কবীর সুমনের বাড়িতে পারশা

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বিনোদন ডেস্ক

পারশা মাহজাবীন পূর্ণি এ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছেন। তিনি গত শুক্রবার গিয়েছিলেন দুই বাংলার জনপ্রিয় সংগীতজ্ঞ কবীর সুমনের বাড়ি। গল্প-গানে তাদের দারুণ এক আড্ডা জমেছিল। দীর্ঘ সে আড্ডার অভিজ্ঞতা তিনি নিজেই জানাচ্ছেন। তার ভাষায়— আজ (গত শুক্রবার) কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ও গীতিকার কবীর সুমনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার সে আড্ডা, গান ও কথোপকথনের অভিজ্ঞতা আমার জন্য নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমার কিছু বন্ধুদের উপস্থিতি আড্ডাটিকে আরও উপভোগ?্য করে তুলেছিল।

সুমনের বিখ্যাত গান 'জাতিস্বর' নিয়ে আমার বিশেষ কৌতূহল ছিল তাই আড্ডার শুরুতেই বহুল আলোচিত গানটি নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিই— গানটি কেন লেখা হয়েছিল, কাকে উদ্দেশ্য করে এবং কোন প্রেক্ষাপট থেকে এর সৃষ্টি? উত্তরে তিনি বিস্তারিতভাবে গানটির পেছনের গল্প ও দর্শন ব্যাখ্যা করেন। 'বাড়ির পাশে নদ', 'হ্রদ'সহ নানা বিষয়, মানুষ, সভ্যতা ও সমাজের উদাহরণ টেনে গানটির অন্তর্নিহিত ভাবনা বুঝিয়ে দেন। শুধু 'জাতিস্বর' না, তার আরও কয়েকটি জনপ্রিয় গানের সৃষ্টির পেছনের গল্প ও রহস্যও শোনান আমাকে। একজন গীতিকার কীভাবে তার চারপাশের জীবন, সমাজ, মানুষ ও সময়কে গানের মধ্যে ধারণ করেন, তা তার মুখে শোনার অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ।

আড্ডায় গানের বাইরেও নানা বিষয়ে কথা হয় কবীর সুমনের সঙ্গে। সুমন বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কবীর সুমন হওয়া, ধর্মীয় ভাবনা এবং বৈবাহিক জীবনের নানা ব্যক্তিগত গল্প উঠে আসে। গানওয়ালার মুখ থেকে সেসব গল্প ও অভিজ্ঞতা শুনে আমার মনে হয়েছে, সাধারণ মানুষ কবীর সুমন সম্পর্কে যতটুকু জানেন, তার ব্যক্তিত্ব, জীবনবোধ ও অভিজ্ঞতার পরিসর বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। আনুষ্ঠানিকভাবে কবীর সুমন মুসলিম তবে ব?্যক্তীজীবনে ধর্মহীন। কালি দেবী বা সরস্বতীকে ভিন্ন ধারায় ধারণ করেন। বুঝতে পারলাম, তাকে কেবল তার গান কিংবা জনপরিচিত কিছু বক্তব্য দিয়ে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব না। তাঁর জীবনের নানা অধ্যায়, চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে আরও অনেক অজানা গল্প রয়েছে।

দুই বাংলা জনপ্রিয় এ সংগীতজ্ঞকে সামনে থেকে দেখে ও কথা বলে মনে হলো— প্রকৃতির নিয়মে কবীর সুমন বয়োবৃদ্ধ হচ্ছেন। কথা বলার সময় কণ্ঠে কাঁপুনি, হাত-পায়েও বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু সংগীতের প্রতি তার ভালোবাসা, নিষ্ঠা, যত্ন এবং সংগীত নিয়ে গভীর মনোযোগে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন চোখে পড়েনি। তিনি আজও সেই চিরচেনা কবীর সুমন, যার কাছে সংগীত কেবল বিনোদন নয়, বরং এক গভীর জীবনবোধ ও নিরন্তর সাধনার বিষয়।

আমাদের দীর্ঘ আড্ডার বড় একটি অংশজুড়ে ছিল সংগীত, রাজনীতি এবং বাংলাদেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতার কথা শুনে আমি অভিভূত হয়েছি। কথাপ্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশে একটি সংগীতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণের স্মৃতিচারণ করলেন। সেই অভিজ্ঞতা তাকে ভীষণ আনন্দিত ও মুগ্ধ করেছিল। বাংলাদেশের শ্রোতা-দর্শকদের ভালোবাসা, আতিথেয়তা এবং সংগীতের প্রতি আগ্রহের কথা তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করলেন। জানালেন, বাংলাদেশ থেকে তাকে আবার আমন্ত্রণ জানানো হলে, এমনকি বিনা সম্মানীতেও গান গাইতে যেতে আগ্রহী। কারণ বাংলাদেশকে তিনি ভালোবাসেন, ভালোবাসেন বাংলাদেশের মানুষকে।

বাংলাদেশের শ্রোতা-দর্শকদের নিয়ে তার যে গর্ব ও ভালো লাগা, তা তার কথায় বারবার প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনীতি নিয়েও বেশ দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে আমাদের। দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে সেই আলোচনায়।

সংগীত নিয়ে সুমনের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা ছিল অন্যরকম। জীবনের বাকি সময়টুকুও তিনি সংগীতের মধ্যেই কাটাতে চান। বাংলা খেয়ালসহ বাংলা গানের নানা ধারা ও উপধারা, নতুন সংগীত নির্মাণ এবং সংগীতচর্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনেক পরিকল্পনা ও ভাবনা রয়েছে।

বয়সের ভার সত্ত্বেও সংগীত নিয়ে তার আগ্রহ-উদ্দীপনা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখন আর আগের মতো গিটার বাজাতে পারেন না সুমন, আঙুলের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় গিটার বাজানো তার পক্ষে একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে— একপর্যায়ে নিজের হাত দেখিয়ে আক্ষেপের সঙ্গে জানালেন। কষ্ট করে পিয়ানো বাজান মাঝেমধ্যে। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে নিয়েই সংগীতের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছেন। বয়সের স্বাভাবিক নিয়মে শরীরের সক্ষমতা কমে আসে, কিন্তু সংগীতের প্রতি তার আকাঙ্ক্ষা যে এখনও অটুট, সেটি তার সান্নিধ্যে এলে সহজেই বোঝা যায়। আমাকেও বেশ কিছু মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন কবীর সুমন। বিশেষ করে আমার সংগীতচর্চা নিয়ে।