইড্রেটে রয়েছে বিপুল পরিমাণ মিথেন। এটি মূলত উচ্চচাপ ও নিম্ন তাপমাত্রায় গঠিত জমাট বরফ আকৃতির এক ধরনের কঠিন পদার্থ। এটি স্তূপীকৃত বালুর ছিদ্রের ভেতরে ছড়ানো স্ফটিক আকারে অথবা কাদার তলানিতে ক্ষুদ্র পি-, শিট বা রেখা আকারে বিদ্যমান থাকে। এদিকে নেদারল্যান্ডের সঙ্গে মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের পরিচালিত আরেকটি জরিপে বঙ্গোপসাগরে বিপুল পরিমাণ সি-উইডের সন্ধানও পাওয়া গেছে। এ সি-উইডের বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া দেশে এর ব্যবহার বাড়িয়ে আমদানিনির্র্ভরতা তো কমানো যাবেই, বিদেশে রপ্তানিও করা যাবে। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বাংলাদেশে পাওয়া বহু প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবালের মধ্যে কয়েকটির বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বঙ্গোপসাগরের নীলজলের অতলে অফুরন্ত সম্পদের বিষয়টি এরই মধ্যে ধারণার মধ্যেই সীমিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপ ও গবেষণায় সম্পদের যেটুকু উন্মোচিত করা সম্ভব হয়ে তা সোনার হরিণের হাতছানি তৈরি করেছে। মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় মেরিন জেনেটিক রিসোর্স (এমজিআর) অর্থাৎ সমুদ্রের প্রাণিজ ও উদ্ভিদ-সংক্রান্ত সবধরনের সম্পদের উপস্থিতি, সার্বিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে যে কার্যক্রম চালায় সেখানে দেখা যায়, বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২২০ প্রজাতির সি-উইড, ৩৪৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৪৯৮ প্রজাতির ঝিনুক, ৫২ প্রজাতির চিংড়ি, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ৬ প্রজাতির কাঁকড়া, ৬১ প্রজাতির সি-গ্রাস চিহ্নিত করা হয়েছে। আর বঙ্গোপসাগরে যে বিপুল তেল ও গ্যাসের মজুদ থাকার সম্ভাবনা আছে, তা গত দুই দশক ধরে ভারত ও মিয়ানমারের সমুদ্র সম্পদ ব্যবহার থেকেই স্পষ্ট। সূত্রমতে, ভারত এখন পর্যন্ত অনেকগুলো কূপ খনন করে মোট ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আবিষ্কার করেছে। অন্যদিকে মিয়ানমার ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মোট ৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট থেকে ১০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের তিনটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে।
বলা যায়, বঙ্গোপসাগরের সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার এখনও আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছি। তবে আশার কথা বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা চলমান থাকায় সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, কপ-২৬-এ ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সবুজ জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। সেই রূপান্তরকে মসৃণ করার জন্য আরও দুই দশক প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজন দেশের। এ পরিস্থিতিতে গ্যাস হাইড্রেট আবিষ্কার বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আবার গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি পূরণে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন চলমান রাখতে বাংলাদেশ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে। এ কারণে গভীর সমুদ্রে তেল ও গ্যাস খোঁজা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদিকে শিল্পক্ষেত্রে বাংলাদেশে পাওয়া নির্দিষ্ট প্রজাতির কিছু সি-উইডের পাঁচটি প্রয়োগ চিহ্নিত করা হয়েছেÑ এগুলো হলো মাছের খাদ্য, পশুখাদ্য, ফুড অ্যাডিটিভ, প্রসাধনী উপাদান এবং হাই ভ্যালু প্রসাধনী উপাদান। অর্র্থাৎ আগামীতে টিকে থাকার জন্য সামুদ্রিক অর্থনীতিই হবে মূল কেন্দ্র। সঙ্গত কারণেই বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তির ওপর জোর দিতে হবে।